দেশের একমাত্র রেলওয়ে ট্রেনিং অ্যাকাডেমি (আরটিএ) দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। অর্থ ছাড়া এখানে কোনো ফাইল নড়ে না। সনদ-বাণিজ্যে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গেস্ট লেকচার, টিএলআর (কাজ নাই মজুরি নাই), মেট্রোরেল, জাতীয় দিবসের মতো বিভিন্ন খাত দেখিয়ে ভুয়া বিলের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের সদস্যরা হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, আরটিএর বর্তমান জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা আবুল কাশেম দীর্ঘদিন রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে জিম্মি করে রেখেছেন। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবুল কাশেম। আর রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) বলেছেন, রেলওয়েতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহরে অবস্থিত আরটিএ। স্টেশন মাস্টার থেকে বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস করে আবুল কাশেম পদোন্নতির মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনের ক্যাডারভুক্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হন। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতা প্রয়োজন হয়। আর এটিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহারিক বিষয়ে সনদ-বাণিজ্য গড়ে তোলেন কাশেম। অনেক রেলকর্মী নির্দিষ্ট সময়ে সফলতার সঙ্গে প্রশিক্ষণ শেষ করেও সনদ পাননি।
কিন্তু সিন্ডিকেটে টাকা ঢেলে প্রশিক্ষণ ছাড়াই সনদ পাওয়ার তথ্য রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক কর্মচারী জানান, প্রশিক্ষণের প্রতিটি কোর্সে আবুল কাশেম নির্দিষ্ট ফি ছাড়াও ক্লাসে উপস্থিতি, ব্যবহারিকসহ নানা খাত দেখিয়ে রেলওয়ের অর্থ লোপাট করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাকাডেমিতে আবুল কাশেমের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন প্রধান অফিস সহকারী (সদ্য পদোন্নতি পাওয়া) মেহেরুন আকতার, এমএলএসএস (টিএলআর) রোকেয়া বেগম রুবি, টিপু সুলতান, আলাউদ্দিন, আনিসুর রহমান, আলাউদ্দিন ও সুজিত চন্দ্র নাথ। তারা ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে আরটিএর (সম্প্রতি অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়া) রেক্টর আনোয়ার হোসেন, সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জোবেদা আক্তারসহ কয়েকজনকে ম্যানেজ করে নানা অনিয়ম করে আসছেন। অভিযোগ রয়েছে, ট্রেনিং অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থীরা ফেল করলেও অর্থের বিনিময়ে সিন্ডিকেটের সদস্যরা পাস করিয়ে দেন। বিভিন্ন দিবসে রেলওয়ে আরটিএর জন্য বরাদ্দ দেয়। কিন্তু কোনো কর্মসূচি না করেই সেই অর্থ ভুয়া ভাউচারে তুলে নেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, রাজধানীর চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের নিয়োগ পাওয়াদের আরটিএতে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। এ জন্য কোর্সবাবদ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশিক্ষণ না দিয়ে যানবাহন, পণ্য কেনা ছাড়াও বিভিন্ন ভুয়া বিল দেখিয়ে এসব অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আরটিএর সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, আবুল কাশেম দপ্তরে বসে ফাইল সই করেন। তার পাশের চেয়ারে বসে ফাইল গুনে উৎকোচ নেন মেহেরুন আকতার। নির্দেশমতো সব আগে থেকেই তিনি ঠিক করে রাখেন।
নিয়োগ-বাণিজ্য : গত বছরের সেপ্টেম্বরে এমএলএসএস পদে মোটা অঙ্ক ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে টিএলআর পদে নিয়োগ পান রোকেয়া বেগম রুবি, টিপু সুলতান, মো. আলাউদ্দিন, মো. আনিসুর রহমান ও মো. আলাউদ্দিন। তাদের মধ্যে টিপুর বাবা মো. ওমর আলী আরটিএর উচ্চমান সহকারী ছিলেন। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর তিনি অবসরে গেলেও আবুল কাশেমের বদান্যতায় নিয়মিত অফিস করছেন। তাকে দিয়ে আবুল কাশেম বিভিন্নজনের সঙ্গে দেনদরবার করান। তার ছেলে অফিস না করলেও হাজিরা খাতায় নাম রয়েছে। রোকেয়া বেগমের স্বামী মো. বেলাল হোসেন মেট্রোরেলের কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে বাবার পরিচয়ে চাকরি নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, আবুল কাশেমকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রোকেয়া চাকরি পেয়েছেন। তার মতো বর্তমানে কর্মরত ৫টি এলআরের প্রত্যেকের থেকে টাকা নিয়েছেন আবুল কাশেম। শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। কিন্তু এই পাঁচজনকে উপস্থিত দেখিয়ে প্রতি মাসে বিল করা হচ্ছে।
অতিথি বক্তার ফি : অ্যাকাডেমিতে অতিথি বক্তাদের সম্মানী বাবদ মাসে ২ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত ক্লাস হয় না। অনুমোদন ছাড়াই ক্লাস রুটিন পরিবর্তন হয়। অতিথি বক্তা না এনেও ভুয়া ব্যক্তিদের নাম দেখিয়ে অর্থ নয়ছয় করেন আবুল কাশেম গংরা। এমনকি টিআরও (ট্রেনিং অফিসার ট্রাফিক) থাকাকালে নিজে অবৈধভাবে টিআরও মেকানিক্যাল হিসেবে লেকচার ফি নিয়েছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আবুল কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এখানে সবকিছু কঠোর নিয়ম মেনে হয়। নতুন কোনো খাত তৈরি করে বিল হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আরটিএ’তে কোনো সিন্ডিকেট নেই। যেসব নাম এসেছে, তারা প্রত্যেকে বৈধভাবে চাকরি পেয়েছেন। নিয়োগের ক্ষেত্রেও সব নিয়ম মানা হয়েছে।’
এ বিষয়ে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ) মো. জহুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলওয়ের অর্থ লুটপাট মেনে নেওয়া হবে না। ডিজি দেশের বাইরে আছেন। তিনি আসার পর আরটিএর দুর্নীতি বিষয়ে জানানো হবে। এরপর তদন্তে কারও জড়িত পাওয়া গেছে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
