জ্ঞানচর্চায় বাংলা পিছিয়ে থাকবে কেন

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:২৮ এএম

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের বয়স বহু আগেই হাজার বছর পেরিয়েছে। তারপর পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশের বাংলা দুই ভাগ হয়েছে; ভারত-পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পেয়েছে। পাকিস্তানি উপনিবেশের বিরুদ্ধে বাঙালির বিদ্রোহের বারুদে প্রথম আগুন জে¦লেছে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের সাফল্য ও অনুপ্রেরণা বাঙালিকে স্বাধীনতার সংগ্রামে প্রস্তুত করেছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশতক আর ভাষা আন্দোলনের সত্তর বছর হতে চলল। কিন্তু মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামে বিজয়ী বাংলাদেশ সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠায় কতদূর এগোল? বাংলাদেশের ‘ভাষাশহীদ দিবস’ একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী উদযাপন করছে ইউনেসকো। কিন্তু শুধু সাহিত্য-শিল্পকলায় নয়, উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসাবে মাতৃভাষা বাংলাকে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উৎকর্ষতায় কতটা নিয়ে যেতে পেরেছে বাংলাদেশ? আজ এই প্রশ্ন হাজির করা খুবই জরুরি।

মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ সাধন ছাড়া যেকোনো জাতিই সভ্যতা-সংস্কৃতির শিখর স্পর্শ করতে পারেনি তা সর্বজনবিদিত। আধুনিককালে প্রতীচ্যের ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ জাতির উত্থানের মতোই প্রাচ্যের চীন, জাপান ও কোরীয় জাতির উত্থানের নেপথ্যে রয়েছে নিজ নিজ মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে বুৎপত্তি অর্জনের ইতিহাস। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় মনে করা হয়, জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন ভাষায় রচিত বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ডের আকরগ্রন্থসমূহের অনুবাদ না থাকা এবং পারিভাষিক জ্ঞান বিকশিত না হওয়া। কিন্তু কোনো জাতিই এ কাজ রাতারাতি সম্পন্ন করতে পারেনি। সবার আগে চাই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মাতৃভাষার ভালো গাঁথুনি। তারপর উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার প্রসার ঘটানো। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন নিজেদের শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলা ভাষা চর্চায় বিশেষ মনোযোগ দেয়নি, তেমনি রাষ্ট্রীয়ভাবেও জাতীয় অনুবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় বাংলা ভাষার বিকাশে বিশেষ কোনো উদ্যোগ অদ্যাবধি নেওয়া হয়নি।

স্বাধীনতাপূর্বকালে বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠা বাঙালির মেধা ও মননের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছিল। কিন্তু কালক্রমে বাংলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনার সংখ্যা কমে এসেছে। পাঠকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও একদা গৌরবোজ্জ্বল প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বহু মূল্যবান গ্রন্থের আর কোনো পুনর্মুদ্রণ হচ্ছে না। অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ কাজ সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সারা বছরের কর্মকাণ্ডের ফলাফল কতটা গুরুত্ব বহন করছে সে প্রশ্ন করাটাও জরুরি। একই কথা বলা যায় স্বায়ত্তশাসিত বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও। গুটিকয় জার্নাল-পত্রিকা-ক্যালেন্ডারের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকাশনা সংস্থার কার্যক্রম চোখে পড়া দুর্লভ। বেসরকারি বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলো সাহিত্য-শিল্পকলা-ইতিহাস-রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে নানা গ্রন্থ প্রকাশ ও কিছু কিছু অনুবাদ করলেও পাঠ্যপুস্তক বা শিক্ষামূলক বইপত্রের অনুবাদে খুব একটা আগ্রহী নয়। তাহলে মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুবাদ ও গ্রন্থ প্রকাশের দায়িত্ব কারা নেবে? এই প্রশ্ন শুধু অনুবাদ বা প্রকাশনায় সীমাবদ্ধ নয়, প্রশ্নটি সামগ্রিকভাবে আমাদের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাবিষয়ক দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি দেখেই এখনো দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় শিক্ষার তিনটি ধারা এখনো সমন্বয়হীনভাবে চলমান। জাতীয় শিক্ষানীতিতে যদি উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা বাংলার প্রসারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।

সাধারণ মানুষ তো বটেই, আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিতজনেরও ধারণা গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, চিকিৎসা ও প্রকৌশলবিদ্যার মতো বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়ে বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা করা প্রায় অসম্ভব। আরেক দল মনে করেন, মাতৃভাষায় শিক্ষা-গবেষণায় জোর দেওয়ার চেয়ে আমাদের ভালো করে ইংরেজির মতো একটা বিশ্বজনীন ভাষা শিক্ষায় আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। উপরোক্ত দুটো ধারণাই যে ভুল তা বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী ও বাংলা ভাষায় আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার পথিকৃৎ জগদীশ চন্দ্র বসু ও সত্যেন বসুর মতো জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বহু আগেই বলে গেছেন। আর হালে পাশ্চাত্যের শিক্ষাবিদরা দেখিয়েছেন যে, একটা জাতির বেশিরভাগ মানুষকে কোনোদিনই বিদেশি ভাষায় শিক্ষিত ও পারদর্শী করে তোলা সম্ভব নয়। কিন্তু তার চেয়ে অনেক কম সময় ও বিনিয়োগে নানা বিদেশি ভাষার বৈশ্বিক জ্ঞানের অনুবাদ করা, বিভিন্ন জ্ঞানের পরিভাষা সৃষ্টি করা এবং মাতৃভাষাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। তথাপি কোনো হীনমন্যতার কারণে মাতৃভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এখনো এতটা উদাসীন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত