আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এমন ব্যস্ত সূচি যে ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তেমন খেলা হয়ে ওঠে না তামিম ইকবালের। এই যেমন এবারের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট বিসিএলে খেলছেন ছয় বছর পর। তাও প্রথম রাউন্ডের পর আসরটিতে খেলার তেমন সুযোগ নেই। কিন্তু পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে একটি ইনিংস খেলতে নেমেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন ড্যাশিং ওপেনার। অপরাজিত ৩৩৪ রানের ইনিংস খেলে হয়ে গেছেন দেশের ইতিহাসে ফার্স্ট ক্লাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের মালিক। সেই সঙ্গে হয়েছে আরও কিছু রেকর্ড, যা ভাঙা কঠিনই হবে যে কারও জন্য। অথচ তামিম নিজে এমন কাণ্ড করার কথা কখনো ভাবতেই পারেননি!
মধ্যাঞ্চলের হয়ে পূর্বাঞ্চলের বিপক্ষে খুব চেনা মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেটে ব্যাট করলেন তামিম। উইকেটও যেন ‘তথাস্তু’ বলার ভঙ্গিতে তামিমের খুব অনুগত হয়ে উঠল। প্রায় একই রকম রইল। উল্টাপাল্টা আচরণ নেই। টেস্টে ২০৬ রানের একটা ইনিংস আছে তামিমের। শনিবার দ্বিতীয় দিনে সেটা পেরিয়ে ২২২ রানে অপরাজিত ছিলেন। অধিনায়ক মুমিনুল হক বলেছিলেন, হাতে আরও দুদিন যেহেতু আছে তামিমকে ট্রিপল সেঞ্চুরি করার সুযোগ দেবেন।
তৃতীয় দিনের সকালে ঠিক যেন আগে যেখানে শেষ করেছিলেন সেখান থেকে তামিমের শুরু। বাতাসে বল ভাসান না। বাউন্ডারিও কম হচ্ছিল। এক-দুইয়ের দিকে চোখ রেখেছিলেন। এভাবে দ্রুত ২৯০-এর ঘরে ঢোকেন। সেখানেও খানিকটা ধৈর্য দেখান। অবশ্য শুভাগত হোমকে বাউন্ডারি মেরে ওই নার্ভাসনেসের আঙিনায় পা রাখার পর মোস্তাফিজুর রহমানকে আরেক বাউন্ডারি মেরে ২৯৮-এ ঢোকা। প্রতিপক্ষ ক্লোজ ইন ফিল্ডিংয়ে চেপে ধরলেও সিঙ্গেলসে ট্রিপল সেঞ্চুরি স্পর্শ করে ইতিহাস হয়ে যান তামিম।
২৭৯ রানে তৃতীয় দিনের লাঞ্চে যাওয়ার পর বেশি সময় নেননি তামিম। ৩০ বছরের বাঁহাতি ওপেনার দেশের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে করলেন ফার্স্ট ক্লাসে ট্রিপল সেঞ্চুরি। ৫৬০ মিনিটে ৪০৭ বলে ৪০টি বাউন্ডারিতে ৩০০। মাঠেই প্রতিপক্ষের অভিনন্দনে ভেসে যান তামিম। মাঠের বাইরে প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোসহ ক্রিকেট কর্তাদের তালি থামতে চায় না।
ঘটনাক্রমে মাঠে প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় হিসেবে উপস্থিত রকিবুল হাসান। তিনি অবশ্য কিছুক্ষণের ব্যবধানে দুবার যান তামিমকে অভিনন্দন জানাতে। প্রথমবার ৩০০ হতে, দ্বিতীয়বার তামিম ৩১৩ পেরিয়ে যেতে। ২০০৭ সালে জাতীয় লিগে ৩১৩ রানের ইনিংস খেলেছিলেন রকিবুল। ওটা এতদিন বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাসে একমাত্র ট্রিপল সেঞ্চুরি ছিল। ৩১৩ ছিল রকিবুলের। সেটা পেরিয়ে গিয়ে ২০১৪ সালে এই দেশে টেস্টে খেলা শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারার ২০১৯ রানও টপকে নিজ মাটিতে সর্বোচ্চ রানের মালিক বনেন তামিম। ৪২টি বাউন্ডারির ৪০টি ৩০০-এর আগে, পরে মেরেছেন তিন ছক্কা। মোসাদ্দেক হোসেনের ২৮২ রানের ইনিংসের ৩৭ বাউন্ডারি ছিল এতদিন সর্বোচ্চ চারের মার। সেটাও ছাড়িয়ে গেছেন তামিম। মুমিনুল যখন ইনিংস ঘোষণা করেন, ততক্ষণ ৫৮৫ মিনিট ক্রিজে কেটেছে তামিমের, বল খেলেছেন ৪২৬টি।
চা বিরতির ঠিক আগে পূর্বাঞ্চলের প্রথম ইনিংস থামে ৩৪২ রানের লিড নিয়ে। আরও কিছু করার সুযোগ কি প্রাপ্য ছিল তামিমের?
‘আমার কাছে মনে হয় আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছি। ৩ উইকেটও ওদের পড়ে গিয়েছে। এখনো এটা ভালো উইকেট। ওদের শেষ ৭ উইকেট তুলে নিতে কাল (আজ) আমাদের খুব কষ্ট করতে হবে’Ñ মুমিনুলের সিদ্ধান্ত নিয়ে সাফ কথা তামিমের। প্রতিপক্ষ শেষ বিকেলে ১১৫ তুলেছে ৩ উইকেট হারিয়ে। এখনো ২২৭ রানে পিছিয়ে।
শেষটায় তামিম ভাবছিলেন ৩৪০ হলে মন্দ কি? তাই মারছিলেন। কিন্তু নিজের ব্যাটিংয়ের ওপর তার কতটা নিয়ন্ত্রণ ছিল সেটা শুনুন তামিমের কাছে, ‘আমি খুব প্রত্যয়ী ছিলাম। উইকেট খুব ভালো ছিল, উইকেট স্পিনিং ছিল না বা ভিন্ন কিছু আচরণ করছিল না। আমার কাছে মনে হয়েছে আমি বিষয়টা খুব সাধারণ রাখতে পেরেছি। ৩০০ রান করার পরেই আমি কিছু সুযোগ নিয়েছি। পুরো ইনিংসেই আমার কাছে মনে হয়নি আমাকে স্পেশাল কিছু করতে হবে। আমি ব্যাটিং করে গিয়েছি, ক্রিকেটিং শট খেলে গিয়েছি। আর সবসময় ছক্কা হাঁকানোর চেষ্টা না করে বাউন্ডারির সুযোগের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।’
এমন ইনিংস ব্যাটসম্যানকে তৃপ্ত করতে বাধ্য। তামিম যা চেয়েছেন তাই হয়েছে। ‘অবশ্যই এটা স্পেশাল অনুভূতির। আমি কখনো চিন্তা করিনি যে ট্রিপল হান্ড্রেড করব। স্বপ্ন সবারই থাকে। তবে এ ম্যাচেই হয়ে যাবে ভাবিনি।’ তামিম বলছিলেন, ‘আমি কত রান করেছি তার চেয়ে সন্তুষ্ট এই ভেবে যে আমি কীভাবে ব্যাট করেছি। আশা করব এই ফর্ম আমি ধরে রাখতে পারব।’
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে রকিবুল ও তামিম একসঙ্গে বড় হয়েছেন। রকিবুলের বয়স ৩২। তামিমের ৩০। রকিবুলকে পাশে রেখেই গতকাল শেষ বিকেলে তামিম বলছিলেন, ‘সত্যি বলতে কখনই ভাবিনি যে আমাকে ৩০০ করতে হবে। তবে আমি যখনই চিন্তা করতাম রকিবুলের ব্যাপারে যে আমাদের একজনই ৩০০ করেছেÑ আমরা সবসময়ই বলতাম কত ধৈর্য এর যে ৩০০ করে ফেলেছে! ৩০০ করা তো এত ইজি না। নরমালি আমাদের উইকেট স্লো থাকে, স্পিনিং থাকে। ৩০০ করাটা কঠিন হয়ে যায়। ফাস্ট উইকেট, আউটফিল্ড ফাস্ট থাকলে তুলনামূলক সহজ হয়।’
এখন নিজে করেছেন। ঘোর কাটছে না তবু। অবশ্য তামিম ব্যাট করতে করতে অনেক পরে গিয়ে ট্রিপল সেঞ্চুরি টার্গেট করেছেন। ‘যখন ২৬০-৭০ হয়ে গেছে তখনো এটা নিয়ে ভাবছিলাম না। ২৮০ যখন হলো তখন এটা নিয়ে চিন্তা করা শুরু করেছি।’ তামিম কারণও বললেন এমন ভাবনার, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছিল আমি এটা নিয়ে যদি বেশি চিন্তা করি তাহলে যে প্ল্যান নিয়ে আমি ব্যাটিং করছি তাতে বিঘœ ঘটবে বা অন্যভাবে খেলার চেষ্টা করব। আমি খেলাটাকে খুব সাধারণ রাখার চেষ্টা করেছি। সেটাই আমার পক্ষে এসেছে।’
কেউ বলতে পারেন দেশের বোলারদের খেলে এ ইনিংসের মূল্য আর কতটা! তামিমের কাছ থেকে জবাবটা নিতে পারেন তারা, ‘৩০০ রান করা যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই হোক, যে পর্যায়ে হোক খুব কঠিন। এটা যদি সহজ হতো তাহলে প্রতি মাসে আপনারা দেখতেন যে কেউ একজন ৩০০ করছে। এটা খুবই স্পেশাল। নিশ্চিতভাবেই এটা আমার হৃদয়ের বিশেষ জায়গাতে থাকবে।’
