‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারোর দানে পাওয়া নয়, আমি দাম দিছি প্রাণ লক্ষ কোটি, জানা আছে জগৎময়’ প্রাণের বিনিময়ে বাংলা ভাষাকে পেয়েছি বলেই আমরা আজো মনে রেখেছি ভাষাশহীদদের। গতকাল শুক্রবার একুশে ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা অর্জনের ৬৮ বছর পূর্ণ হলো। রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণসহ বিদেশেও বাঙালিরা বাহান্নর ভাষাশহীদদের স্মরণ করেছেন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
একুশের প্রথম প্রহরে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি...’ বাজানো হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী আলাদা বাণীও দিয়েছেন। সারা দেশে শহীদ মিনারগুলোতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করেছে জাতি।
বাংলাদেশের পাশাপাশি ইউনেস্কোর সদস্য সব দেশও পালন করেছে আমাদের একুশকে। বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে নিবন্ধিত করার দাবি জানানো হচ্ছে কয়েক বছর ধরেই। গতকাল আবারও সে দাবি তুলেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মন্ত্রিবর্গ ও দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে দলের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুনরায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের সংসদ সদস্যরা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মেয়র সাঈদ খোকন। জিএম কাদেরের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির নেতারা শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাকর্মীরা প্রভাতফেরি করে গতকাল সকাল ৮টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে সকাল ৬টায় বুকে কালো ব্যাজ পরে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারত করেন তারা।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী প্রধান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুলিশের পক্ষ থেকে মহাপুলিশ পরিদর্শক ও র্যাবের পক্ষ থেকে মহাপরিচালক পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, বিদেশি সংস্থার প্রধানরা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও একুশের প্রথম প্রহরে শহীদবেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
এ ছাড়া অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও কেন্দ্রীয় ১৪ দল, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, সাম্যবাদী দল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায়।
এ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্যবৃন্দ, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ থ্রোবল অ্যাসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, গণতন্ত্রী পার্টি, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষাশহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের অগণিত মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন। এ সময় হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ পরে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’Ñ গানে কণ্ঠ মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। একই সঙ্গে তারা সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন ও অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের দাবি জানান।
নানা আয়োজনে উদযাপিত মাতৃভাষা দিবস : দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের দু’দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে ছিল প্রত্যুষে সংগঠনের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সংগঠনের সব শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন, সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন। এ ছাড়া আজ শনিবার বেলা ৩টায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে হবে আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গতকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উপলক্ষে আয়োজন করা হয় সভা-সেমিনার এবং আলোচনা সভা। মাতৃভাষার অর্জন ও শহীদদের ত্যাগের কথা স্মরণের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয় দিনটি। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করা হয়।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত কয়েক বছর ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি (১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন) দিনটিতে ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখরাঙানি ও প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলে। সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এ সময় সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী : শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, ‘মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালির মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজস্ব জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষারও আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস।’ প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেন, ‘মহান একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির জীবনে শোক, শক্তি ও গৌরবের প্রতীক। সারা বিশ্বের সব নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’
প্রভাতফেরিসহ কামরাঙ্গীরচরে নানা কর্মসূচি : আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে কামরাঙ্গীরচর শহীদ মিনারে শহীদদের স্মরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও স্থানীয় সাংসদ মো. কামরুল ইসলাম, কামরাঙ্গীরচর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন, কামরাঙ্গীরচর থানার ওসি এবিএম মশিউর রহমানসহ সর্বস্তরের জনতা। গতকাল সকাল সাড়ে ৬টা থেকে স্থানীয় প্রায় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে হয় প্রভাতফেরি।
এর আগে দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার কামরাঙ্গীরচরের খলিফাঘাট মোড় থেকে বড়গ্রাম মোড় পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ১০০ ফুট সড়কে আলপনা আঁকা হয়। এতে অংশ নেয় স্থানীয় ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬৫০ শিক্ষার্থী। কর্মসূচি তদারকি করেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন। এছাড়া শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা দেশাত্মবোধক গান ও আবৃত্তি পরিবেশ করে।
