‘ফের প্রকাশ্যে’ আসার চেষ্টা চালাচ্ছে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর। সম্প্রতি ‘নতুন সংবিধান’ দাবি করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার টানিয়েছে তারা। এতে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অনলাইন সম্মেলন’ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ ঘোষণায় নড়েচড়ে বসেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। সংগঠনটিকে যারা নানাভাবে সহায়তা করে আসছে তাদের খোঁজে মাঠে নেমেছে পুলিশ-র্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের কাছে তথ্য এসেছে, প্রায় অর্ধশত প্রবাসী বাংলাদেশি হিযবুত তাহরীরকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করছে। ইতিমধ্যে ওইসব প্রবাসীর তালিকা তৈরিও করা হয়েছে। এছাড়া সংগঠনটির আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের গ্রেপ্তার ও তারা যাতে সম্মেলন করতে না পারে সে জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে দিকনির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হিযবুত তাহরীর নিষিদ্ধ সংগঠন। তাদের সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। তারা পোস্টারিং করেছে তা আমাদের নজরে এসেছে। ইতিমধ্যে হিযবুতসহ সব জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছি। তারা কোনো সম্মেলন করতে পারবে না। আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।’
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র, রুশ ফেডারেশন, পাকিস্তান, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, কাতার, সুদান, ওমান, জর্ডান, সিরিয়া, ইরাক, মিসর, লিবিয়া, উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, আজারবাইজান, তুরস্ক ও তিউনিশিয়া সরকার হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে তাদের প্রচার চলছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ করার পরও হিযবুত তাহরীরের কার্যক্রম থামছে না। নানা কৌশলে লাইম-লাইটে আসার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ভিন্ন কৌশল নিয়েও মাঠপর্যায়ের নেতাদের আইনের আওতায় আনতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে তারা কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। এরপরও নিষিদ্ধ এই সংগঠনের সদস্যরা রাতের আঁধারে পোস্টারিং বা লিফলেট বিলি করছে। কয়েক দিন আগে তারা ‘নতুন সংবিধান’ চেয়ে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টারিং করেছে। তাদের তৎপরতা প্রতিরোধ করতে পুলিশ-র্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হিযবুত তাহরীর ওয়েবসাইট সন্ধানের কাজ শুরু করেছে। দেশের কোন কোন অঞ্চলে তাদের কমিটি আছে সেই তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীদের কীভাবে দলের আনা যায় সে জন্য তাদের ‘দাওয়াতি টিম’ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এমনকি মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও সংগঠনের নেতাকর্মীরা তথ্য আদান-প্রদান করছে।
দেয়ালে টানানো পোস্টারে বলা হয়েছে, ‘আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালনায় হিযবুত তাহরীর কুরআন, সুন্নাহর ভিত্তিতে ১৯১টি অনুচ্ছেদ সংবলিত সংবিধান প্রণয়ন করেছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় অনলাইনে সম্মেলন করা হবে। সম্মেলন সম্প্রচারের সাইট : Alwaqiyah. tvFacebook.com/Alwaqiyah.tv, youtube.com/Alwaqlyahtv।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাবের দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেয়ালে দেয়ালে পোস্টারিং করার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তাদের কর্মকাণ্ড চিরতরে শেষ করে দিতে আমরা কঠোরতা দেখাচ্ছি। এর আগেও তারা প্রোপাগান্ডা চালাতে পোস্টারিং ও লিফলেট ছেড়েছিল। নিষিদ্ধ এই সংগঠনটির একটি গঠনতন্ত্র আছে। ওই গঠনতন্ত্রে তারা বলেছে, হিযবুত তাহরীর উলাইয়া বাংলাদেশ। বাংলা অর্থ হচ্ছে-মুক্তির দল। সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর নাজিলকৃত বিধিবিধানের শাসন পুনরায় ফিরিয়ে আনা। তাদের ‘দাওয়াতি কার্যক্রমকে’ কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।’
তারা আরও বলেন, সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে আরও বলা হয়েছে, সংগঠনের প্রত্যেক সদস্যকে মুসলমান হতে হবে। ইসলামি আদর্শকে সত্য আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়ার মনমানসিকতা থাকতে হবে। রাষ্ট্রের প্রধান হবেন খলিফা। ১৪টি কাঠামো থাকবে রাষ্ট্রে। এক কেন্দ্রিকভাবে রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা চালানো হবে। রাষ্ট্রের চারটি সর্বোচ্চ শাসক পদ থাকবে। খলিফা, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী, গভর্নর ও মেয়র পদে অমুসলিম ও নারীরা অংশ নিতে পারবেন না। কাজী আল খুসুমাত, কাজী আল হিসবা ও কাজী আল মুহকামাত আল মাজালিম নামে তিন ধরনের বিচারক থাকবেন রাষ্ট্রে। তারা যথাক্রমে জনগণের মধ্যে লেনদেন ও শাস্তি-সংক্রান্ত বিষয়, জনগণের অধিকার-সংক্রান্ত আইনভঙ্গের বিচার এবং জনগণ ও শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যকার বিবাদ মীমাংসা করবেন। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন খলিফা। একজন নারীর জন্য শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করার অনুমতি নেই। গঠনতন্ত্রে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্র আমির উল জিহাদ নামে একটি বিভাগ থাকবে। পররাষ্ট্র বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শিল্প বিভাগের সমন্বয়ে এর কার্যালয় গঠিত হবে।
ওই দুই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাদের গঠনতন্ত্রটি ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু না। সংগঠনটির আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের ধরতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
