বই সময়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দর্পণ। বইয়ের হরফ শুদ্ধ আলোর প্রদীপ। যে আলোয় উদ্ভাসিত হয় সমাজ ও সমাজের মানুষ। যে আলোয় সূর্যের মতো দেখা যাবে আগামী দিনের পথ। যে আলোয় নির্মাণ হবে আদর্শ, মানবতাধারী এবং ভালোবাসার মানুষ। তবে সে বই হতে হবে ওহি উৎসারিত এবং ওহির আলোয় জ্বলমলে।
বই শব্দটি এসেছে ওহি থেকে। ওহি থেকে বহি, তারপর বই। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো আল-কোরআন। তার ভাষা, বর্ণ, বর্ণনা, সাহিত্য, উপমা, কাব্য ও গদ্যরীতি, রসবোধ পৃথিবীর সব গ্রন্থকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে। জগতের এ বইয়ের নির্মাতা স্বয়ং আল্লাহ। এবং তা অবতীর্ণও হয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর।
পৃথিবীতে কোরআন একমাত্র গ্রন্থ; যার ব্যাপারে আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন মানুষের প্রতি। কোরআন ছাড়া অদ্বিতীয় কোনো গ্রন্থের ব্যাপারে নির্ভুল বলে চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘এটা সেই গ্রন্থ যাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুত্তাকিনদের জন্য এটা পথ নির্দেশ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ০২)
কোরআন একটি গতিশীল ও কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী মুজেজা বা অলৌকিকতা। অন্যান্য সব নবী-রাসুলগণের মুজেজা এবং তাদের ওপর নাযিলকৃত কিতাব বা গ্রন্থ তাদের জীবন পর্যন্ত কার্যকর ও বিদ্যমান ছিল। কিংবা অন্য নবী আগমনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ মুজেজা কোরআনুল কারিম তার মৃত্যুর পরও পূর্বের ন্যায় আপন বৈশিষ্ট্যে বিদ্যমান রয়েছে।
কোরআনের বর্ণ, শব্দ, ভাষা, রচনা শৈলী, উপমাতে আজ অবধি কোনো পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়নি। কিয়ামত পর্যন্ত এটি টিকে থাকবে এবং মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাবে। রাসুল (সা.) বলেন ‘আমি তোমাদের মধ্যে এমন দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে থাকলে তোমরা কোনোদিন পথহারা হবে না। আর তাহলো আল্লাহর কোরআন এবং তার নবীর সুন্নত।’ (মুয়াত্তায়ে মালেক, হাদিস : ১৫৯৪)
কোরআন ও কোরআনের নির্দেশনাবলি সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। পৃথিবীতে এ যাবৎ যেসব বই এসেছে বা আসবে, এর প্রত্যেকটির সীমা নির্ধারিত। এছাড়াও আল্লাহর নবীদের ওপর যে গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছিল, সেগুলোও ছিল জাতি ও গোত্র বিশেষের জন্য সীমিত। একমাত্র মোহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ গ্রন্থ পুরো বিশ্ববাসীর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষের জন্য পথনির্দেশক হিসেবে বিশেষায়িত হয়েছে।
মানব জীবনের সব বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে পবিত্র মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। আল্লাহ বলেন ‘পরম করুণাময় তিনি, যিনি তার বান্দার প্রতি ফায়সালা গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হয়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ০১)
কোরআনে বিভিন্ন আয়াতে মানুষের অন্তর্নিহিত কিছু বিষয়ের সুসংবাদ দিয়েছে, পরে সংশ্লিষ্ট লোকদের স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে যে এসব কথা সত্য। তাদের মনে উদিত বিষয় এরকমই ছিল। এটা একমাত্র আল্লাহর কাজ। আর যে গ্রন্থে মনে উদিত কথার সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সে গ্রন্থও স্বয়ং আল্লাহর।
ভবিষ্যতে ঘটবে এমন বহু ঘটনার সংবাদ কোরআন পূর্বেই দিয়েছে, যা পরে হুবহু সংঘটিত হয়েছে। কোরআন শরিফের সুরা আর রুমের এক থেকে চার নম্বর আয়াতে ঘোষিত হয়েছে ‘আলিফ, লাম, মিম। রোমকরা পরাজিত হবে। নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর অতিসত্তর বিজয়ী হবে কয়েক বছরের মধ্যে। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে। আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।’
ইতিহাসের পাতায় রোম সা¤্রাজ্যের জয়-পরাজয়ের কথা বিধৃত হয়েছে। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মক্কার কুরাইশরা আবু বকর (রা.)-এর সঙ্গে এই আয়াতের ভবিষ্যদ্বাণীর যথার্থতা সম্পর্কে বাজি ধরে। শেষ পর্যন্ত কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী রোম বিজয় লাভ করে এবং আবু বকর (রা.) বাজিতে জিতেও বিনিময় নেয়নি।
পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী উম্মত, তাদের শরিয়ত, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঘটনা এবং জীবন ধারণ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোরআনে বর্ণিত সবকিছুই সত্য ও যথার্থ। ইতিহাসে আলোড়িত ও আলোচিত ঘটনা; কাহাফবাসী থেকে শুরু করে ইব্ররাহিম (আ.)-এর কাবা নির্মাণ, মুসা (আ.)-এর নীল নদ পাড়ি, তার জাতির মান্না সালওয়া খাবার, ঈসা (আ.)-এর পবিত্র মাতার কাহিনী এবং এমন বহু ঘটনা কোরআনে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রমাণিত।
কোরআন শরিফ শ্রবণ করলে মুমিন-কাফের নির্বিশেষে সবার ওপর প্রভাব পড়ে। সবার মনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কোরআন পাঠের মহিমায় মানবহৃদয় হারিয়ে যায় রবের করুণাবৈভবে। মন প্রশান্ত হয়ে অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি করে।
জুবাইর ইবনে মাতআম (রা.) ইসলাম গ্রহণের পূর্বে একদিন রাসুল (সা.)-কে মাগরিবের নামাজে সুরা তুর পড়তে শুনেন। মহনবী (সা.) যখন শেষ আয়াতে পৌঁছলেন, তখন জুবাইর বলেন যে, ‘মনে হলো যেন আমার অন্তর উড়ে যাচ্ছে।’
কোরআন শরিফ বারবার পাঠ করলেও মনে বিরক্তি আসে না। যত বেশি শ্রবণ করা যায়, ততই ভালো লাগে। শুনতেই ইচ্ছে করে, মনে হয় যেন এই মাত্র শুনলাম। বরং আরও আগ্রহ বাড়তে থাকে। অধীর আগ্রহে দুনিয়ার কোনো খেয়াল থাকে না। কোরআন শ্রবণকারী যেন দুনিয়াবিচ্ছিন্ন মানুষ।
কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহর। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে মক্কা মদিনার কোলে মহানবীর ওপর কোরআন নাযিল হয়। কোরআন শুরুতে যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে, দেড় হাজার বছর পরও তাতে বিন্দুমাত্র রদবদল হয়নি। কোনো পবিবর্তন পরিবর্ধনের ছোঁয়া লাগেনি। পৃথিবীর অন্য গ্রন্থের ব্যাপারে এমন কল্পনাও করা যায় না।
মানুষের অন্তরে নির্ভুলভাবে কোরআন বেঁচে আছে। নির্ভুল এই কোরআন একটি ছোট বাচ্চার পবিত্র কলবেও নির্ভুলভাবেই বেঁচে থাকে। কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ নিজে। আল্লাহ বলেন ‘নিশ্চয় আমি উপদেশ গ্রন্থ নাযিল করেছি এবং তা সংরক্ষণের দায়িত্ব আমার নিজের।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৩৭)
কোরআন একমাত্র গ্রন্থ যা পাঠ করলে সওয়াব হয়। প্রতি হরফে হরফে পুণ্য হয়। পাঠকারীর ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়।
এই গ্রন্থ পাঠ করলে অফুরান সওয়াবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাদিসে বিধৃত হয়েছে ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব কোরআনের একটি হরফ পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি লেখা হয় দশগুণ। আমি বলি না আলিফ-লাম-মিম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মিম একটি হরফ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৯১০)