করোনা কি মন্দা বয়ে আনবে

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:৩৭ পিএম

বিশ্ব অর্থনীতি মোটামুটিভাবে নতুন করে চাঙ্গা হওয়ার পথেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। এমন সময় হানা দিল নতুন করোনাভাইরাস। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসটির দ্রুত বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি শক্ত আঘাতই বটে। তবে শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি কেমন হবে, তা এখনই বলা যাবে না। কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তার ওপরই নির্ভর করবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা। তবে মহামারীটির অবস্থা বা গতিপথ যা-ই হোক না কেন, এটি চীনের অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গুরুতর হিসাব-নিকাশে বসতে বাধ্য করছে।

দৃশ্যটা কল্পনা করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিটি সত্যিই প্রায় স্থবির হতে বসেছে। করোনাভাইরাসে নতুন নতুন সংক্রমণের ঘটনা এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। চীনে আমার অনেক পরিচিতজন এবং বন্ধুবান্ধব রয়েছেন। তাদের অনেকেই আমাকে বলছেন, এই ভয়ানক মহামারী আর এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণে চীন সরকারের সক্ষমতা সম্পর্কে তারা ক্রমেই বেশি করে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছেন। বড় বড় নগরকেন্দ্রিক উৎপাদন এবং আর্থিক কেন্দ্রগুলো অন্তত আংশিকভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। বিশাল দেশটির বহু কর্মী দেশজুড়ে অন্যান্য স্থানে কাজ করতে যান। নববর্ষের ছুটি শেষে এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকের অনেকেই কাজে ফিরতে পারছেন না। কারখানাগুলো পাচ্ছে না প্রয়োজনমতো কাঁচামাল। তারা তাদের তৈরি পণ্যও নির্ভরযোগ্যভাবে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠাতে পারছে না। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে ভোগ্যপণ্যের কেনাবেচা আর ব্যবহারও ব্যাপকহারে কমে গেছে। কারণ মানুষজন বেশির ভাগ সময়ই ঘরের মধ্যে থাকছে। আতঙ্ক জাগানো এ ভাইরাস পর্যটন এবং হোটেল-রেস্তোরাঁর মতো শিল্পকে বিশেষ ধরনের আঘাত করছে। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদনকারীরা চীনের কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি। কিন্তু তাদের সংকটকালীন আর্থিক সুরক্ষা থাকে সামান্যই।

চীন সরকারের অবশ্য সরকারি ব্যয় বাড়ানো, কর হ্রাস এবং প্রবৃদ্ধি জোরদার করতে কম সুদে ঋণ সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে মুদ্রানীতি শিথিল করার ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার কম সুদের সহজঋণের অর্থে অর্থনীতি ভাসিয়ে দেওয়া ব্যাংকিংব্যবস্থার ঝুঁকি বাড়াবে। চীন সরকার তা মানেও। তবে এখন হচ্ছে গিয়ে যাকে বলে মহাসংকটের সময়। এখনকার কথা আলাদা। এখন যত যা-ই ঘটুক, ব্যবসায়িক কার্যক্রম আবার চাঙ্গা না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থাগুলোর কোনোটিতেই খুব বেশি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না। এ ছাড়া আরেকটি ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। চীনের প্রথাগত ব্যাংকিংব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য নিরন্তর লড়াই করা ক্ষুদ্র বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে বিশাল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগগুলোকে মুক্ত হাতে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে অনেক বেশি আগ্রহী।

দেশ হিসেবে চীনের আকার বিশাল। এ ছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি ও পণ্য বাজারের প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে তার রয়েছে বিরাট ভূমিকা। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, চীন কোনো ধরনের আঘাত পেলে তা পুরো বিশ্বজুড়েই প্রভাব ফেলবে। চীনের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ হ্রাস (বিশেষ করে চীন থেকে যাওয়া-আসা) পাওয়ায় এর মধ্যেই তেলের দাম পড়ে গেছে। করোনাভাইরাস পর্ব বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে ইতিমধ্যেই চলমান কিছু পরিবর্তনে নতুন গতির সঞ্চার করবে। চীনা শ্রমিকদের মজুরি ক্রমবর্ধমান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের মাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে করোনা মহামারীর হানার কারণে বহুজাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের সরবরাহ চেইন পুনর্বিবেচনা করতে পারে। এ কারণে চীনে পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনাভাইরাস মার্কিন অর্থনীতিতে সম্ভবত তাৎক্ষণিকভাবে সীমিত প্রভাবই ফেলবে। তবে এশিয়াতে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত করার মাধ্যমে এটি ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে আটকে রাখা সম্ভাব্য কারণগুলোর তালিকাকে আরেকটু বড়ই করবে। গত মাসের চীন-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি থেকে ব্যবসায়িক আস্থা এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে সাময়িক চাঙ্গাভাবের আশা করা হচ্ছিল, তা বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তার নতুন মেঘের নিচে চাপা পড়বে। এ মুহূর্তেই বিশ্বব্যাপী মন্দার আশঙ্কা তেমন দেখা যাচ্ছে না, তবে বাড়তি অনিশ্চয়তার কারণে অন্ততপক্ষে বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হবে। ইতিমধ্যেই সব বড় অর্থনীতিতে এ দুটি ক্ষেত্রের অবস্থা নির্জীব।

করোনা কাহিনীর আরেকটি সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়বে নিজ দেশের সরকারের ওপর চীনা নাগরিকদের আস্থায়। চীন রাষ্ট্র এবং তার জনগণের মধ্যে দৃশ্যত একটি অলিখিত সমঝোতা হয়েছে। চীনের জনগণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের দাবি ত্যাগ করার বিনিময়ে অর্থনৈতিক দক্ষতা, জীবনযাত্রার উচ্চতর মান এবং এক ধরনের সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রাপ্তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশিত হবে তা সরকারি কর্র্তৃপক্ষই নিয়ন্ত্রণ করবে এ বিষয়টি মেনে নেওয়া হলেও চীনের জনগণ তাদের সরকারের দক্ষতার বিষয়ে ক্রমেই সন্দিহান হয়ে উঠছে, যারা কি না নিয়মিতভাবে খারাপ খবর লুকায়। সোয়াইন ফ্লু আর বার্ড ফ্লুর পর এখন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার মতো সে দেশেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস। চীন সরকারের দেওয়া তথ্যের ওপর বিশ্বাস এবং এসব সমস্যা মোকাবিলায় তাদের দক্ষতা অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

করোনাভাইরাস মহামারীর গতিপ্রকৃতি থেকে কেবল চীন নয়, হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও শিক্ষা নেওয়ার রয়েছে। শিক্ষাটা হচ্ছে : তথ্য বিকৃত করার খায়েশের কারণে সরকারের ওপর থেকে জনগণের বিশ্বাস ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জন্য চরম মূল্য দিতে হতে পারে। বিশেষ করে কঠিন সময়ে, যখন সেই বিশ্বাস জনগণের আস্থা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইতিহাসের শিক্ষা বলে, করোনাভাইরাস শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং চীনা ও বিশ্ব অর্থনীতি সঠিক পথে ফিরে আসবে হয়তো একটি কষ্টকর পর্বের পর। তবে নিজ দেশের সরকারের বিষয়ে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ধারণার ওপর যে প্রভাবটি এ ভাইরাস রেখে যাবে তা হয়তো হবে দীর্ঘতর।

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক

নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত