১৪ ওয়ার্ডে আ.লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৪:৩০ এএম

আগামী ২৯ মার্চ হতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন। নির্বাচন সামনে রেখে জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দল। নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন এম রেজাউল করিম চৌধুরী; বাদ পড়েন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। চসিকের মোট ৫৫টি ওয়ার্ডেও (৪১টি সাধারণ ও ১৪টি সংরক্ষিত) আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বাদ পড়েছেন বর্তমান ২০ কাউন্সিলর, যাদের মধ্যে চারবার নির্বাচিত কাউন্সিলরও আছেন, আছেন একবার নির্বাচিত কাউন্সিলরও। তাদের ১৪ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তারা বলছেন, জনপ্রিয়তা ও স্থানীয়দের নেবেন।’ নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) আগামী ২৯ মার্চ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ সিটির ভোট হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আগামীকাল ২৭ ফেব্রুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই ১ মার্চ। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৮ মার্চ। প্রতীক বরাদ্দ ৯ মার্চ।

আওয়ামী লীগের সমর্থনবঞ্চিত যে ১৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন তারা হলেন- ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের সাহেদ ইকবাল বাবু, ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জহুরুল আলম জসীম, ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের মোরশেদ আকতার চৌধুরী, ১২ নম্বর সরাইপাড়া ওয়ার্ডের সাবের আহমেদ, ১৪ নম্বর লালখানবাজার ওয়ার্ডের আবুল ফজল কবির আহমদ ওরফে মানিক, ২৬ নম্বর উত্তর হালিশহর ওয়ার্ডের আবুল হাশেম, ২৭ নম্বর দক্ষিণ আগ্রাবাদ ওয়ার্ডের এইচ এম সোহেল, ২৮ নম্বর পাঠানটুলী ওয়ার্ডের আব্দুল কাদের ওরফে মাছ কাদের, ৩০ নম্বর পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডের মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী, ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডের তারেক সোলেমান সেলিম, ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডের হাসান মুরাদ বিপ্লব ও ৪০ নম্বর উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ডের হাজি মো. জয়নাল আবেদিন এবং সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (৯, ১০ ও ১৩ নম্বর) কাউন্সিলর আবিদা আজাদ ও (১৬, ২০, ও ৩২ নম্বর) আনজুমান আরা বেগম।

ভোটের মাঠে থাকার কারণ জানতে চাইলে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল কাকে মনোনয়ন দিয়েছে, সেটা দেখার বিষয় নয়। আমি গতবার ডলফিন ভাইকে পরাজিত করে কাউন্সিলর হয়েছি। জনপ্রিয়তা আছে বলেই আমি কাউন্সিলর হয়েছি। তাই গতবারের মতো এবারও নির্বাচন করব। তাছাড়া এটা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এবার ইভিএমে ভোট হবে। যত বেশি প্রার্থী হবে, তত বেশি ভোটার কেন্দ্রে আসবে। এলাকার মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।’ ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মানিক বলেন, ‘এলাকার মুরব্বিরা চান আমি নির্বাচন করি। যেহেতু এলাকার লোকজন আমাকে চাচ্ছে, তাই নির্বাচন থেকে তো সরতে পারি না।’ দলীয় সমর্থনবঞ্চিত ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিরণ বলেন, ‘দল যাকে সমর্থন দিয়েছে, তার সঙ্গেই কাজ করব। আমি চারবার কাউন্সিলর হয়েছি। তাই নির্বাচন করব না। এবার নবীনদের ছেড়ে দিয়েছি।’

দলীয় সমর্থনবঞ্চিত সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবিদা আজাদ বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। ১৯৭৫ সাল থেকে আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। দলের জন্য দুর্দিনে কাজ করেছি, এখনো করে যাচ্ছি। এলাকায় আমার জনপ্রিয়তা আছে, অনেক উন্নয়নকাজ করেছি। তাই এবারও নির্বাচন করব। দল থেকে আমার ওয়ার্ডে যাকে দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে নানা বদনাম আছে এলাকায়। কোনো যোগ্যতা নেই তার।’ সংরক্ষিত ওয়ার্ডের আরেক কাউন্সিলর আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘আমি তিনবারের কাউন্সিলর। আমি ১২ বছর ইউনিট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম এবং বর্তমানে ২০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক। আমাকে বাদ দিয়ে যাকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে, তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়ে সমর্থন ভাগিয়ে নিয়েছেন। এলাকার মানুষের দাবির কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব।’

২১ নম্বর ওয়ার্ডে দলীয় সমর্থন চেয়ে পাননি সুচিত্রা গুহ টুম্পা নামে এক আওয়ামী লীগ নেত্রী। জামালখান ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য ও ১ নম্বর ইউনিটের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক টুম্পা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তফসিল অনুযায়ী নারী হয়ে সাধারণ কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করা, না করা নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, আমার নেত্রীও নারী। আমি বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। নারীর ক্ষমতায়নকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে এবং জামালখান ওয়ার্ডকে এগিয়ে নিতেই প্রার্থী হয়েছি।

এদিকে চসিকের এই নির্বাচন সামনে রেখে গত সোমবার নগরের থিয়েটার ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা হয়। সভায় দলের সমর্থন পাওয়া বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে স্থানীয় একাধিক নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন ওয়ার্ডে যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া হয়নি। অনেকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দলের সমর্থন ভাগিয়ে নিয়েছেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চসিক নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন বোর্ডের সভাপতি। সুতরাং যাদের প্রার্থী করা হয়েছে, তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী। দলের স্বার্থে তাদের মেনে নিতে হবে এবং তাদের পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যারা অবস্থান নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে রবিবার রাতে নগরের হোটেল পেনিনসুলায় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে জয়ী করতে দলীয় কোন্দল নিরসনসহ দলের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে ‘রুদ্ধদ্বার’ বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, অর্থ ও পরিকল্পনা সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খান এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত) আহমদ হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন ও মেয়র প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমদ এমপি, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম উপস্থিত ছিলেন। এ সময় সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত