বাংলাদেশের একক বৃহত্তম বৈদেশিক শ্রমবাজার সৌদি আরব। সরকারি হিসাবেই দেশটিতে ১৫ লাখের মতো বাংলাদেশি কর্মরত। এর মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার নারী গৃহকর্মী। এর বাইরে আরও অন্তত পাঁচ থেকে ছয় লাখ বাংলাদেশি সেখানে কাজ করলেও বৈধ কাগজপত্রসহ নানা সংকটে রয়েছেন তারা। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই শ্রমবাজার দীর্ঘকাল বন্ধ ছিল। সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়ার ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সৌদি আরব। তখন গৃহকর্মী খাতের ১০টি ক্যাটাগরিতে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। একইসঙ্গে অন্যান্য খাতেও দেশ থেকে শ্রমশক্তি রপ্তানি বেড়েছে সৌদি আরবে। কিন্তু উচ্চবেতনসহ নানা প্রলোভনে দেশটিতে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের স্বপ্ন আর সেখানকার বাস্তবতায় রয়েছে বিরাট তফাৎ। শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সি, দালালচক্র ও নিয়োগদাতাদের কথা ও কাজের মিল না থাকায় প্রবাসী শ্রমিকদের এসব সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে ‘ওয়ার্ক পারমিট’ বা কাজের অনুমতিপত্র, সৌদি আরবে একে বলা হয় ‘আকামা’।
বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে ‘সৌদিতে আকামার মেয়াদ সংকটে লাখো শ্রমিক’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এ সংকটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। দেশ রূপান্তরের একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকের সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে রচিত এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশটিতে প্রায় লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিকই এখন ‘আকামা’ বা কাজের অনুমতিপত্র নিয়ে মহাসংকটে রয়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, আকামা সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে হাজার হাজার শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, যদি কোনো শ্রমিক স্পন্সরের বাইরে কাজ করেন বা পালিয়ে যান অথবা আকামা, বর্ডার ও শ্রম আইনের কোনো ধারা ভঙ্গ করেন তাহলে তাকে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আটক করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে ডিপোর্টেশন সেন্টারের মাধ্যমে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা সেটাই করছে। বাংলাদেশ দূতাবাস এ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। সৌদি আরবে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনেক বদল এসেছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আকামা ব্যয় নিয়োগকারী কোম্পানির দেওয়ার কথা। কিন্তু তারা তা করছে না। সব দায় চাপিয়ে দিচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। সৌদি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এ সংকট সমাধানের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে সৌদি আরবে কর্মরত বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি ‘আকামা জটিলতায়’ রয়েছেন। নিয়োগকর্তা বা নিয়োগদাতা কোম্পানিরই শ্রমিকদের আকামা করে দেওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ নিয়োগদাতা বা কোম্পানি সেটি করছে না। এতে বৈধভাবে যাওয়ার পরও আকামার মেয়াদ শেষে লুকিয়ে কাজ করতে হচ্ছে অনেককে। যারা পুলিশি অভিযানে ধরা পড়ছেন তাদের সৌদি সরকারের জাকাত ফান্ডের খরচে ১৫ দিনের মধ্যে বিমানের টিকিট দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এমন ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেকে আকামা নবায়ন করতে পারছেন না টাকার অভাবে। আগে আকামার ফি ছিল মাত্র ১ হাজার রিয়াল। আর এখন হয়েছে ১২ হাজার রিয়াল বা বাংলাদেশি টাকায় ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু দেশ থেকে বিপুল অর্থ খরচ করে সৌদি আরবে যাওয়া এবং সেখানে প্রত্যাশিত বেতন না পাওয়ার কারণে আকামার খরচ বহন করা বেশিরভাগ শ্রমিকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব।
ভুক্তভোগী প্রবাসী শ্রমিকদের ভাষ্য অনুসারে প্রতিদিনই ৫০-১০০ শ্রমিক আকামা-সংকটের সমাধানে সৌদি আরবে বাংলাদেশের দূতাবাসে ভিড় করছেন। তাদের অভিযোগ, ঢাকা থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও তাদের দালালরা প্রতারণা করে এখানকার ফাইভ স্টার হোটেলের ছবি দেখিয়ে ৫-৬ লাখ টাকা নিয়ে সৌদি আরব পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পর তাদের অধিকাংশকেই দেওয়া হয়েছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মতো কাজ। বেতন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ রিয়ালের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দেওয়া হচ্ছে ৫০০ রিয়াল। পাশাপাশি সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের আবাসন সংকটও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এসব সংকট নিরসনে দালালের মাধ্যমে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করা, দেশের শ্রমশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে তদারকি করা এবং সৌদি আরব সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজারে প্রবাসী শ্রমিকদের অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকারের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
