চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ ধরে রাখতে পারছে না ম্যানচেস্টার সিটি। প্রতিদ্বন্দ্বী লিভারপুলের চেয়ে অনেক পিছিয়ে তারা। শিরোপা হারানোর দুঃখে এমনিতেই কাবু ছিল ক্লাবটি। এমন অবস্থায় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো খবর এলো তাদের জন্য। আগামী দুই মৌসুমে ইউরোপিয়ান কোনো প্রতিযোগিতায় খেলতে পারবে না ম্যানচেস্টার সিটি। সুবাদে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার স্বপ্ন পরের দুই মৌসুমে দেখতে পারছে না সিটিজেনরা। উয়েফার আওতাধীন ক্লাবগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট লাইসেন্স ও আর্থিক ফেয়ার প্লের নিয়ম করা আছে। ম্যানচেস্টার সিটি খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে ওই নিয়মটাই ভঙ্গ করেছে। তাই বিশাল এই শাস্তি শুনতে হলো ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী ক্লাবটিকে। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে তিন কোটি ইউরোর জরিমানাও করা হয়েছে ক্লাবটিকে। এছাড়া ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সিটির বিরুদ্ধে উল্লিখিত নিয়ম ভাঙার তদন্তকাজে অসহযোগিতা করারও অভিযোগ উঠেছে। ইউরোপিয়ান ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থার অভিযোগ সিটি তাদের তদন্তে সহযোগিতা না করে ভুল তথ্য দিয়েছে। অবশ্য সিটি বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা এমন শাস্তির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্রীড়াক্ষেত্রের সর্বোচ্চ আদালতে শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই ম্যানসিটির ওপর এমন তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছিল উয়েফা। অনেকবারই ইউরোপিয়ান ফুটবল থেকে তাদের নিষিদ্ধ করার হুমকি এসেছিল। ২০১৪ সালে এই নিয়ম ভাঙার দায়ে চার কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড জরিমানা গুনতে হয়েছিল সিটিকে। গত মাসে ইংল্যান্ডের দৈনিক গার্ডিয়ান সিটির আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। মূলত এরপরই সিটির নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে জোর গুঞ্জন ওঠে। শেষমেশ সেই শঙ্কাই সত্যি হয়ে গেল। ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ এ দুই মৌসুমে ইউরোপিয়ান যে কোনো ক্লাব টুর্নামেন্টে খেলতে পারবে না তারা।
এদিকে এমন শাস্তির খবর শুনে সিটি ক্লাব কর্র্তৃপক্ষ অবাক হয়নি বলে জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে ইংলিশ ক্লাবটি জানায়, ‘ম্যানচেস্টার সিটি এমন রায় শুনে অবশ্যই হতাশ কিন্তু বিস্মিত নয়। এটা অবশ্যই ত্রুটিযুক্ত রায়। কারণ এই তদন্ত উয়েফা শুরু করে, তারাই তদন্ত করে এবং তারাই রায় দিয়েছে। আমরা অবশ্যই এ রায় মানছি না। এখন সূক্ষবিচারপূর্বক রায় শেষ হয়েছে এবার আমরা ন্যায়বিচারের জন্য লড়ব।’ নিষেধাজ্ঞার খড়গ মাথায় নিয়ে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচে নামবে সিটি। এমনিতেই জিনেদিন জিদানের রিয়ালের বিপক্ষে এ লড়াইটা গার্দিওলার দলের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জের। তার ওপর ওই খবর সিটির পুরো কাজটাই কঠিন করে দিয়েছে।
ইউরোপিয়ান ফুটবলের গভর্নিং বডি সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে জানায়, ‘বিচারক চেম্বার সব প্রমাণ আমলে নিয়ে দেখতে পায় যে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব মারাত্মকভাবে আর্থিক অনিয়ম করেছে। উয়েফার ক্লাব লাইসেন্স ও আর্থিক ফেয়ার প্লে’র যে নিয়ম আছে সেটা স্পন্সর চুক্তিতে ভঙ্গ হয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সময়ের মধ্যে চুক্তির মোট অর্থের বিবরণ সঠিকভাবে দেয়নি সিটি।’ এর আগেই উয়েফার বিপক্ষে সর্বোচ্চ ক্রীড়া আদালতে আবেদন করে হেরেছিল সিটি। এবারও আপিলের সুযোগ থাকলেও তা কতখানি টিকবে সেটাই প্রশ্ন। এদিকে শাস্তির প্রখরতা রেখে আপিল করলেই শাস্তি তুলে নেওয়ার বিধান রাখেনি উয়েফা। তাই আপিল করলেও আদালতের রায় ছাড়া আগামী দুই মৌসুম চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা সিটির জন্য কঠিন। জার্মান ম্যাগাজিন ‘দি স্পিগেল’ এর রিপোর্টের ভিত্তিতে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের তদন্ত শুরু হয়। গত বছর এই ম্যাগাজিন এই সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য ফাঁস করে। চলতি মৌসুমে গার্দিওলার দল প্রিমিয়ার লিগ তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। প্রিমিয়ার লিগ থেকে শীর্ষ চার দল পরের মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলতে পারে। আগামী মৌসুমের সিটির চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলার সুযোগ কেড়ে নেওয়ায় তালিকার পঞ্চম দল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সুযোগ পাচ্ছে। সেক্ষেত্রে কপাল খুলতে পারে এবার পাঁচে থাকা শেফিল্ড ইউনাইটেডের। এর আগে কাতারি মালিকানাধীন প্যারিস সেন্ত জার্মেইকেও একই কারণে জরিমানা গুনতে হয়েছিল। এর আগে সাতবারের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন এক মৌসুম ইউরোপা লিগ থেকে নিষিদ্ধ ছিল এই অনিয়মের কারণে।
এদিকে ম্যানসিটির নিষেধাজ্ঞায় লা লিগার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের তেভাস সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে উয়েফার এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর্থিক ফেয়ার প্লে নিয়মের সঠিক প্রয়োগ এবং এর ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য ভালো। অবশেষে আমরা একটা ভালো উদাহরণ পেলাম।’
যার কারণে সিটির সর্বনাশ
আর্থিক অনিয়মের কারণে সব ধরনের ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা থেকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। তবে যার কারণে এই আর্থিক অনিয়মের কথা জানাজানি হয়েছে তিনি একজন পর্তুগিজ হ্যাকার। নাম রুই পিন্টো। ছদ্মনামে কাজ করতেন তিনি। ২০১৫ সালে সিটির মেল হ্যাক করেন পিন্টো। ফলে অনেক তথ্য-প্রমাণের নথি তার হস্তগত হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘সান’-এর হিসাব অনুযায়ী, সিটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রায় ৭০ মিলিয়ন গোপন নথি চুরি করেছিলেন পিন্টো। আর সেগুলো তিনি তুলে দেন জার্মান সংবাদমাধ্যম ‘ডার স্পিগেল’-এর হাতে। এই কাগজ থেকে ম্যানসিটির আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপে জার্মান পত্রিকাটি। যাই হোক পিন্টোকে গ্রেপ্তার করে হাঙ্গেরিয়ান পুলিশ। ৯০টি ভিন্ন ভিন্ন মামলায় তিনি বিচারের অপেক্ষায় আছেন। গত বছরের মার্চ থেকে জেলে আছেন পিন্টো। তবে সিটির নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে ছিলেন যিনি তাকে মুক্ত করার জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছেন ফুটবলভক্তরা। জার্মানির ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের সমর্থকরা জোরালোভাবে পিন্টোর মুক্তি দাবি করেছেন। ইন্টারনেট।
