স্বীকৃতিবঞ্চিত দেশের প্রথম শহীদ মিনার

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৪২ এএম

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত প্রহরের রাতেই রাজশাহীর ভাষাসৈনিকরা রাজশাহী কলেজের হোস্টেলে ইট ও কাদা দিয়ে শহীদ মিনার নির্মাণ করে তার নাম দিয়েছিলেন শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। যার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এটিই ছিল দেশের প্রথম শহীদ মিনার। কিন্তু রাতভর নির্মাণের পরদিন সকালেই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশ সেই শহীদ মিনারটি গুঁড়িয়ে দেয়। রাজশাহীর ভাষাসৈনিকরা ওই শহীদ মিনারটিকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য দাবি জানিয়ে আসছেন বহু বছর ধরে। কিন্তু বরাবরই সেই দাবি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু শহীদ মিনার গড়ে উঠলেও প্রথম এই শহীদ মিনারটি বরাবরই রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত থাকায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ রাজশাহীর ভাষাসৈনিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

রাজশাহীর ভাষাসৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন শুরু করেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ কয়েকজন শহীদ হন। এ খবর রাজশাহীতে এসে পৌঁছালে আন্দোলনরত ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেন, রাতেই রাজশাহী কলেজের হোস্টেল এলাকায় শহীদ মিনার তৈরির। যেমন কথা তেমন কাজ। সারা রাত ধরে ইট ও কাদা দিয়ে তৈরি করা হয় দেশের প্রথম শহীদ মিনার। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ভেঙে দেয় ওই শহীদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের সময় রাজশাহী কলেজ ছিল এ অঞ্চলের একমাত্র উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল এই কলেজ।

এই শহীদ মিনার বরাবরই উপেক্ষিত হয়ে আসায় কয়েক বছর ধরে ভাষাসৈনিকসহ নগরীরর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছেন। ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাষাসৈনিকদের অনেক দেরিতে হলেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার দেশের এই প্রথম শহীদ মিনারটিকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেবে বলে প্রত্যাশা করি।’

শহীদ মিনার তৈরির স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে এই ভাষাসৈনিক বলেন, ‘১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি জানতে পারি, ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়ে কয়েকজনকে হত্যা করেছে। খবর শুনেই ছাত্ররা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে রাজশাহী কলেজ থেকে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সন্ধ্যায় কলেজে ছাত্ররা জরুরি সভায় মিলিত হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মৃতি রক্ষার জন্য রাজশাহী কলেজে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাতেই আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা বিভিন্ন স্থান থেকে ইট সংগ্রহ করে। রাতে সিমেন্ট সংগ্রহ করতে না পারায় ইট ও কাদা মাটি দিয়ে তারা শহীদ মিনার নির্মাণ করে নাম দেন শহীদ ম্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লিখে দেওয়া হয়, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ এ কাজে কলেজের কয়েকজন কর্মচারীও সহায়তা করেন।’

স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শেষে ছাত্ররা তার ছবি তুলে রাখে জানিয়ে মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জি বলেন, ‘রাজশাহী কলেজের শহীদ মিনারটিই বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। আমরা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি সারারাত জেগে পাহারা দিই। কিন্তু পরদিন সকালে যখন আমরা সেখান থেকে চলে যাই, সেই সুযোগে ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে শহীদ মিনারটি গুড়িয়ে দেওয়া হয়।’

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এই শহীদ মিনারটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন কয়েকবার। এ নিয়ে তিনি কয়েক দফা জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিলেও কোনো ফল আসেনি। ভাষাসৈনিক ও রাজশাহীর সাধারণ মানুষের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে রাজশাহী কলেজ কর্র্তৃপক্ষের উদ্যোগে এবং সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশার সহায়তায় মুসলিম হোস্টেলের গেটের কাছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির সেই স্থানটিতে ২০০৯ সালে একটি ফলক নির্মাণ করা হয়। কিন্তু সেটিও এখন উপেক্ষিত। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এ স্থানটিতে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। সেই শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার কাজ গত বছরের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো অসমাপ্ত।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেখানে শহীদ মিনার করার কাজ চলছে। কিন্তু জায়গাসংক্রান্ত কিছু জটিলতা থাকায় কাজ শেষ এখনো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া আরও কিছু টাকারও দরকার। তবে খুব শিগগিরই কাজটি শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।’

প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মহা. হবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি আমাদের রাজশাহীবাসীর ব্যর্থতা। আমাদের যারা ভাষাসৈনিক ছিলেন তাদের মধ্যকার অনেকেই পরলোক গমন করেছেন। দু-একজন এখনো বেঁচে আছেন। তারপরও শহীদ মিনারটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। আমাদের রাজশাহীর শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিবীদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী যারা আছেন তারা যে যৌথ প্রয়াস নিয়ে এগোবেন, সেটা কখনো হয়ে ওঠেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই শহীদ মিনারটি কেন্দ্রের (ঢাকা) বাইরে হওয়ায় স্বীকৃতি না পাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। শহীদ মিনারটি ঢাকায় হলে দেখা যেত যে বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন হতো। এটার সঠিকতা যাচাই করা হতো। আমরাও কিন্তু সেটিই মনে করছি। আমরা অযৌক্তিক দাবি করছি না। এই রক্ত ঝরা মাসে এটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হোক এটিই আমরা চাই। অন্তত রাজশাহীবাসীর দাবির সঠিকতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হোক।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত