স্কুলে মানবিক বিজ্ঞান ভাগের বিপক্ষে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০২:৪৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় নবম শ্রেণি থেকেই বিষয়ভিত্তিক বিভাজন (বিজ্ঞান-কলা-বাণিজ্য) তুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজস্ব অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটা না থাকাই ভালো। এসএসসির পরে গিয়ে যদি বিভক্ত হয়, সেটাই ভালো।’ বাসস।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সবই পড়–ক। তারপর যেখানে সে মেধা বিকাশের সুযোগ পাবে সেটা করে নেবে। তাহলে অন্তত তাদের (শিক্ষার্থীদের) মেধা বিকাশের একটা সুযোগ হয়।’ প্রধানমন্ত্রী চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে এজন্য শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘এখন সব সাবজেক্টই বিজ্ঞানভিত্তিক। সেটা ধীরে ধীরে চলেই এসেছে। বিজ্ঞানের বাইরে কিছু নেই।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বুধবার সকালে তার কার্যালয়ের (পিএমও) শাপলা হলে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৮’ বিতরণকালে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদের সর্বোচ্চ নম্বর/সিজিপিএ প্রাপ্তদের হাতে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৮’ তুলে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে দেশের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭২ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর মাঝে স্বর্ণপদক বিতরণ করেন। যাদের মধ্যে ৮৪ জন ছাত্র এবং ছাত্রী রয়েছে ৮৮ জন। ২০১৭ সালে ১৬৩ জন শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের (দেশে) ক্লাস নাইন থেকে কে কোন সাবজেক্টে যাবে সেটা ভাগ করে দেওয়া হয়। আমার মনে হয়, এই ভাগটা থাকার কোনো দরকারই নেই। কারণ এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত সব সাবজেক্টই তারা পড়তে পারে।’

বিশ্বের অনেক দেশেই এমনটা নেই। কারণ, বিজ্ঞান না পড়ার ফলে অনেক বিষয়েই শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। ১৯৬৩ সালে আইয়ুব খান (পাকিস্তান আমলে) সরকারের সময় এটা করা হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী শহিদুল্লাহ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা আমরা বলছি। এখানেও আমাদের ছেলেমেয়েদের সেভাবে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠছে এবং সেটা আরও বিকশিত হলে সেখানে আমাদের জনশক্তি লাগবেই। তিনি বলেন, আমাদের জনসংখ্যাকে আমরা যদি কারিগরি, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে সেইভাবে দক্ষ করে গড়তে পারি তাহলে আমাদের কোনো সমস্যা তো কোনোদিন হবেই না বরং আমরা অন্য দেশকে সাহায্য করতে পারব। তার সরকার দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং সে লক্ষ্যে একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেক্ষেত্রে আমরা কাউকেই অবহেলা করতে চাই না। যে কারণে আমাদের মাদ্রাসা শিক্ষার সঙ্গে অনার্স কোর্স চালু এবং প্রযুক্তি শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কওমি মাদ্রাসাকেও আমরা স্বীকৃতি দিয়েছি এবং দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমান দিয়েছি। কারণ তাদেরকেও আমরা সমন্বিত শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। একই ডিসিপ্লিনে নিয়ে আসতে চাই।’ সরকারপ্রধান বলেন, দৈনন্দিন জীবনে কর্মক্ষেত্রে বা চাকরি পেতে যে শিক্ষার দরকার হয়, সে শিক্ষাটাও তারা (মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা) গ্রহণ করবে। সেখানেও মেধাবী শিক্ষার্থী আছে। তাদের কেন অবহেলা করব প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলায় তার সরকারের প্রচেষ্টার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে প্রত্যেক উপজেলায় কারিগরি স্কুল, কলেজ এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। তিনি বলেন, যার যেভাবে শিক্ষা গ্রহণ বা কর্মক্ষেত্রে কাজ করার দক্ষতা রয়েছে সে সেইভাবেই শিক্ষালাভ করতে পারবে। সে সুযোগটা সৃষ্টি করে দেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা চাই, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যেন আমাদের মঞ্জুরি কমিশন খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত একটা অভিন্ন নীতিমালা করা।’ ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কত ছাত্রছাত্রী থাকবে সেটা নির্দিষ্ট করে দেওয়াটাও জরুরি’ এমন অভিমত ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি প্রতিষ্ঠান যাতে মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আর এখন সেটা খুব কঠিন কাজ নয়।’ ইউজিসিকে আরও শক্তিশালী করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় করেছি সেগুলোর যেন ভালোভাবে নজরদারি করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে এটাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি এবং নেব।’ ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস করে দেওয়ায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ‘জবাবদিহিতা’ নিশ্চিত হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অতীতে এটা ছিল না। যে যার মতো একখানা বিশ্ববিদ্যালয় করত। এক বিল্ডিংয়েই দেখা যায় তিনটা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার কাছে অবাক লাগত সে সময়।’ শিক্ষার সম্প্রসারণে সরকারের পদক্ষেপ উল্লেখ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের কাছ থেকেও এ সম্পর্কিত মতামত প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, ‘চিন্তা করে দেখেন শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য এবং শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার জন্য আমাদের আর কী কী প্রয়োজন। যা প্রয়োজন, আমরা তাই করব এবং সেটাই আমাদের নীতি।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় জাতির পিতার বক্তৃতার চুম্বক অংশ শিক্ষকদের উদ্দেশে তুলে ধরেন। জাতির পিতা বলেছেন, ‘আগামী প্রজন্মের ভাগ্য শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে। ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার ব্যত্যয় ঘটলে কষ্টার্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হবে।’ ‘কাজেই শিক্ষকদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে জাতির পিতার এই কথাটা সব সময় আপনারা মনে রাখবেন’ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ‘আজকালকার শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি মেধাবী’ এমন অভিমত ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, তাদেরকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। কারণ বাংলাদেশকে আমরা যেভাবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছি তার যেন বাস্তবায়ন করে যেতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনটা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আমরা করেছি এবং প্রত্যেকটা বিভাগে একটি করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হবে। যেখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেখানে কয়েকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করেছি এবং বিজ্ঞান শিক্ষাকে শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য ’৯৬ সালেই ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আইন পাস করে যাই। সরকার গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘গবেষণা ছাড়া কখনো উৎকর্ষ লাভ করা যায় না। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হলে গবেষণার বিকল্প নেই।’ প্রধানমন্ত্রী এ সময় স্বর্ণপদক বিজয়ী শিক্ষার্থীদের সোনার ছেলেমেয়ে আখ্যায়িত করে আগামীতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলায় নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলে দেশ গড়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্যও সবার প্রতি আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত