হিন্দুধর্মাবলম্বীদের পূজাপদ্ধতি, হিন্দু আইন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও নেতৃত্বদানের সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৪২ হাজার পুরোহিত ও সেবায়েতকে প্রশিক্ষণে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এর ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তিন বছরমেয়াদি এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ছাড়াও ১ হাজার ৬০০ পুরোহিত ও সেবায়েতকে মাসিক ২৫ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্ট এটির বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাবে। যদিও ২৫ কোটি টাকার বেশি কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির নিয়ম রয়েছে, কিন্তু এই প্রকল্পে তা করা হয়নি। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে পরিকল্পনা
কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি নাগাদ বাস্তবায়নের জন্য ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প প্রস্তাব করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুসারে ২৫ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হয়। কিন্তু এই প্রকল্পে তা করা হয়নি। এ ছাড়া এর আগেও একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেটির সফলতা বা অর্জন কতটুকু সেটিও উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লেখ করা হয়নি।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়ম অনুসারে ৫০ কোটি টাকার মধ্যের যেকোনো প্রকল্প পরিকল্পনামন্ত্রী নিজ ক্ষমতা বলে অনুমোদন করতে পারেন। সেটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রয়োজন হয় না, অনুমোদনের পর অবগত করলেই চলে। আলোচ্য প্রকল্পের ব্যয় আর মাত্র ৪৩ হাজার টাকা বেশি ধরা হলেই একনেকে উপস্থাপন করতে হতো। কিন্তু জটিলতা এড়াতে ব্যয় সামান্য কম ধরা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একনেক অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের চেয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া কিছুটা সহজ। এ জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে এই প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার কম ধরা হয়েছে।
ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় ছয়টি নির্ধারিত বিষয়ে পুরোহিত ও সেবায়েতদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে হিন্দু আইন ও পূজাপদ্ধতি, ভূমি আইন, আইসিটি ও ডিজিটাল বাংলাদেশ, সামাজিক মূল্যবোধ, কৃষি ও বনায়ন, গবাদিপশু পালন, খাদ্যপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা।
ডিপিপি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় ৩৮ হাজার ৪০ জন পুরোহিতকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। ৩ বছরে ২৫ জন করে মোট ১ হাজার ৫৩৬টি ব্যাচে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া ৩ হাজার ৯৮ জন সেবায়েতকেও নির্ধারিত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ৪১ হাজার ৪৯৮ জন প্রশিক্ষণ পাবেন।
প্রকল্পের খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪১ হাজার ৪৯৮ জনকে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ১ হাজার ৬০০ জন পুরোহিত ও সেবায়েতকে ২৫ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা বাবদ ধরা হয়েছে মোট ৪ কোটি ৩ হাজার টাকা। প্রশিক্ষণ দিতে ৬ হাজার ২৯২টি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির সদস্যদের সম্মানী বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা। ১৩ হাজার ৫৬টি বইপত্র বিতরণ করা হবে, এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। আপ্যায়ন বাবদ ধরা হয়েছে ৮ লাখ টাকা। এসব কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ১০৩ জন কর্মচারী আউটসোর্সিং করা হবে, তাদের বেতন বাবদ ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ৩৭ জন জুনিয়র কনসালট্যান্টের বেতন বাবদ ধরা হয়েছে ৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৪৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা ও বিবিধ খাতে ৪৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির আওতায় বেশ কিছু খাতের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে পিইসি সভায়। এর মধ্যে প্রকল্পের কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি, সেটি নিয়মের ব্যত্যয়। এর আগেই একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেটির মাধ্যমে কী কী কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে, সাফল্যই-বা কতটুকু, তা ডিপিপিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়েও জানতে চাওয়া হবে। প্রশিক্ষণের সার্বিক রূপরেখা, আয়োজন ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল আছে কি না, সেটিও উল্লেখ করা হয়নি ডিপিপিতে। ৩৭ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও ১০৩ জন কর্মচারীর বেতন বাবদ ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে, ১ হাজার ৬০০ জন পুরোহিত-সেবায়েতের ভাতা বাবদ বরাদ্দ দাবি, ১৪০ জন নিয়োগ বাবদ ৭ লাখ টাকা ও দুজনের কার্যভার ভাতা বাবদ ১ লাখ ৮ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে; যার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হয়নি। এ ছাড়া মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিবিধ খাতের ব্যয় প্রস্তাবের যৌক্তিকতাও জানতে চাইবে পিইসি সভা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। তবে এ সম্পর্কে আমি এখনো বিস্তারিত জানি না। জানার পর মন্তব্য করতে পারব।’
পরিকল্পনা কমিশনের শিক্ষা উইংয়ের উপপ্রধান প্রভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘২৩ ফেব্রুয়ারি কমিশনের আর্থসামাজিক বিভাগের সদস্যের সভাপতিত্বে এই প্রকল্প নিয়ে পিইসি সভা হবে। সভায় প্রস্তাবের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।’
তবে এ বিষয়ে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব বিষ্ণু কুমার সরকারের বক্তব্য জানতে যোগযোগ করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।
