বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একদিকে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটছে আর সমানতালে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বর্ণবাদ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও আধিপত্য। ফলে বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলো আধিপত্যকামী দেশগুলোর আগ্রহের বিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। গত কয়েক বছর থেকে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক টার্গেটে পরিণত হয়েছে প্রাণ-প্রকৃতি ও খনিজে ভরপুর আফ্রিকা মহাদেশের দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলো। আফ্রিকার দেশগুলো পুঁজি বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির টার্গেটে পরিণত হওয়ার পেছনে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে তেমনি উক্ত দেশগুলোর ওপর ভূ-রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বিষয়টিও জড়িত রয়েছে। এই লক্ষ্যগুলোই সামনে রেখে দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার দেশগুলোতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেছে বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলো।
গত ৩১ জানুয়ারি ব্রিটেনের ব্রেক্সিট চূড়ান্ত হয়েছে। এর ফলে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে বড় একটা ধাক্কার কথা আগে থেকেই বিশ্লেষকরা বলে আসছিলেন। এই ধাক্কা সামলাতেই ব্রিটেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে নতুন উদ্যমে বাণিজ্য সম্পর্কে জড়াতে চাচ্ছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির এই লক্ষ্য থেকেই দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন টার্গেট করেছেন পুরনো উপনিবেশ আফ্রিকার দেশগুলোকে। প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন গত ২০ জানুয়ারি লন্ডনে একটি ‘বিনিয়োগ সম্মেলন’ ডাকেন। যেখানে তিনি আফ্রিকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ করেছিলেন। বরিস জনসনের ডাকে সাড়া দিয়ে মিসর, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া ও রুয়ান্ডাসহ আরও বেশ কিছু বন্ধুভাবাপন্ন আফ্রিকান দেশের নেতারা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (সিডিসি) দ্বারা পরিচালিত প্রাইভেট-ইক্যুইটি গ্রুপ ২০২২ সালের মধ্যে আফ্রিকায় বৃহত্তম একক বিনিয়োগকারী হওয়ার চেষ্টা করছে। আফ্রিকায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ২০১৪ সাল থেকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের পর চতুর্থ অবস্থানে ছিল ব্রিটেন। তবে ২০১৮ সালে এ হিসাব পাল্টে আফ্রিকায় চীনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ হয়েছে ভারত; যুক্তরাষ্ট্র এখন তৃতীয় অবস্থানে, ব্রিটেন চতুর্থ অবস্থানে আর ফ্রান্সের অবস্থান সপ্তম।
কূটনৈতিক মিশনে অবশ্য আফ্রিকায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে ব্রিটেন। ‘ফরেন পলিসি’ সাময়িকীর তথ্য মতে, ২০১৪ সালে আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে ৩১টি দেশে ২৩১ জন কূটনীতিক রয়েছেন ব্রিটেনের। এর মধ্যে ১৬টিতে মাত্র এক বা দুজন করে কূটনীতিক রয়েছেন। ইতিমধ্যে আরও ৫টি দেশে ব্রিটেন পুনরায় মিশন খুলেছে। আফ্রিকায় কূটনৈতিক মিশনের ক্ষেত্রে ব্রিটেনের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে ফ্রান্স। ২০১৮ সালের হিসাব মতে, সাব-সাহারার দক্ষিণাঞ্চলে ফ্রান্সের ৪২টির মতো দূতাবাসে ৩৭৩ জন কূটনীতিক রয়েছেন। আফ্রিকায় বিনিয়োগ ও কূটনৈতিকভাবে আধিপত্য বিস্তারকামী দেশগুলোর মহাদেশটি জুড়ে দূতাবাস খোলার হিড়িক পড়েছে। ২০১৫ সালে থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মহাদেশটিতে ৩৬০টির বেশি দূতাবাস খোলা হয়েছে। যা বিশ্বের অন্য কোনো মহাদেশে বিরল। উক্ত সময়ের মধ্যে তুরস্ক একাই ২৬টি দূতাবাস খুলেছে। বর্তমানে তুর্কি এয়ারলাইনস ৫০টির বেশি আফ্রিকান বন্দরে যাত্রী বহন করছে। আফ্রিকা জুড়ে ২০১৮ সালে ভারত ১৮টি দূতাবাস খুলেছে। রাশিয়া তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোকে কেন্দ্র করে ‘আফ্রিকান সামিট’-এর ১৯টি দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে। উক্ত অঞ্চল থেকে রাশিয়া সৈন্য ভাড়া করার কাজও করছে। আফ্রিকায় কূটনৈতিক মিশনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে চীন। বর্তমানে সাব-সাহারা অঞ্চলের ৪৫টি দেশের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি চুক্তি রয়েছে এবং এই অঞ্চলের সর্ববৃহৎ অস্ত্রের জোগানদাতা দেশ হচ্ছে চীন। চীন দেশের বাইরে প্রথম সেনাঘাঁটি নির্মাণ করেছে আফ্রিকার জিবুতিতে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে চীন-আফ্রিকা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং আফ্রিকায় ৬০ বিলিয়ন অর্থ সহায়তার কথা জানিয়েছেন। চীনের এমন আর্থিক সহায়তা ঘিরে ইতিমধ্যে গুঞ্জন উঠেছে, চীন স্বীয় ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতেই আফ্রিকার দেশগুলোকে ব্যাপক সহায়তা দানের মাধ্যমে নিজস্ব বলয়ে টানছে।
অন্যদিকে আফ্রিকাকে ঘিরে গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়া নতুন পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। গত বছর অক্টোবরে রাশিয়ার সোচি শহরে রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনে পুতিন আফ্রিকার সঙ্গে দ্বিগুণ বাণিজ্য বৃদ্ধির কথা জানান। ওই সম্মেলনে আফ্রিকার ৫৪টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেয়। ইতিমধ্যে রাশিয়ার বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো ঘানা ও নাইজেরিয়াতে তেল উত্তোলনের কাজ করছে। কিছু প্রতিষ্ঠান অ্যাঙ্গোলায় হীরা বাণিজ্য ও পুরো আফ্রিকার সঙ্গে নিকেল উৎপাদনে জড়িত। এশিয়ার উঠতি অর্থনৈতিক শক্তি ভারতও আফ্রিকায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ এগিয়েছে। সরকারের সহায়তায় ভারতের বিভিন্ন করপোরেশন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আফ্রিকায় ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেছে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ভিত্তিক দৈনিক ‘নয় স্যুরশার সাইটুং’ পত্রিকার বরাতে জানা যাচ্ছে, ভারতের আর্সেলর মিত্তল, বেদান্ত রিসোর্সেস, টাটা, তেল কোম্পানি ও এনজিসি তাদের বিদেশি বিনিয়োগের এক-তৃতীয়াংশ করছে আফ্রিকার দেশগুলোতে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ করছে বন্দর ও রেললাইন নির্মাণ, তেল শোধনাগার ও পাইপলাইন নির্মাণের কাজে। বর্তমানে আফ্রিকায় ভারতের বিনিয়োগ ৯৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার (১৯৯১ সাল) থেকে বেড়ে বার্ষিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বার্ষিক আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশের মতো। আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আগ্রহ মূলত মহাদেশটির বিপুল কাঁচামালের মজুদ ঘিরে। ভারতীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো আফ্রিকায় তেল, কয়লা ও তামাসহ অন্যান্য খনিজ পদার্থের খোঁজ করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে মহাদেশটি জুড়ে হঠাৎ এমন তৎপরতা বৃদ্ধি কারণগুলো কী? আফ্রিকা বিশ্ববাণিজ্যের জন্য নতুন আগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার পেছনে কাজ করছে উক্ত অঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত বৃহৎ জনগোষ্ঠী ও প্রাকৃতিক সম্পদ। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে ভৌগোলিকভাবে বাহির থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কৌশলগত অবস্থানের কারণেও আফ্রিকা গুরুত্বপূর্ণ। ৬১টি স্বাধীন দেশের মোট উৎপাদন হচ্ছে বৈশ্বিক উৎপাদনের ১৪ শতাংশ। আফ্রিকার দেশগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। তাই বর্তমান বিশ্ব পুঁজিবাজারের জন্য অঞ্চলটি ব্যাপক বড় একটি বাজারও বটে। অঞ্চলটি ব্যাপক প্রকৃতিক সম্পদে ভরপুর। কিন্তু শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনগ্রসর হওয়ার ফলে প্রকৃতিক সম্পদের সিংহভাগই তারা উত্তোলন করতে পারছে না। আফ্রিকার
প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে তেল, কয়লা, স্বর্ণ ও হীরক। গত প্রায় এক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী জ¦ালানি তেলের দাম ওঠানামা করছে। অন্যদিকে আধিপত্য বিস্তারকারী বৃহৎ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর রয়েছে ব্যাপক জ¦ালানি চাহিদা। ফলত অঞ্চলটি খুব সহজেই তাদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এখন দেখার বিষয় আফ্রিকায় বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পুঁজিপতি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ মহাদেশটির প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কতটা কাজে লাগে। আবার উক্ত অঞ্চলে আধিপত্যবাদী দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য কতটা হুমকি হয়ে দাঁড়ায় সেটাও দেখার বিষয়। এসব বিষয়ের চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ কী হবে তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে।
লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
