শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০৬ এএম

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলাভাষাকে যথাযথ সম্মানে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। মাথার ওপর সংবিধান রেখে হাতে শিক্ষানীতি নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে তাতে জনগণের মধ্যকার বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। সাধারণ জনগণের জন্য শিক্ষার মাধ্যম বাংলা এবং বিত্তবান শ্রেণির জন্য ইংরেজি প্রক্রিয়াটি চলমান। এখনো দেশে চাকরি, ব্যবসা, সবকিছুতে ইংরেজি অপরিহার্য ভাষা হিসেবে বিবেচিত। এতে করে দেশের বড় চাকরি ও ব্যবসা বিত্তবান শ্রেণির সন্তানদের আয়ত্তে। সাধারণ জনগণের শিক্ষাব্যবস্থায় বাঙালি বলে বাংলা, ইসলাম ধর্মাবলম্বী বলে আরবি এবং উন্নয়নশীল দেশের মানুষ হিসেবে ইংরেজি শেখানো হয়ে থাকে। তিনটি ভাষার চাপ সহ্য করে এগিয়ে যেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রজন্মের উত্তরাধিকারীরা। স্বপ্নে পাওয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাপে পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সিস্টেমলস হিসেবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বিপরীতে ইংরেজি শিক্ষা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের বাইরে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বিদেশি পরিচয় পাওয়ার দৌড়ে দুর্বারগতিতে ছুটে চলেছে। বিত্তবানদের সন্তানরা এই শিক্ষার উপকারভোগী হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্টরা উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় সন্তানদের উন্নত বিশ্বে পড়ানো বা পাঠানোর ব্যবস্থা, সুযোগ হলে দেশে ফিরে শাসক-শোষক হয়ে দেশের অর্থসম্পদ পাচার করে বিদেশে বসবাসের পাকাপাকি ব্যবস্থা করে রাখে যারা দেশে এখন সেই শ্রেণির মানুষদেরই জয়জয়কার। বাংলাদেশে সুখ-শান্তি ভোগের একচেটিয়া অধিকার তাদেরই।

বিদেশি ভাবধারায় শিক্ষিত শ্রেণি আজ বাংলাদেশপ্রেমী, বাংলাভাষাদরদী। সারা বছর যাই হোক ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাংলা ভাষার মহিমা প্রচারে নেমে পড়ে তারা। স্বদেশপ্রীতি আর বাংলাভাষাপ্রীতি একাকার হয়ে যায়। সাধারণ মানুষকে অতীত ঐতিহ্যের গর্বে আত্মহারা করে দেয়। বাঙালির মাতৃভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহিমাকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করতে সারা বিশ্বে আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক

মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের একটা প্ল্যাটফর্ম দেশের জনগণকে উপহার দেওয়া হয়েছে। এই প্রাপ্তির গর্বে-গৌরবে জাতি আজ অকারণ পুলক বোধ করছে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে দিবসটি উদযাপন করছে। কিন্তু সালাম-বরকত-জব্বার-রফিকের আত্মত্যাগে প্রতিষ্ঠিত বাংলা ভাষা এখনো অবহেলিত। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। অঙ্গীকার ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার। বাংলাভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের ভাষা হয়নি। স্বাধীনতা যে সুযোগ সৃষ্টি করেছিল তা আমাদের নিজেদের অযোগ্যতার কারণে গ্রহণ করা গেল না। সর্বস্তরে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতার জন্য লজ্জিত হয়ে আত্মশোধনের গরজ অনুভব না করে নিজেদের আরও আত্মপ্রত্যয়ী শক্তিমান হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সর্বব্যাপী চলমান। সারা বিশ্বে বাংলাভাষা কতটা মর্যাদাবান হলো তা বিচারের আগে আমাদের নিজেদের অবস্থান বিবেচনার দাবি রাখে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে বলতে হচ্ছে আজও আমাদের উচ্চশিক্ষায় আর উচ্চ আদালতে বাংলাভাষা স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠা লাভে ব্যর্থ। আগে শুনতাম পাঠ্যবইয়ের অভাব। গত ৭০ বছরেও দেশ এ সমস্যার সমাধান করতে পারল না। আর উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলনের সমস্যা ঠিক বুঝে উঠতেই পারি না। তবে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার আমাদের দার্শনিকরা মাতৃভাষায় নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। এটা যদি পারতেন তাহলে কি উচ্চশিক্ষা আর উচ্চ আদালতে বাংলাভাষা প্রচলনে সমস্যা হতো? সমস্যা সমাধানের ন্যূনতম কোনো প্রচেষ্টাও আমাদের মধ্যে দেখা যায় না। আজও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাতে হয় আদালতের রায় বাংলায় লেখার জন্য। এখানে আভিজাত্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলছে। পাশাপাশি বাংলাভাষাকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে তার সীমাবদ্ধতাগুলো প্রকাশের প্রচেষ্টাও আছে। ইতিহাস বিচারে বিষয়টি স্বাভাবিক। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের দাবিতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক পাকিস্তান গণপরিষদে আনীত প্রস্তাবের সপক্ষে উপস্থিত বাঙালি মুসলমান সদস্যরা কোনো কথা বলেননি। বরং কেউ কেউ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। সেই ধারাবাহিকতা থেকে মুক্তি ৫০ বছরেও হলো না, আগামী কতদিনে তা আসবে অনুমান করা কঠিন।

অন্য বিতর্কে না গিয়ে একটাই প্রশ্ন রাখতে চাই দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য ইংরেজিতে ব্যুৎপত্তি অর্জন কি আবশ্যক? আমাদের ভাষা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ এ প্রশ্নের সমাধান করতে পারত। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আজ ইংরেজি জ্ঞান বিচার করে শিক্ষার উচ্চতা মাপা হচ্ছে, চাকরিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এখানে ইংরেজিতে কথা বলা বা বক্তৃতা করার ক্ষমতাকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করা হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনভাবে সব সুযোগ ভোগে ইংরেজিকেই একমাত্র অবলম্বন করে ফেলা হয়েছে যা আমাদের ভাষা সংগ্রামের চেতনার সঙ্গে প্রকৃত অর্থেই সাংঘর্ষিক। এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ বের করার দায়িত্ব যে রাজনীতির, যে রাজনীতি সাধারণ জনগণের জন্য ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগকে অন্ধকারের পথ থেকে আলোর পথে আনবে, তারাই আজ সব আলো নিজেরা দখল করে নিয়েছে।

আমাদের মেধাবী সন্তানরা বিশ্বের অনেক দেশে গিয়ে কয়েক মাসের মধ্যে তাদের ভাষা রপ্ত করে শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে থাকে। এটা যদি সত্য বলে মানি তাহলে আমাদের শিশু শিক্ষার্থীদের বিদেশি ভাষা শিক্ষা আবশ্যক কেন করা হয়? দেশে সবার জন্য বিদেশি ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে না। দেশ ও জাতির প্রয়োজন বিবেচনায় অল্প কিছু শিক্ষার্থী বা আগ্রহী কিছু শিক্ষার্থী বিশেষ ব্যবস্থায় বিদেশি ভাষা শিখে নিতে পারে। তাহলে আমাদের শিশু শিক্ষার্থীরা বিদেশি ভাষার চাপ থেকে মুক্তি পাবে। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিয়ে মানসম্পন্ন শিক্ষায় নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। আর থাকে অগ্রসরমান বিশ্বের জ্ঞানবিজ্ঞানকে ধারণ করার ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগী হলেই একটা অনুবাদকের দল তৈরি করতে পারে যারা প্রতিনিয়ত বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুবাদ শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেবেন। এতে করে আমাদের শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষায় বিশ্বকে জানতে পারবে এবং নিজেদের যোগ্য করে তুলতে সক্ষম হবে।

দেশ ও জনগণের জন্য বাংলাভাষার পরিবেশ ও পরিস্থিতি এমনটা হলেও বাংলাভাষার উন্নয়নে আমাদের অবদানও নেহাত কম না! শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। উপরন্তু  বাংলা একাডেমি বাংলা বানান সংস্কার করে ব্যবহারকারীদের জন্য পথকে আরও সুগম করে দিয়েছে। বাংলাভাষা ও সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইত্যাদি রথী-মহারথীদের বানানরীতি পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তা বোধগম্য তো নয়ই বরং বলা চলে সনাতনী বানানরীতি পরিবর্তন করে বর্তমানে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করা হয়েছে। মুক্তির জন্য কত বছর অপেক্ষা করতে হবে কে জানে? এই রীতি পরিবর্তন বাংলাভাষাকে পিছিয়ে দিল কি না সেটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন।

ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সম্মান জানাতে বাংলাভাষাকে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। জাতিগত দায় মেটাতে আজ সাধারণ মানুষের সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষাকে অপরিহার্য করে তোলা হোক। শিক্ষা ও প্রশাসনের সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার নিশ্চিত করা হোক, বাধ্যতামূলক করা হোক। তাহলে অমর একুশে পালন সার্থক হবে। সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব গ্রহণকারীরা বাংলাভাষাকে আপন সম্মানে অধিষ্ঠিত করতে দায়িত্ববান হয়ে ব্যাপক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অন্ধকার দূর করে আলোর বাংলাদেশ তৈরিতে নিবেদিত হবেন এ আশায় থাকব।

লেখক

প্রাবন্ধিক, সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত