কোল ছিটকে আগুনে পড়ে বাচ্চার মৃত্যু

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৩:১০ এএম

‘রুশদি নানুর বাসায় থাকে। সেদিন যখন ওকে নিয়ে আসব দেখি ও বই পড়ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী পড়ছ বাবা? নটু পানতু (মটু-পাতলু)? তারপর আমাকে গল্প শুনিয়েছে  এনে ওই নটু এলিয়েন আছে! দেখছাও (দেখেছ)। নটু-পানতু কালার করছে আমি মুছেছি তো। পরদিন আমি খুশি হয়ে আসার সময় বইটা নিয়ে আসতে চাইলাম, কিন্তু সে আনবে না। ওর একটাই কথা, নানু বাসায় পড়বে তো।’ একমাত্র সন্তান চার বছরের একেএম রুশদির বই পড়ার আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়ে ফেইসবুকে এমন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে মগবাজারের দিলু রোডের ৪৫/এ বাড়িটির নিচতলায় আগুন লাগার পর তিন তলার বাসা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টাকালে মায়ের কোল থেকে আগুনে পড়ে যায় রুশদি। এ পরিস্থিতিতে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে শ্বাসনালিসহ ৯৫ শতাংশ পুড়েছে মা জান্নাতের। একই সময় ছেলে ও স্ত্রীকে বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে বাবা শহিদুল কিরমানি রনিরও শ্বাসনালিসহ শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়েছে। দুজনেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর পর মা-বাবাও এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে তাদের।

জান্নাত দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার প্রোডাকশন ম্যানেজার একেএম শহীদুল্লার পুত্রবধূ এবং ভিআইভিপি এসেট ম্যানেজমেন্টের হিসাব ব্যবস্থাপক ও ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রভাষক শহিদুল কিরমানি রনির স্ত্রী। জান্নাত-রনি দম্পতির একমাত্র ছেলে রুশদি। জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মায় যোগ দেওয়ার আগে কাজ করতেন সিমেন্ট কোম্পানি হোলসিমে। বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানান, আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে রুশদি। তাকে চেনার কোনো উপায় নেই। এ বছরই রুশদিকে একটি স্কুলের প্লে-গ্রুপে ভর্তি করা হয়েছিল। সর্বনাশা আগুন তাকে বাঁচতে দেয়নি।

জান্নাতের চাচাতো বোন উমরুল ফুরাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সকালে খবর শুনেই কলাবাগানের বাসা থেকে হাসপাতালে এসেছি। যতদূর শুনেছি, ভোরে দিলু রোডে ওই বাসার গ্যারেজে থাকা গাড়িতে আগুন লাগার পর টায়ার বিস্ফোরণের বিকট শব্দে দুজনের ঘুম ভাঙে। গ্যারেজে গাড়ি ছিল ৫টি। আগুন লেগেছে বুঝতে পেরে মা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে তৃতীয় তলার বাসা থেকে বের হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে রনিও ছিল। সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামার সময় আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। তখনই কোল থেকে পড়ে যায় রুশদি। সিঁড়িতে পড়ে গড়িয়ে নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছিল রুশদি। তাকে বাঁচাতে তখন স্বামী-স্ত্রী দুজনে সিঁড়িতেই আগুনে ঝাঁপ দেয়। আগুনের কালো ধোঁয়ায় তারা জ্ঞান হারায়। পরে জ্ঞান ফিরে আসার পর শরীরে আগুন নিয়েই বাইরে বের হয়। আর নিচে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় রুশদি।’

জান্নাতের চাচাতো ভাই আবু জায়েদ ইবনে হক বলেন, ‘তৃতীয় তলায় তারা দুটি রুম নিয়ে থাকত। আগুন লাগার পর অন্য ভাড়াটিয়ারা সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে উঠতে থাকে। তবে রুশদির মা-বাবা ঘুমের ঘোরে তাৎক্ষণিক বুঝতে না পেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামার চেষ্টা করে। ভেবেছিল নিচের গেট দিয়েই বেরিয়ে যেতে পারবে। তারা যদি বেডরুমেই থাকত, তাহলেও হয়তো কোনো ক্ষতি হতো না। আগুনে শুধু তাদের বাসার ড্রয়িং রুম পুড়ছে। দুটি বেডরুম অক্ষত আছে। তারা কেন এমনটি করল সেটা বলার মতো কেউ নেই।’

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শহিদুল কিরমানি রনির শরীরের ৪৩ শতাংশ এবং জান্নাতুলের শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শ্বাসনালিও পুড়ে গেছে। দুজনই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই অবস্থা থেকে রিকভারি করার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবুও আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাব। তাদের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত