আপনার কি এফডিসি ঘরানার বাংলা সিনেমা দেখার অভ্যাস আছে? সেসব সিনেমায় মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, নায়িকাকে ‘দুশ্চরিত্র’ প্রমাণ করে তার বিয়ে/প্রেম ভেঙে দিতে ভিলেন বা খলনায়ক ফটোগ্রাফ বা ছবির আশ্রয় নেয়। ছবিতে নায়িকার সঙ্গে অন্য কোনো পুরুষকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখা যায়। এই ছবি দেখে নায়িকার ‘দুশ্চরিত্র’ সম্পর্কে অন্যেরা জ্ঞাত হয়। এর ফলে, ‘নষ্ট চরিত্রের’ নারী ও তার পরিবারকে নিন্দা, অপমান ও অপদস্থ করা হয়। এই অবস্থায়, নায়িকা হয়তো প্রাণপণে বোঝাতে চেষ্টা করে: এই ছবি বানোয়াট, মিথ্যে, ষড়যন্ত্রমূলক। কিন্তু কেউ তার কথায় কর্ণপাত করে না। কথায় আছে, একটি ছবি হাজার শব্দের চেয়েও অধিক শক্তিশালী। তাই, কখনো-কখনো সিনেমায় দেখা যায়, অন্তরঙ্গ বা নগ্ন ছবি প্রকাশ করার ভয় দেখিয়ে নায়িকাকে দিয়ে খলনায়ক এমন কর্ম করিয়ে নেয় স্বাভাবিক অবস্থায় যা হয়তো নায়িকা করতে অনিচ্ছুক।
সিনেমা কোনো আজগুবি গপ্প নয়। সিনেমায় অনেক সময় ‘এক্সাজারেট’ বা ‘অতিরঞ্জন’ করে যা দেখানো হয়, তার কিছু না কিছু বাস্তবে ঘটে। বাংলাদেশে নারীর ‘আপত্তিকর’ ছবি দিয়ে তার ‘চরিত্র হনন’ এবং তার ‘পরিবারের সম্মান’ ‘ধুলোয় মিশিয়ে’ দেওয়া যায়। পুরুষের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ ছবিই নয়, এমনকি কোনো তরুণীর স্নানরত অবস্থার বা পোশাক পরিবর্তনের সময়ের ছবি দিয়েও মেয়েটি ও তার পরিবারকে জিম্মি করে ফেলা যায়। সে-রকমই একটি ঘটনার খবর আছে গত ২৮ জানুয়ারি অনলাইন পত্রিকা বাংলা ট্রিবিউনে। খবরের শিরোনাম, “সাবেক কর্মীর কাছে আড়ংয়ের ‘চেঞ্জ রুমে’র ১২০টি ভিডিও!”
জানা যাচ্ছে, সজীব নামের এক তরুণ এক সময় আড়ং-এর কর্মী ছিল। পরবর্তী সময়ে নারীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চাকরিচ্যুত হয়। সেই তরুণ ১৩ জন নারীকর্মীর ১২০টি ভিডিও গোপনে পোশাক পরিবর্তন করার রুম থেকে কৌশলে ধারণ করেছিল। এই ভিডিওগুলো দিয়ে ভিডিওতে থাকা নারীদের ব্ল্যাকমেইল করত। পত্রিকায় লিখেছে, ‘যাদের ভিডিও করা হয়েছে, তাদের কাছে সেই ভিডিও পাঠাত ফেইসবুকের মেসেঞ্জারে। কখনো অর্থ দাবি কখনো বিকৃত চাহিদার কথা জানাত তাদের’। এমন আরও বহু সজীব বাংলাদেশে আছে। তারা সবাই যে গোপনে ছবি ধারণ করে, এমন নয়। যাদের ক্ষমতা আছে তারা ধর্ষণদৃশ্যও ভিডিও করে। তারপর সেই ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে কখনো বারবার ধর্ষণ করে আবার কখনো ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে মেয়েটির ‘সম্মানহানির’ ভয় দেখিয়ে পুরো পরিবারকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করে।
উপসচিব এ কে এম রেজাউল করিম রতনের কাহিনীটা মনে আছে আপনাদের? মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ থাকার সময় কলেজেরই এক শিক্ষার্থীকে অচেতন করে ধর্ষণ করেন তিনি। শুধু তাই নয়, ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করেন। তারপর সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে এক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করেছেন তিনি। এই নিয়ে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ৭১ টেলিভিশনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেখানে সেক্সটোর্শানের শিকার মেয়েটির বক্তব্য আছে। ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা পুলিশও জানিয়েছে। এছাড়া এই ঘটনায় হওয়া মামলার বাদী ও বিবাদী পক্ষের বক্তব্যও রয়েছে। জামিন অযোগ্য এই মামলায় আসামি রতন কীভাবে জামিনে বাইরে আছেন এবং মেয়েটিকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন সেই বিষয়টিও এসেছে প্রতিবেদনে।
সেক্সটোর্শানের আরও দু-একটি ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছি দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা থেকে। ২০১৯ সালের ৯ জুনের খবর: ‘মাগুরা সদর উপজেলায় ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসে এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ধর্ষণের পর নগ্ন ছবি ও ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করার অভিযোগে আজ রোববার সদর থানায় মামলা হয়েছে’। ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বরের খবর বলছে: ‘পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর নগ্ন ছবি মুঠোফোনে ধারণ করে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে মেয়েটির বাবা চারজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন’। ২০১৩ সালের ২৩ জুলাইয়ে প্রকাশিত সংবাদ জানাচ্ছে: ‘বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর ওপর জোর খাটিয়ে মুঠোফোনে আপত্তিকর দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬০ হাজার টাকা চাঁদা না দিলে ওই ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে মেয়ের বাবাকে হুমকি দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। বিষয়টি এলাকায় জানাজানির পর ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিন তরুণ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন’।
সমাজে নারীর বিরুদ্ধে বহু রকমের লিঙ্গীয় সন্ত্রাস, নির্যাতন ও হয়রানি জারি আছে। সেগুলোরই একটি হলো সেক্সটোর্শান বা নারীর শরীরকে পুঁজি করে জোর-জবরদস্তি ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে যৌন বা অন্য কোনো সুবিধা আদায়। সেক্সটোর্শানের বিরুদ্ধে পৃথিবীর নানান দেশে বিভিন্ন সংগঠন সোচ্চার। সেক্সটোর্শানকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে এমনকি আইন-কানুনে এসেছে পরিবর্তন। সেক্সটোর্শানকে প্রতিহত করতে উদ্যোগ নিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ উইমেন জাজেস বা আইএডাব্লিউজে। নারীর জন্য সুবিচার নিশ্চিত করতে তারা পৃথিবীব্যাপী কাজ করছে। গত বছর কয়েক আগে সেক্সটোর্শান বিষয়ে তারা একটি টুলকিট বা কয়েক পৃষ্ঠার একটি ছোট অনলাইন পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে তারা সেক্সটোর্শানকে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং কোন কোন কাজ সেক্সটোর্শানের আওতাভুক্ত হবে আর সেক্সটোর্শানের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়তে হবে সে বিষয়েও বলা হয়েছে। শুধু নারীরাই নয়, আজকাল পুরুষরাও সেক্সটোর্শানের শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া, যে সব সমকামী ব্যক্তি নিজের যৌন-পরিচয় লোকজনকে জানাতে চান না তারাও সেক্সটোর্শানের শিকার হচ্ছেন।
আমেরিকা থেকে শুরু করে পৃথিবীর নানান দেশে সেক্সটোর্শানের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। তেমনি একজন সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি এন্থনি স্টেন্সেল। মেয়ে সেজে ফেইসবুকে পোজ দিয়ে ছেলে সহপাঠীদের সে প্রলুব্ধ করত এবং তাদের নগ্ন ছবি পাঠাতে বলত। যারা তার ফাঁদে পা দিয়ে নিজের নগ্ন ছবি বা যৌনাঙ্গের ছবি পাঠাত পরবর্তী সময়ে তাদের সেই ছবি প্রকাশের হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করত এবং স্ট্যান্সেলের সঙ্গে ওর্যাল সেক্স করতে বাধ্য করত। তার এই অপকর্মের খবর প্রকাশের পর অপরাধ প্রমাণিত হলে ২০১০ সালে তার ১৫ বছরের জেল হয়। এরকমই বিচার হওয়া আরেক অপরাধী লুইস মিজাঙ্গোস। বহু নারী ও কিশোরীর ব্যক্তিগত কম্পিউটার হ্যাক করে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সে হাতিয়ে নেয়। তারপর টার্গেট করে-করে সেই সব কিশোরী ও নারীকে তাদের নগ্ন ছবি পাঠাতে বলে। আর ছবি না পাঠালে তার হাতে থাকা ব্যক্তিগত সব তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। পরবর্তী সময়ে ধরা পড়ার পর ২০১১ সালে তার বিচার শুরু হয় এবং ৬ বছরের জেল হয়।
সেক্সটোর্শানের মতোই নারীর বিরুদ্ধে লিঙ্গীয় হয়রানির আরেক পন্থা ‘রিভেঞ্জ পর্ন’। ‘রিভেঞ্জ পর্ন’ এর বাংলা হতে পারে, ‘প্রতিশোধ মেটাতে হয়রানিমূলক আপত্তিকর ছবি’। কোনো নারীকে সামাজিকভাবে হেয় করতে তার অনুমতি ব্যতিরেকে তার কোনো আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হলে সেটিকে বলা হয় রিভেঞ্জ পর্ন। সাধারণত প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকেই এটি করা হয়। বিশেষ করে, কারও সঙ্গে প্রেম বা সম্পর্ক ভেঙে গেলে এরকম ঘটনা বেশি ঘটানো হয়। ‘রিভেঞ্জ পর্ন’ মানেই যে এখানে সবসময় শারীরিক মিলনের দৃশ্য থাকবে, এমন নয়। কোনো নারীর স্নানঘর থেকে গোপনে ধারণ করা নগ্ন স্থিরচিত্র তা যতই শৈল্পিক হোক না কেন যদি অনুমতি ব্যতিরেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেটিও রিভেঞ্জ পর্ন বলে বিবেচিত হবে। বাংলাদেশে রিভেঞ্জ পর্নের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে জনপ্রিয় অভিনেত্রী প্রভার সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুঃখজনক ঘটনা। সাবেক বাগদত্তকে বিয়ে না করে এই অভিনেত্রী তার পছন্দসই আরেক অভিনেতাকে বিয়ে করেন। এই বিয়ের পরপরই প্রভার সঙ্গে সাবেক বাগদত্তর শারীরিক সম্পর্কের একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তখন অভিযোগ উঠেছিল যে, ভিডিওতে থাকা পুরুষটিই রোষের বশবর্তী হয়ে এই ভিডিও ফাঁস করেছেন। তবে, সেই ঘটনায় ওই পুরুষের কোনো বিচার হয়েছিল বলে জানা যায়নি। কিন্তু ‘রিভেঞ্জ পর্ন’ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রিভেঞ্জ পর্নের বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতে অনলাইন এবং অফলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম একাট্টা হয়েছে। ২০১৫ সালে গুগল নতুন পলিসি বা নীতি নিয়ে জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে রিভেঞ্জ পর্ন অনলাইন থেকে মুছে দেওয়া হবে। একই বছর মাইক্রোসফটও এই নীতি ঘোষণা করে এবং রিভেঞ্জ পর্নের ভিকটিমদের জন্য অনলাইনে একটি ফর্ম ছাড়ে। ২০১৫ সালেই টুইটারও বিষয়টিকে চিহ্নিত করে এবং এ ধরনের অনুমতি ব্যতিরেকে প্রকাশ করা ছবি রিমুভ করার বা মুছে দেওয়ার নীতি নেয়।
রিভেঞ্জ পর্নের বিরুদ্ধে মানুষের সচেতনতা তৈরি করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন হলি জেকব্স। যিনি নিজেও ছিলেন রিভেঞ্জ পর্নের শিকার। রিভেঞ্জ পর্ন বা নন-কনসেন্সুয়াল পর্ন-এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে ২০১২ সালে মিজ জ্যাকব শুরু করেন ‘এন্ড রিভেন্জ পর্ন’ নামের একটি ক্যাম্পেইন। পরবর্তী সময়ে সেই ক্যাম্পেইন বা প্রচার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা থেকেই জন্ম নেয় বেসরকারি সংস্থা সাইবার সিভিল রাইটস অ্যাসোসিয়েশন। ২০১৪ সালে ক্রাইসিস হেল্পলাইন চালু করার পর প্রতি মাসে এই সংস্থাটি গড়ে ১০০ থেকে ২০০ ভিক্টিমকে যারা নন-কনসেন্সুয়াল পর্ন বা অনলাইনে হয়রানির শিকার নানাভাবে সহায়তা করেছে বলে জানা যায়।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিথিলার ব্যক্তিগত ছবি অন্তর্জালে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে। কারও সঙ্গে প্রেম থাকার সময় দু’জন মানুষ পারস্পরিক সম্মতিতে অনেক কিছুই করতে পারেন। তবে, তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভেঙে গেলে নারীটিকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্যই মূলত তখন সেই ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এটি অপরাধ। বর্তমানে ইন্টারনেটের জামানায় মুহূর্তেই ছবি ছড়িয়ে যেতে পারে। আর এসব ঘটনায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ভিকটিমের ঘটিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে এমনিতেই বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সংস্কৃতি বিরাজমান। এমনকি ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রেও তা লক্ষণীয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাগুলোকে সুস্পষ্টভাবে আমলে নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারের নজির তৈরি করা দরকার। নইলে, ইন্টারনেটের এই যুগে সামনের দিনগুলোতে এ ধরনের অপরাধ আরও বিস্তৃতরূপ লাভ করার আশঙ্কা রয়েছে।
লেখক
কবি ও সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
afroja. shoma@gmail. Com
