পুঁজিবাজারে বিদ্যমান তারল্যসংকট কাটাতে ব্যাংক ও মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেপোর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নিতে পারবে। এই তহবিল পাঁচ বছর ব্যবহার করতে পারবে ব্যাংকগুলো। পুঁজিবাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নয়ন ও বাজার মধ্যস্থতাকারীদের তারল্যসহায়তার অংশ হিসেবে এ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তহবিলের অর্থ শুধু পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তহবিল গঠন ও এর ব্যবহারসংক্রান্ত বিষয়ে সার্কুলার জারি করা হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, তফসিলি ব্যাংকগুলো নিজস্ব উৎস অথবা ধারণকৃত ট্রেজারি বিল অথবা বন্ড রেপোর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করতে পারবে। এ তহবিল থেকে বিনিয়োগ পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে। এ সুবিধা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে। এ ক্ষেত্রে রেপোর সুদহার ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কোনো নিলামের প্রয়োজন হবে না।
অবশ্য ট্রেজারি বিল ও বন্ডের রেপো মূল্যের ৫ শতাংশ মার্জিন হিসেবে রেখে তারল্য সুবিধা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুসারে সর্বোচ্চ ৯০ দিন মেয়াদি রেপো প্রদান করা হবে, যা ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পুনঃনবায়নের সুবিধা থাকবে।
ব্যাংকগুলো নিজস্ব বিবেচনা ও সুবিধা অনুসারে তহবিল ব্যবহার করতে পারবে। তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পুঁজিবাজারের সার্বিক স্বার্থে ওই তহবিলের ন্যূনতম ১০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ডে ও ১০ শতাংশ স্পেশাল পার্পাস ফান্ডের মাধ্যমে স্বীকৃত কোনো সম্পদের বিপরীতে ইস্যুকৃত সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হবে।
কোনো তফসিলি ব্যাংক কর্তৃক গঠন করা তহবিলের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ব্যাংকের নিজস্ব পোর্টফোলিওতে ব্যবহার করতে পারবে। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য ঋণ হিসেবে তহবিলের ২০ শতাংশ দেওয়া যাবে। অন্য ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিওর জন্য ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য তহবিলের ১০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া যাবে। এই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক, তার সাবসিডিয়ারি ও অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব পোর্টফোলিও গঠনের জন্য পৃথক বিও (বেনিফিসিয়ারি ওনার্স) হিসাব খুলতে হবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওই পোর্টফোলিওর বাজারভিত্তিক পুনঃমূল্যায়ন বন্ধ থাকবে। তবে ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করতে হবে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠিত তহবিল থেকে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিকে দেওয়া ঋণের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ। ঋণসীমার সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ২০২৫ সালে ৯ ফেব্রুয়ারি। অন্যান্য তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারসংক্রান্ত সাবসিডিয়ারি এবং অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজকে দেওয়া ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ও মেয়াদ একই থাকবে। তবে ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বিও হিসাবের সমুদয় সিকিউরিটিজের স্থিতি ঋণপ্রদানকারী ব্যাংক বাজেয়াপ্ত করতে পারবে।
তহবিলের অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্তারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই তহবিল ব্যবহার করে কোনো ব্যাংক বা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নিজ ব্যাংকের কোনো শেয়ার ক্রয় করতে পারবে না। অন্য কোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ইস্যুকৃত শেয়ারের ২ শতাংশের বেশি ক্রয় করা যাবে না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে তালিকাভুক্ত অন্য কোনো কোম্পানির ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ক্রয় করা যাবে না। ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি নয় এমন মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২ শতাংশের বেশি শেয়ার ক্রয় করতে পারবে না।
কোনো মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের ১০ শতাংশ ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডে ১৫ শতাংশের বেশি ইউনিট ক্রয় করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে যেসব মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড গত তিন বছর টানা ন্যূনতম ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে, সেসব ফান্ডে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে। এ ছাড়া যেসব বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের নিট সম্পদ মূল্য অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি রয়েছে এবং গত তিন বছর ন্যূনতম ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে, সেসব ফান্ডে ওই বিশেষ তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে।
এ ছাড়া ইকুয়িটি শেয়ারের ক্ষেত্রে যেসব কোম্পানি গত ৩ বছর টানা ন্যূনতম ১০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করেছে এবং যেসব কোম্পানির অনূর্ধ্ব ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ফ্রি-ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ার রয়েছে, সেসব কোম্পানি ব্যতীত অন্য কোম্পানির শেয়ারে ওই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে না। এ ছাড়া ন্যূনতম ১০ শতাংশ কুপন বা সুদবাহী তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ড বা ডিবেঞ্চার এবং যেকোনো মেয়াদের ও কুপনবাহী সরকারি বন্ড বা বিলে তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ করা যাবে।
বিশেষ এই তহবিল থেকে ব্যাংক কর্তৃক সাবসিডিয়ারি কোম্পানি, অন্য মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজে প্রদত্ত ঋণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার একক সীমাসহ প্রচলিত সব ঋণ প্রদানের বিধি অনুসরণ করতে হবে। ঋণগ্রহীতার একক সীমার মধ্যে কোনো মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজকে দেওয়া ঋণ ওই প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের ১০০ ভাগের বেশি হতে পারবে না। একাধিক উৎস থেকে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ ওই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবে, তবে তা ঋণগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধনের বেশি হতে পারবে না। একাধিক উৎস থেকে ঋণ নিলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা বিও হিসাব খুলতে হবে।
