বেতন কি কখনো কমে?

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:২৩ পিএম

ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে বেসিক ব্যাংক লিমিটেড ১৯৮৯ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে একটি বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাংকের সংঘ বিধি/সংঘ স্মারক মোতাবেক ৫০% শতাংশ ঋণযোগ্য তহবিল ক্ষুদ্র এবং মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগযোগ্য; যা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বর্তমানে দেশের অনেক সফল উদ্যোক্তা বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং দেশের কর্মসংস্থানেও এই ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সূচনালগ্ন থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আর্থিক সূচকসমূহের ক্রমোন্নতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকিং সেক্টরে একটি স্বচ্ছ, লাভজনক এবং ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে বেসিক ব্যাংক ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে ৫৩.৮০ কোটি টাকা নগদ ডিভিডেন্ড ও ২৮৬.৭০ কোটি টাকা স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান এবং ২০১৯ পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব খাতে ৮২৩.৩৫ কোটি টাকা করপোরেট আয়কর পরিশোধ করেছে। ২০১৪ সাল থেকে একটি শতভাগ রাষ্ট্র মালিকানাধীন তফসিলভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, বিশেষায়িত মোড়ক থেকে বেরিয়ে আসে। সংবাদমাধ্যমের বরাতে এ কথা সবাই জানে যে, ২০১০ সাল থেকে জুন’ ২০১৪ সময়কালে ব্যাংকটিতে কীভাবে বেশ কিছু অনিয়ম সংঘটিত হয়, যার ফলে ব্যাংকের আর্থিক সূচকসমূহের অবনতি ঘটে। ফলে, বেসিক ব্যাংক ২০১৪ সালে প্রথম ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ব্যাংক ২০১৩, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে পরিচালন মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। বিগত দিনে ব্যাংকটিতে আর্থিক/তারল্য সংকট থাকলেও বর্তমানে ব্যাংকটি তার অধিকাংশই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর, ২০১৯ সময়ে) ব্যাংকের আমানত ১২,৮৭০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৮৭২ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ডিসেম্বর ৩১,২০১৯ তারিখে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩,৭৪২ কোটি টাকা। ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়ে তার শতকরা হার দাঁড়িয়েছে ৪৯.৪৬%, যা ডিসেম্বর ৩১,২০১৮ তারিখে ছিল ৫৬.৮৫%। এছাড়াও, জুন ’২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ’২০১৯ সময়কালে ব্যাংকের লোকসানি শাখা ৩৩টি থেকে  হ্রাস পেয়ে ২৭টিতে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে শুধু ডিসেম্বর ’২০১৯ মাসে লোকসানি শাখার সংখ্যা মাত্র ১৩টি। অর্থাৎ ব্যাংকের অধিকাংশ শাখা লাভজনক শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে।

এক্ষেত্রে, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে পরিচালন মুনাফা অর্জিত হলেও ২০১৪ সালের পর থেকে ব্যাংকের কর্মীদের কোনোরূপ প্রণোদনামূলক বোনাস প্রদান করা হয়নি। চাকরি বিধিমালায় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও গত দুই বছরে অর্থাৎ ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে ব্যাংকের পদোন্নতি কার্যক্রমও পরিচালিত হয়নি। এ সময়ে মূল্যস্ফীতিসহ অন্যান্য কারণে ব্যাংকের সবারই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, সন্তানদের শিক্ষাসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল ব্যয়ও প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়াও, ব্যাংকের কর্মীরা তাদের বেতন কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে গৃহনির্মাণ ঋণসহ বিবিধ ঋণ গ্রহণ করেছে, যার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ মাস ভিত্তিক কিস্তিপ্রদান করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের উচ্চতর স্কেলে নতুন পে-স্কেল প্রদান করা বাঞ্ছনীয় ছিল। অথচ, সেই বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বরং বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বর্তমানে যে বেতন পান তা সব স্তরেই আরও কমানোর একটি নির্দেশনা জারি করেছে, যা সবার মৌলিক অধিকার ক্ষুণœসহ সবাইকে সংক্ষুব্ধ করেছে। কোনোরূপ পূর্ব ঘোষণা ব্যতিরেকেই ডিসেম্বর ২২, ২০১৯ তারিখে রাত প্রায় ১০টার সময় ব্যাংকের সব কর্মকর্তার বেতন-ভাতা কমানোর জন্য একটি নির্দেশ প্রদান করা হয়, যা ‘ডিসেম্বর ২২, ২০১৯’ তারিখ থেকেই কার্যকর হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। এটি কার্যকর করা হলে সর্বস্তরের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রায় ৩০% থেকে ৭০% পর্যন্ত হ্রাস পাবে। উল্লেখ্য, হাইকোর্টে বিষয়টা নিয়ে মামলা হয়েছে এবং বিচারাধীন আছে। সূচনালগ্ন থেকেই বেসিক ব্যাংক লিমিটেড স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পেয়ে আসা একটি ব্যাংক যেখানে অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মকর্তা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ব্যাংকে যোগদান করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংকটিতে সহস্রাধিক শিক্ষিত বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। ব্যাংকের সব কর্মচারীর বেতন-ভাতা কমানো হলে তা সামগ্রিকভাবে একদিকে যেমন সব কর্মকর্তার মনোবল ভেঙে দেবে; অন্যদিকে ব্যাংকের সুনামও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে তথা সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের ব্যবসা এবং কর্মকর্তাদের বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। প্রায় ২১০০ পরিবার রাতারাতি পথে বসে যাওয়ার উপক্রম হবে। বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতন কমানো সংক্রান্ত পরিচালনা পর্ষদের অমানবিক সিদ্ধান্তটি বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসংগতিপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সরকার ২০২০ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। আর আগামী বছর ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উদযাপিত হবে। ‘মুজিব বর্ষ’ এবং ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’ উদযাপন উপলক্ষে যেখানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতনভাতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, সেখানে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতন কমানো সংক্রান্ত পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তটি খুবই অমানবিক।

পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তা/কর্মচারীদের যোগ্যতা ও দক্ষতাসহ নেতৃত্বগুণ থাকলে তা ব্যাংকের সার্বিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আনয়ন করে থাকে। বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজমেন্ট ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম যথা আমানত সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়, ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ, যথাযথ নিয়মকানুন পালন করে ঋণ অবলোপনসহ ব্যাংকের আয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের ওপর যথাযথ মনোযোগ না দিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের বেতন কমানোর মাধ্যমে খরচ কমিয়ে ব্যাংকের লোকসান কমানোর চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হয়। ব্যাংকের বর্তমান কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমানো হলে তা হবে ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সেক্ষেত্রে যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা অত্র ব্যাংক হতে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে যা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উল্লেখ্য, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মুনাফা অর্জনে সক্ষম না হওয়ার কারণে তার কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এরূপ উদাহরণ এদেশে আছে বলে আমাদের জানা নেই। তবে বেসিক ব্যাংক ছাড়াও একাধিক সরকারি বা রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পেয়ে আসছে। এক্ষেত্রে, বেসিক ব্যাংকের বেতন-ভাতা কমানো বিষয়টি কার্যকর করা হলে অন্যান্য সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং সর্বোপরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। গত ১৪ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা জনাব রফিউদ্দিন আরিফ মৃত্যুবরণ করেছেন। উল্লেখ্য, গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত মোট কেববলমাত্র ২১ দিনের মধ্যে ১২ জন (কর্মকর্তা/কর্মচারীর পরিবারের সদস্য) মারা গেছেন এবং বেশ কিছু কর্মকর্তা/কর্মচারী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অর্থাৎ যদি এভাবে বলা যায় ২২ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে বেসিক ব্যাংকের বেতন কমানোর খবরে অসুস্থ হয়ে তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অথবা মৃত্যুবরণকারীরা এই ধাক্কা সামলে নিতে পারেনি; সেটা কি অমূলক হবে? অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে লাভে আনা যায় তার নানাবিধ পন্থা আছে, তাই বলে কি বেতন কমিয়ে?

লেখক : ব্যাংকার ও গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত