‘তক্তা উইকেট’ নিয়ে শরিফুলদের হতাশা

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০১:১৪ এএম

অভিভাবককে শাপ-শাপান্ত করার নিয়ম নেই। নিয়ম থাকলে বিশ্বকাপজয়ী অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কয়েকজন বোলারসহ দেশের উদীয়মান পেসাররা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) গতকাল বিকেএসপিতে ধুয়ে দিতে পারত। একজন ফাস্ট বোলার তো সরাসরি অভিযোগ করেন, ‘এরকম উইকেটে বল করা যায় না ভাই। খুব কষ্টও হয়।’

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিসিবি একাদশের ২ দিনের ম্যাচ চলছে বিকেএসপিতে। বিসিবি একাদশটা তারুণ্য নির্ভর। বিশ্বকাপ জেতা দলের ৬ খেলোয়াড়ের মধ্যে ফাস্ট বোলার শরিফুল ইসলামকে বলতে হবে বেচারা। তিন পেসার গতকাল বল করেছেন-মুকিদুল ইসলাম মুগ্ধ, সুমন খান ও শরিফুল। সবার বয়স কাছাকাছি। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাণবন্ত কন্ডিশন আর স্পোর্টিং উইকেট থেকে সরাসরি বিকেএসপির ‘তক্তা’ উইকেটে খেলতে নেমে শরিফুল তো ‘থ’!

জিম্বাবুয়ের ৭ উইকেট পড়েছে। এর মাত্র একটি পেসারের। ৫টি স্পিনারের। তিনটি উইকেট বিশ্বকাপ খেলে আসা এবং সেখানে বল করার সুযোগ না পাওয়া অফ স্পিনার শাহাদাত হোসেনের। দুটি অধিনায়ক আল আমিন জুনিয়রের। একটি রান আউট। পেসারের ভাগ্যে বহু কষ্টে যেটা জুটেছে সেটা শরিফুলের।

কী আর বলবেন শরিফুল। দুই ভিন্ন কন্ডিশনের মধ্যে তুলনার প্রসঙ্গ যখন আসে তখন এই মরা উইকেট তার আক্ষেপের মূলে, ‘প্রথম পার্থক্য হলো উইকেটে। ওখানে অনেক বাউন্স আছে। এখানে বাউন্স নেই। ওখানে গরম ছিল। এখানে অত গরম না। ওয়েদার, তবে ওখানে গরম থাকলেও বোলিং করতে ভালো লাগত। বোঝা যেত না। ঘাম হতো না। এখানে ঠাণ্ডা থাকলেও ঘাম হচ্ছিল।’ সারা দিনে ১৫ ওভার বল করে তার তাও সান্ত¡না পুরস্কারের মতো ১টা উইকেট মিলেছে। সুমন আর মাকিদুলের মিলিত ২৬ ওভার বোলিংয়ে কেবল উইকেট না পাওয়ার হতাশা।

 ৬ ফুট ৩ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী শরিফুলের কথার মধ্যে বারবার ঘুরে ফিরে সেই হতাশা, ‘এখানে যেরকম উইকেট আমরা আশা করেছিলাম সে-রকম না। আমরা যে উইকেটে বোলিং করে এসেছি সেসব আর এই উইকেট ভিন্ন। এ ধরনের উইকেটে পেস বোলাররা আসলে কখনো মন মতো বোলিং করতে পারে না।’ তিনি নিজেও পারেননি। পারেননি তার সতীর্থ পেসাররাও।

এটাকে আসলে বইয়ের পাতা থেকে ধার করে বলতে হবে ‘মাথা খুঁড়ে মরা’ উইকেট। ঘাসহীন। চৈত্রের কাটফাটা রোদে মাটিতে ফাটল ধরে। এখানে শুধু ফাটলটা নেই। বাকি সব একই। ন্যাড়া উইকেটটা দেখেই তো পেসারদের বল করার আধেক ইচ্ছা উবে যায়। বাকিটা মন আর শরীরের জোরে করা ছাড়া উপায় নেই। যেহেতু খেলতে হবে। শরিফ ভ্রƒ নাচিয়ে বলছিলেন, ‘কঠিন। এখানে অনেক বাড়তি এফোর্ট দিতে হয়।’ আসে কষ্টের কথাও, ‘কষ্ট তো হয়েছে। আর লম্বা পরিসরের খেলায় এনজয় একটু কমই হয়। কারণ লম্বা সময়ের খেলা। অনেকদিন পর বল করলাম সরাসরি। প্র্যাকটিস না করে। একটু কষ্ট হয়েছে।’

দিনের সেরা বোলার শাহাদাতও বলে যান, ‘উইকেট খারাপও না। ভালোও না। ব্যাটসম্যানদের সহায়ক বলতে পারেন। পেস বোলারদের জন্য কম সুবিধা ছিল। আর বাংলাদেশে তো স্পিনে একটু ভালো হয়।’

বিসিবির তবু বোধোদয় হবে না। কিছু কিছু স্পোর্টিং উইকেটের কথা আসে আলোচনায়। হচ্ছে। কিন্তু সেটি এত বেশি শম্বুকগতির বলেই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের এই অবস্থা। এই উইকেটে সত্যিকারের ফাস্ট বোলার বা বুকে সাহস আর স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলা উদীয়মান পেসারের জন্য তিক্ততা ছাড়া কিছু থাকে না। এই দেশের পেসারদের তাই গতি কমে, চোটপ্রবণ হয়, শেষে দমে গিয়ে গড়পড়তা বোলার বনে যায়। একজন ক্রিকেটার মনে করিয়ে দেন, ‘ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রেও তো একই রকম কথা। ওরা দেশে অনেক রান করবে কিন্তু বিদেশে গিয়ে আর পারবে না।’

এখন কর্মকর্তা হয়েছেন। আগে ছিলেন ক্রিকেটার। নিজেদের ক্যারিয়ারে দেখেননি স্পোর্টিং উইকেট। আর এদিন একটা আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষে বিশ্বজয়ী তরুণদের সঙ্গে দেশের নতুন প্রতিভাদের নামিয়ে দেওয়ায় ক্ষিপ্তই তিনি। নাম প্রকাশের উপায় নেই। ‘এরকম উইকেটে খেলার কোনো মানে আছে? বলা হয়েছিল এখানে ঘাসের উইকেট থাকবে। কিন্তু থাকবেটা কীভাবে? শুনলাম এখানে নাকি টানা ৬০টা ম্যাচ হয়েছে। দ্বিতীয় বিভাগের খেলা হয়েছে টানা।’ তবু এরকম ম্যাচের বিশেষ প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে একটা দুইটা উইকেটকে কি ঘাসের করে লালন করা যেত না? এই প্রশ্ন রেখে তার আক্ষেপ, ‘কতকাল আগে থেকে দেখুন এরকম উইকেট নিয়ে কথা চলছে। আগেও পরিবর্তন দেখা যায়নি। এখনো এই অবস্থা চলছে।’ বর্তমানের প্রমাণ তো বিকেএসপির মাঠে। ‘এমন চলতে থাকলে পেসাররা যাবে কোথায়?’

তাহলে? তাহলে আর কি। আগেও যখন বিসিবির কানে এসব ঢোকেনি, একেবারে আনকোড়া বিশ্বজয়ীদের সামনেও তুলে দিয়েছে সেই আদ্যিকালের উইকেট, তখন তাদের কাছে কিছু আশা করতে চাইলে নিজের ঝুঁকিতে করাই ভালো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত