সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রকল্পে মূল বাধা শাহবাগ থানা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪:৫৮ এএম

বেঁধে দেওয়া সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না। ইতিমধ্যে আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এতেও সংশয় কাটছে না। কারণ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) বাস্তবায়নে মূল বাধা মনে করা হচ্ছে শাহবাগ থানা কমপ্লেক্স ও পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে। প্রকল্প এলাকা থেকে শাহবাগ থানা কমপ্লেক্স না সরানো হলে নতুনভাবে নির্ধারণ করা সময়েও প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া নকশায় থাকা ইন্দিরা মঞ্চ ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্থান নির্ধারণের বিষয়টি নির্ভর করছে সরকারের উচ্চ মহলের ওপর। সেখান থেকেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না। ফলে এসব কাজেও হাত দিতে পারছে না প্রকল্প সংশ্লিষ্ট লোকজন। সরকারের তিনটি সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তর, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এ প্রকল্পে কাজ করছে। ইতিমধ্যে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে এ প্রকল্পের সার্বিক পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরকারের নেওয়া প্রকল্পে আমরা কাজ করছি। পুরো প্রকল্পে বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ তিনটি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অংশের কাজের বিষয়ে দক্ষ প্রকৌশলীরা নিয়োজিত আছেন। আমাদের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটিও একটি। আমরা নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ে ব্যয় ২৬৫ কোটি ৪৪ লাখ ৩০ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আর প্রকল্পের মেয়াদকাল কিছুটা পরিবর্তন করে ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়। এরপর মেয়াদ বেড়ে তা চলতি বছরে বছরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ সময়ে শেষ না হওয়ার আশঙ্কায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তথা বাঙালির মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিবহ স্থানটিকে ইতিহাসের নানা উপাদানে সাজাতে ইতিমধ্যে দুইটি পর্যায়ে প্রকল্পের বেশ কিছু কাজ শেষ হয়েছে। আগের ধাপে গ্লাস টাওয়ার, মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল, স্বাধীনতা জাদুঘর, শিখা চিরন্তনসহ বেশ কিছু স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান, তৃতীয় ধাপের প্রকল্পে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে মূল বাধা শাহবাগ থানা কমপ্লেক্স। প্রকল্পের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে শাহবাগ থানা ও পুলিশের একটি কন্ট্রোল রুম। এছাড়া রয়েছে ফুলের মার্কেট। এসব স্থাপনা না সরানো হলে মূল নকশা বাস্তবায়ন সম্ভব না। থানা অপসারণ বিষয়ে এ পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিটি ডিভিশন) শওকত উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গণপূর্ত অধিদপ্তর ইতিপূর্বে দুই ধাপের কাজ অত্যন্ত সুচারুভাবে শেষ করেছে। এখন তৃতীয় ধাপের কাজ চলছে। কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। সেগুলো পেলে আমরা কাজে আরও গতি আনতে পারব। এছাড়া মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে যেসব বাধা আছে তাও অপসারণ প্রয়োজন।’

তৃতীয় পর্যায়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তার আশপাশের এলাকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাপরিকল্পনার অনুমোদন করা হয়েছে ২০১৭ সালে। শিশুপার্ককে স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পের আওতায় রেখে ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের মহাপরিকল্পনার অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর অংশ হিসেবে নকশাও অনুমোদন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর কাজটি একসঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। তৃতীয় পর্যায়ের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছেথ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণ ও ইন্দিরা মঞ্চের বিশেষ স্মারক। এর সবই বর্তমানে শিশুপার্কে অবস্থিত। যে কারণে শিশুপার্ককে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। যুক্ত হবে নতুন নতুন রাইড, ওয়াটার বডি। শিশুপার্ক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। শিশুপার্ক থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার জন্য বিশেষ একটি সংযোগ সড়ক থাকবে। এ পার্কের বেজমেন্টে থাকবে ৫০০ কার পার্কিংয়ের জায়গা। প্রাঙ্গণে বক্তৃতার একটি স্থায়ী মঞ্চ, ফুড কিয়স্ক, টয়লেট, মসজিদ, পাম্প হাউজ, টিকিট কাউন্টার ও আন্ডারপাস থাকবে। আর শাহবাগ থেকেও দৃশ্যমান হবে পুরো এলাকাটি। সে ক্ষেত্রে শাহবাগ থানা উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টিও উল্লেখ আছে। এ পর্যায়ের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভে আলোর সুবিধাদি বাড়ানো।

জানতে চাইলে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কে এম সোহরাওয়ার্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পে ভৌত কাঠামোসহ বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এ অবস্থায় কিছু বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নির্দেশনা আসবে। সব মিলিয়ে নতুনভাবে বেঁধে দেওয়া সময়ে আমরা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারব বলে আশা করছি।’

ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘শিশুপার্কের কাজ এগিয়ে চলছে। আধুনিক ও অত্যাধুনিক সব রাইড দিয়ে সাজানো হচ্ছে শিশুপার্ক। তবে নতুন করে বেঁধে দেওয়া সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে কিছুটা সংশয়ে আছি।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত