ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছেদের পালা চূড়ান্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্য সম্প্রতি অভিবাসী নেওয়ার জন্য নতুন পয়েন্টভিত্তিক পদ্ধতির কথা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল সম্প্রতি এটি ঘোষণা করেন। যুক্তরাজ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অদক্ষ কর্মী যাওয়া কমিয়ে আনাই এ নীতির লক্ষ্য। বিষয়টি নিয়ে মাসের পর মাস ধরে জল্পনা-কল্পনা ও বছরের পর বছর টানা বিতর্ক চলার পর ব্রিটিশ সরকার অবশেষে ব্রেক্সিট-পরবর্তী অভিবাসন পরিকল্পনার বিবরণ ঘোষণা করল। গত বছরের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কনজারভেটিভ পার্টির সরকার যুক্তরাজ্যের জন্য শিগগিরই একটি পয়েন্ট-ভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। (কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে যেমন ব্যবস্থা চালু আছে- অনুবাদক) এর লক্ষ্য ‘স্বল্প দক্ষ’ লোকের অভিবাসন বন্ধ করা। অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার সংবলিত ইশতেহার দিয়েই নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল কনজারভেটিভ পার্টি। আলোড়ন তোলা ব্রেক্সিটের পেছনের অন্যতম প্রধান কারণই ছিল অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক। সদ্যঘোষিত নতুন নিয়মের অধীনে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার জন্য আগ্রহী ব্যক্তিদের ৭০ পয়েন্টের প্রয়োজন হবে। এ পয়েন্ট অর্জন করার জন্য যে শর্তগুলো পূরণ করতে হবে সেগুলো হচ্ছে প্রতি বছরে ২৫,৬০০ ডলারের বেশি অর্থ উপার্জন করতে হবে (২০ পয়েন্ট), ভালো ইংরেজি বলতে পারতে হবে (১০ পয়েন্ট), সরকার অনুমোদিত স্পনসরের কাছ থেকে চাকরির অফার থাকতে হবে (২০ পয়েন্ট) এবং এ ধরনের আরও কিছু বিষয়। সংক্ষেপে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে : আপনি যদি ইতিমধ্যেই সফল না হয়ে থাকেন, তবে ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন! (আমি নিজে একজন বিদেশি এবং এক দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছি। অথচ আমার এখনো এখানে স্থায়ীভাবে চলে আসার মতো পর্যাপ্ত পয়েন্ট হবে না)। যারা ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ‘লিভ’ শিবিরে ছিল (অর্থাৎ ইউরোপ থেকে বিচ্ছেদের পক্ষে রায় দিয়েছিল) তারা এই নতুন পদ্ধতিকে স্বাগত জানাতে পারে। তাদের অনেকেই যুক্তরাজ্যে অভিবাসন হ্রাস করতে চেয়েছিল এবং মনে করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোট ত্যাগ করলেই সে লক্ষ্য পূরণ হবে। তবে এরকম একটি পয়েন্ট পদ্ধতি দেশটিকে দরিদ্রতর হওয়ার ঝুঁকির মুখে ফেলবে আক্ষরিক এবং রূপক উভয় অর্থে। এটি বেশিরভাগ অভিবাসীর মনোভাব সম্পর্কে একটি মৌলিক ভুল বোঝাবুঝিকেও তুলে ধরে, তা পরিকল্পিত বা ভুলবশত যেটাই হোক না কেন।
যুক্তরাজ্যের আজকের অনেক সফল ব্যক্তিরই আগে থেকেই অন্য কোথাও একটি উজ্জ্বল সফল ক্যারিয়ার ছিল না। তারা প্রথমে এখানে এসেছিলেন এবং পরে পরিশ্রম করে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেন। যুক্তরাজ্যে আসার পর ভাগ্য গড়ে নেওয়ার এক দারুণ উদাহরণ টুইট করে জানিয়েছেন লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক হ্যারি ওয়ালপ। টুইটে ওয়ালপ জানিয়েছেন, তার প্রপিতামহ বছর পনেরো বয়সে প্রায় শূন্য হাতে লিথুয়ানিয়া থেকে ব্রিটেনে এসেছিলেন। তিনি ঘুরে ঘুরে জুতার ফিতা বিক্রি করে পেট চালাতেন। এক অক্ষর ইংরেজি বলতে পারতেন না। কিন্তু তিনি লেগে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত দারুণ এক পোশাকের ব্র্যান্ড তথা ব্রিটেনের ষষ্ঠ বৃহত্তম কোম্পানি ‘বার্টন’স দ্য টেইলার্স’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সফল সাংবাদিক হ্যারি ওয়ালপের পূর্বপুরুষ যুক্তরাজ্যে কোনো চমকপ্রদ ব্যতিক্রম নন। ‘গ্লোবাল অন্ট্রাপ্রেনারশিপ মনিটর’ এর ২০১৭ সালের এক সমীক্ষা অনুসারে অভিবাসীদের মধ্যে ‘প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগমূলক কার্যক্রমে’ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারীদের চেয়ে দেড় গুণ বেশি।
বিশ্লেষণ সংস্থা জিরার (Zirra) গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটেনের শীর্ষ দশটি ‘ইউনিকর্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের’ (১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যের) মধ্যে নয়টিরই প্রতিষ্ঠাতা দলে ছিলেন কমপক্ষে একজন প্রথম বা দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘সেন্টার ফর অন্ট্রাপ্রেনারস’-এর বিশ্লেষণ থেকেও অনুরূপ তথ্য পাওয়া যায়। এতে দেখা গিয়েছিল, যুক্তরাজ্যের প্রতি সাতটি প্রতিষ্ঠানেরই একটি তৈরি করেছে অভিবাসী উদ্যোক্তারা। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের চাকরির ১৪ শতাংশই তাদের অবদান। এই সাফল্যের কাহিনীগুলোর আড়ালে ব্রিটিশ সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে এক অস্বস্তিকর সত্য : চমৎকার ধারণার অধিকারী মেধাবী অভিবাসীদের এক গর্বিত দেশ হিসেবে অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিদেশিদের সুযোগ দিতে অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে যুক্তরাজ্যকে। ঝুঁকি নেওয়ার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল ব্রিটেন। তখন যাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল তারাই আজকের উন্নত দেশটির ভিত গড়ে তোলে। একজন যদি এখানে এসে সফল হয়ে থাকে তাহলে আরও অগণিত লোক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, সফল হওয়ার চেষ্টা করা অনেকেই একসময় বুঝতে পারেন, এর পরিবর্তে একটি স্বাভাবিক, শান্ত জীবন কাটাতে পারলেই ভালো হতো। আচ্ছা, প্রেমের ক্ষেত্রে কী হয়? মাঠে না নামলেও কি হুট করে মনের মতো মানুষ সামনে হাজির হয়? একইভাবে, কোনো দেশ কেবল শ্রেষ্ঠদের বেছে নেওয়ার পথে চলতে পারে না। দেশটিকে অবশ্যই মানুষের ক্ষেত্রে সুযোগ দিতে ইচ্ছুক থাকতে হবে। তা করলেই কেবল পরে পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। অনেক দিক থেকেই ব্রিটেন দেশটি গড়ে উঠেছিল ঝুঁকি নেওয়ার মাধ্যমে। সেই সুদূর অতীতে যাদের বাইরে থেকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল তারা কালক্রমে ব্রিটিশ সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। যুক্তরাজ্যকে তারা আজকের উন্নত অবস্থানে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছেন। পরে তাদের মধ্যে কিছু ব্যক্তি অসাধারণ কর্মজীবন গড়ে তোলেন। কিন্তু অনেকেই তা পারেননি। অনেকেই এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। নেপথ্যে। তারা হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসা করছেন। নিয়োজিত আছেন কেয়ার হোমে বয়স্কদের যতœ নেওয়ায়। কেউবা ব্যস্ত অফিস কর্মীদের জন্য তৈরি করে চলেছেন কালো কফি আর হ্যাম-চিজ-টোস্টি। নিজেদের কমিউনিটির অংশ হতে এবং আশপাশের লোকদের সহায়তা করতে তাদের তো বিশাল বেতন পাওয়ার বা অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে অসাধারণ ফল করার দরকার নেই। অভিবাসীদের কেবলমাত্র মানব-আকৃতির ‘দক্ষতা সরবরাহকারী’ হিসেবে দেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল হয়তো বৃহত্তর ছবিটি দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আপনি যদি চারপাশের বিশ্বের কাছে এটি স্পষ্ট করে দেন যে, প্রথম থেকেই কার্যকারিতা প্রদর্শন করতে পারলেই কেবল বিদেশিদের মূল্য দেবেন তাহলে আপনার অফারটি আকর্ষণীয় হবে না। মানুষ কেবল সংখ্যায় (বা পয়েন্টের ভিত্তিতে) চিন্তা করে না। ধরা যাক, তারা নতুন দেশ হিসেবে কোথাও পাড়ি জমাতে চায়। সেখানে তাদের স্বাগত জানানো হবে এটা আশা করা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক হবে না! ব্রিটেনের কাছে ‘সেরাদের মধ্যে সেরাদের’ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যটির মধ্যে অন্তর্নিহিত কোনো দোষ নেই। তবে যুক্তরাজ্যকে মনে রাখতে হবে, কেবল তার একারই নিজের পছন্দমতো বেছে নেওয়ার অধিকার নেই। সবশেষ কথা হচ্ছে , কেউ যদি খুব মেধাবী, উচ্চাভিলাষী আর যে কোনো স্থানের ব্যাপারে উদারই হয় তাহলে এমন কোনো জায়গায় কেন যেতে চাইবে যেখানে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে নাক সিঁটকিয়ে?
লেখক : একজন লন্ডনভিত্তিক মরোক্কান বংশোদ্ভূত ফরাসি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
