টপটপ কুয়াশা জমেছে চাকে। ঠান্ডায় কাতর কিছু অলস মৌপোকা বসে আছে গরানের ডালে। গাছতলায় বাঁধা নৌকাটি দুলছে। গড়িয়ে পড়া শিশির বা জলের স্রোত নয়, কাঁকড়ার ছটফটানিতে। শীতকালে সুন্দরবন উপকূলে কাঁকড়ার জোগান কমে আসে। বন বিভাগ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি কাঁকড়া ধরার পাশ পারমিট বন্ধ রাখে। যদিও এ-সময়টা কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুম নয়, সুন্দরবনে তা ভাদ্র মাসে। বাদাবনের খাল থেকে জেলেরা কাঁকড়া ধরে গ্রামের চাহিদা মিটিয়ে কিছুটা স্থানীয় বাজারেই বিক্রি করত একসময়। বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘেরের পর শুরু হলো বাণিজ্যিক কাঁকড়া ঘের। ছোট কাঁকড়াকে ঘেরে খাবার খাইয়ে মোটাতাজা করা। এরপর শুরু হলো ‘নরম খোলের কাঁকড়া বাণিজ্য’। এই কাঁকড়া যায় জাপান, চীন, কোরিয়া এবং ইউরোপে। নরম খোলের কঁাঁকড়া চাষের কারণে সুন্দরবনের কাঁকড়ারা বড় হতে পারছে না। আটকে যাচ্ছে কাঁকড়ার জন্মচক্র। নরম খোলের কাঁকড়া খাওয়ার এই নির্দয় খাদ্য-সংস্কৃতি সুন্দরবনের শিশু কাঁকড়াদের বড় হতে দিচ্ছে না। জোর করে কেড়ে নিচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবনের কাঁকড়ার কৈশোর ও যৌবন। এই লেখাটি যারা পড়ছেন তারা নিশ্চয়ই বনসাই প্রথাকেও মেনে নিতে পারেন না। বিশাল বৃক্ষের আপন বেড়ে ওঠাকে যখন কারুকলা ও বাণিজ্যের নামে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়। নরম খোলের কাঁকড়া আর বনসাই একই মনস্তত্ত্ব থেকে হাজির হয়েছে। তো চলতি আলাপখানি নরম খোলের কঁাঁকড়া বাণিজ্যের মূল্যবোধ নিয়ে নয়। সর্বগ্রাসী কনজিউমারিজম কীভাবে দুনিয়ার জীবনশৃঙ্খলা চুরমার করে দিচ্ছে মূলত সেদিকটাতেই একটুখানি কথা বলা। কিন্তু নিদারুণভাবে চলতি আলাপে ঢুকে পড়েছে সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস আতঙ্ক, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন এবং কাঁকড়া বাণিজ্য।
২. আলাপের শুরুতে নৌকার পাটাতনে যে কাঁকড়াগুলো তড়পাচ্ছিল সেগুলো নিয়ে খালের পর খাল বেয়ে সাবুদ সানা কলবাড়ি বাজারে আসেন। কোনো বড় আড়ত, কাঁকড়ার কোম্পানি কেউ কাঁকড়া কিনতে চাইছে না। সাবুদ সানার জানা হয়, চীনে করোনা ভাইরাস লেগেছে তাই সুন্দরবন থেকে কোনো কাঁকড়া-কুচে সেখানে যাচ্ছে না। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সাবুদ সানার সঙ্গে দেখা হয় কলবাড়ি বাজারে। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের এই কলবাড়ি বাজারে জেলেরা ভোর না হতেই মাছ, কাঁকড়া নিয়ে আসেন। অন্য বছর এই সময়টাতে কাঁকড়ার দাম মেলা হয়, কিন্তু এ বছর বাজার একেবারেই মন্দা। বড় মহাজনেরা এই সময়ে চড়া দামে কাঁকড়া রপ্তানি করেন। বছরের এই সময়টার
জন্য উন্মুখ থাকেন কাঁকড়া ব্যবসায়ীরা। এ সময় জোয়ারের গোণে যে কাঁকড়া ধরা পড়ে তার দামও বেশি। সুন্দরবনের পরিভাষায় এই সময়ের গোণ ‘চাইনিজ গোণ বা চাইনিজের গোণ’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কারণ এই সময়ের কাঁকড়া বেশি দামে চীনেই রপ্তানি হয়। আর সেই চাইনিজ গোণে আজ কাঁকড়া যেতে পারছে না করোনা ভাইরাস সংকটের কারণে।
৩. বাদাবনের সবকিছুই চন্দ্রনির্ভর। বনজীবীদের জীবন ‘গোণ’ ও ‘ভাটিকা’র গণিত মেনে চলে। প্রতি ছয় ঘণ্টা পর পর জোয়ার-ভাটা হয়। প্রতি মাসে অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথির ৩ দিন আগ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত প্রায় এক সপ্তাহ হচ্ছে ‘গোণমুখ’। গোণমুখে বনজীবীরা বাদায় থাকে। এ সময় জোয়ারের প্রাবল্য বেড়ে যায়। প্রতি মাসে দুটি গোণমুখ আসে। প্রতি দশমী তিথিতে একটি নতুন গোণের জন্ম হয়। চতুদর্শী পর্যন্ত গোণ থাকে। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হবে। গোণমুখের পর ৭দিন ভাটিকা পড়ে। ভাটিকার সময় বনজীবীদের গ্রামে থাকার নিয়ম। একটি গোণমুখ ও একটি ভাটিকা হয় পূর্ণিমা তিথিতে, পরের গোণমুখ ও ভাটিকা মিল অমাবস্যা। গোণ-ভাটিকার অঞ্চল হলেও বাদাবনবাসীদের জীবনে দুটি গোণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আদিকাল থেকে। ‘কলাকাটা গোণ’ আর ‘পান্তাভাসানি গোণ’। ভাদ্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করে আশ্বিনের শুরুতে হয় বছরের সবচেয়ে বড় গোণমুখ। একে বলে কলাকাটা গোণ। ভাদ্র মাসের শেষ সপ্তাহে যে গোণ হয় তাকে বলে পান্তাভাসানি গোণ। গোণেই বছরের সবচেয়ে বড় জোয়ার ওঠে। গোণ ও ভাটিকা বাদাবনের জীবনে এমনই জড়িয়ে আছে গোণমুখের সময় মহাজন থেকে বনজীবরা যে টাকা ধারকর্জ করে তাকে বলে গোণমুখী দাদন বা গোণদাদন। গোণমুখের সময় চিংড়ি ও কাঁকড়া বেশি পাওয়া যায় এবং ভাটিকার সময় সাদা মাছ বেশি পাওয়া যায়। বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়া রপ্তানি শুরু হলে শীত মৌসুমের এই পৌষ-মাঘের গোণ ‘চাইনিজ গোণ বা চাইনিজের গোণ’ হিসেবে নতুন নাম পায়। চাইনিজের গোণের কাঁকড়া আজ চীন যেতে পারছে না।
করোনাভাইরাসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কাঁকড়া-কুচেসহ কাঁচা মাছ রপ্তানিতে সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বাজার নষ্ট হচ্ছে। একদিকে মহাজন, কোম্পানি আর ঘের মালিকদের দুশ্চিন্তা। আরেকদিকে গরিব জেলেদের অনিশ্চিত মুখ। এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরবনের টিকে থাকার শর্ত বনাম সর্বগ্রাসী কনজিউমারিজম। আমরা কি বাদাবনকে কাঁকড়াশূন্য করে সব তুলে দেব চীন-জাপানের বাজারে? তাদের উদরপূর্তি করতে? আর এই বিনাশী বাণিজ্য করেই কি আজ আমাদের ধনী হতে হবে? মোটাতাজা বলি আর নরম খোলের বলি এখনো সব কাঁকড়াই সুন্দরবন থেকে ধরে আনা হয়। গরিব বনজীবী জেলেদের কাছ থেকে কমদামে কেনা কাঁকড়া এসব খামারে ভোক্তার পছন্দ অনুযায়ী আকার-আকৃতিতে এনে রপ্তানি করা হয়। তার মানে এই নয় যে, ঐতিহাসিকভাবে সুন্দরবনের প্রকৃত বনজীবীরা বন থেকে লোকায়ত বিজ্ঞান অনুসারে গোলপাতা, গরানের ছিটা, মাছ, কাঁকড়া, মোম, মধুর মতো যেসব কাঠবহির্ভূত বনজ সম্পদ বন বিভাগের আইন মেনে সংগ্রহ করেন তা বন্ধ করতে হবে। এমন চল নানাভাবে শুরু হয়েছিল। মার্কিন দাতা সংস্থা ইউএসএইড বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের নামে তাদের বনবিমুখের নানা কর্মসূচি শুরু করেছিল। কিন্তু এরকম উন্নয়ন প্রক্রিয়াগুলোর পরপরই সুন্দরবনে নরম খোলের কাঁকড়া বাণিজ্য চাঙ্গা হয়েছে। তাহলে সুন্দরবনের মতো অতিসংবেদনশীল অঞ্চলে বিকল্প পেশা বা কাজ কার জন্য বেশি জরুরি? বননির্ভর বনজীবীদের জন্য নাকি যেসব উন্নয়ন প্রক্রিয়া সুন্দরবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে সে-সবের বিকল্প খোঁজা জরুরি।
৪. সুন্দরবনের নানা নদী-খাল-ভাড়ানি থেকে কলবাড়ী বাজার বা কোনো ঘের। ঘের বা কারখানা থেকে চীনের উহানের বাজার। উহানের বাজার থেকে ভোক্তার মুখের গ্রাসে। কত দীর্ঘ পথ আজ বাদাবনের এক ‘নগণ্য’ কাঁকড়ার। কী এমন হয় কাঁকড়াকে জোর করে বাইরের খাবার খাইয়ে মোটাতাজা করলে? কী এমন হবে খোলস পাল্টানোর সময় কাঁকড়া ধরে মেরে ফেললে? মানুষের সমাজে কাঁকড়ার সঙ্গে এমন আচরণের নাম ‘উন্নয়ন’ এবং ‘ভোগবাদ’। কিন্তু যদি একটিবার কাঁকড়ার জায়গা থেকে পুরো গল্পটিকে দেখবার চেষ্টা করি। কেমন হয়? কোনো প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থান থেকে মুনাফার নামে এলোপাতাড়ি প্রাণসম্পদ আহরণ প্রকৃতিতে প্রবল বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। খাদ্যচক্র ভেঙে পড়ে। প্রাণের অসীম সম্ভাবনায় চিড় ধরে। অস্থির প্রকৃতি নানাভাবে তার অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলার লক্ষণ প্রকাশ করে। আমরা নগর সভ্যতার নামে যে প্লাস্টিক-সভ্যতা গড়ে তুলছি তা মানুষের ক্যানসারসহ নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি কি? রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি পলিথিন নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়নি? আমরা নির্বিচার পাহাড় কাটছি, পাহাড় ধসে কি দিনের পর দিন আমাদের মৃত্যুমিছিল দীর্ঘ হচ্ছে না। চীন, বাংলাদেশ, ভারত, মঙ্গোলিয়ার মতো বড় শহরে কী আমরা বায়ুদূষণের জন্য শ্বাস নিতে পারছি?
আমরা উন্নয়নকে একতরফাভাবে জিডিপি দিয়ে মাপছি। আর সেই জিডিপিও তো চুরমার হয়ে যাচ্ছে আমাদের জিডিপি বাড়ানোর উন্নয়নের চাপে। চিন্তা করা যায় আজ নদীর জলে মিশে গিয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক। মুরগির গিলা-কলিজায় জমা হচ্ছে সিসা। শস্য ফসলে ঢুকে পড়েছে সংহারী বিষ। আজ চীনের করোনাভাইরাসের সর্বনাশী বিস্তার কি মানুষের সামগ্রিক এই ভোগবাদী উন্নয়নের ফলাফল নয়? বন-জঙ্গল, নদী, সমুদ্র থেকে নির্বিচারে সব এনে বাজারে তোলা হচ্ছে। তছনছ করে দেওয়া হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। একের পর এক ছড়িয়ে পড়ছে সংহারী রোগ ও বিপদ। এই অস্থির বিনাশী সময় তো আর বাদাবনের কাঁকড়া কি লাউয়াছড়ার উল্লুকেরা করেনি। দুনিয়ার এই পরিস্থিতি প্রজাতি হিসেবে মানুষই তৈরি করেছে। আর তাই প্রজাতি হিসেবে মানুষেরই দায় ও দায়িত্ব এই সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করা। বিশ্লেষণ করা, খতিয়ে দেখা। একেবারেই প্রজাতি হিসেবে মানুষের টিকে থাকার স্বার্থে।
৫. আজকের আলাপখানি শুরু হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম এক বাদাবনের কিনারে। যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক আতঙ্ক। করোনাভাইরাসের এই বিস্তার থেকে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রশ্নে কি আমরা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করব? নাকি
বিশ্বপ্রকৃতিতে যাচ্ছেতাই ঘটে চলুক আমরা কেবল ভোগবাদী মুনাফার স্বার্থই দেখব? কাঁকড়াসহ সুন্দরবনের প্রাণসম্পদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনই আমাদের জোরদার নীতি জরুরি। সুন্দরবন বাঁচুক তার কলাকাটা কী পান্তাভাসানি গোণের স্মৃতিতে। আমরা আর কোনো ‘চাইনিজ কি জাপানিজ গোণের’ আমদানি চাই না। কলবাড়ী থেকে ফেরার পথে আটকে থাকা কাদায় সাবুদ সানার নৌকাটি ছলছল করে ওঠে। কী জানি কী বলতে চায়! মানুষ হিসেবে আমরা কি আর নৌকা বা নদী কী কাঁকড়ার ভাষা রপ্ত করতে পারি!
লেখক
প্রাণ ও প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষক
