কম ভোট নিয়ে গবেষণা করবে আওয়ামী লীগ

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:৫৯ এএম

সদ্য সমাপ্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কম ভোট পড়ার বিষয়টি সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথমে বিষয়টি আমলে না নিলেও এখন তা নিয়ে আওয়ামী লীগ ভাবছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। তারা বলছেন, গত কয়েকটি নির্বাচনে কম ভোট পড়া নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা গণমাধ্যমে যাই বলুক না কেন বিষয়টি তাদেরও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করবে আওয়ামী লীগ।

পাঁচ বছর আগে ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল তিন সিটিতে এক দিনেই ব্যালটে যে ভোট হয় তাতে গড়ে ভোট পড়েছিল ৪৩%। সেবার ঢাকা উত্তরে ভোট পড়েছিল

৩৭%; দক্ষিণে ৪৮% এবং চট্টগ্রামে ৪৭%। ২০১৯ সালে ঢাকা উত্তরের মেয়র পদের উপনির্বাচনে ভোট পড়ে ৩১%। গত ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে সব কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট হয়, ভোট পড়ে ২২.৯৪%। সর্বশেষ ইভিএমে ঢাকা সিটি নির্বাচনে উত্তরে ২৫.৩০% এবং দক্ষিণে ২৯% পড়েছে। এ হিসাবে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার কমসংখ্যক ভোটারের সমর্থন নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের দুই প্রার্থীকে। এ নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটি বলছে, নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে ৭-৯ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। নির্বাচন কমিশন ২৪ শতাংশ দেখিয়েছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অভিযোগ করেছে, নির্বাচনে ৫-৭ শতাংশ ভোট পড়েছে; বাকিটা জাল।

গত বৃহস্পতিবার এক সবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, টার্ন আউট কম হতে পারে। কারণ ইভিএম আমাদের এখানে প্রথম অভিজ্ঞতা, পুরো ঢাকায় ইভিএম এর আগে ব্যবহার হয়নি। নতুন সিস্টেমের একটি বিষয় আছে। ছুটির বিষয় ছিল। এসএসসি পরীক্ষার কারণে অনেকে ছেলেমেয়ের জন্য গ্রামে চলে গেছেন। এ রকম কিছু কিছু অবস্থার উদ্ভব হয়েছে। আর আমাদের মধ্যেও দুর্বলতা অবশ্যই আছে। সেটা আমরা খতিয়ে দেখব। ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করব।

কম ভোট পড়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের নেতাকর্মীদের আচরণে ত্যাগী একটি অংশও রাজনীতিবিমুখ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তিনি বলেন, ‘আমরা যাই বলি আমাদের দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ভোট দিতে না যাওয়ার কারণ নানা ধরনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের যারা প্রচারে ছিলেন, খোঁজ মিলেছে তাদের অনেকেই যাননি ভোট দিতে। সুতরাং দলের মানুষের ভেতরই তো রাজনীতিবিমুখতা দেখা দিয়েছে। সভাপতিম-লীর এই সদস্য বলেন, এগুলো কেন হচ্ছে সেটাও খুঁজে বের করতে হবে। আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলের অভ্যন্তরে আলোচনায় কম ভোট পড়ার ব্যাপারটি উঠে এসেছে। কিন্তু ঢাকা সিটির দলীয় মেয়র প্রার্থীর বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারেÑ এই চিন্তায় ভোট কম পড়ার ব্যাপারে নানা খোঁড়া যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। কারণ মেয়রদের বিজয়কে ‘ডিফেন্ড’ করে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কম ভোট পড়ার কারণ খতিয়ে দেখতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর এক সদস্য বলেন, কম ভোট পড়ার ব্যাপারটি কেন ঘটছে দলের গবেষণা সেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এ দায়িত্ব দেওয়া হবে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য এমন কয়েকজনও জানান, শহর এলাকা ছাড়াও নিজেদের নির্বাচনী এলাকায়ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা জরিপ চালাবেন কম ভোট পড়ার কারণ খুঁজে বের করতে।

ক্ষমতাসীন দলটির সম্পাদকম-লীর চার সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, এটা কি রাজনীতি থেকে জনগণের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত কিনা সেটা আমলে নিয়ে কম ভোট পড়ার কারণ বিশ্লেষণ করছেন তারা। দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটের দুই দিন পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভোট কম পড়ার প্রকৃত কারণ জানতে চান এবং একটি সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করেন।’

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এ ধরনের রাজনৈতিক আচরণ মানুষের ভেতরে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনা, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে তাদের ক্রমাগত ব্যর্থতা ও কমিশনের ক্ষমতার অপব্যবহার ভোটারদের ভেতরে এক ধরনের অবিশ্বাস জন্ম নিয়েছে। তিনি বলেন, ভোটাররা মনে করে ভোট দিতে গিয়ে লাভটা কী? বরং সময়ের অপচয়। তিনি আরও বলেন, এটাকে এক ধরনের রাজনৈতিকবিমুখতা বলা যায়। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কী করতে হবেÑ এমন প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীল হতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এজন্য সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির সংস্কার প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত