শিশুসহ ৩ লাশ নিয়ে ভোর নামল দিলু রোডে

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৩:১৩ এএম

রাজধানীর দিলু রোডের একটি আবাসিক ভবনে আগুন লেগে এক শিশু ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় দগ্ধ ও ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও ছয়জন। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে দিলু রোডের পাঁচতলা ওই ভবনের গ্যারেজ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আধঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভোরের ওই অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির গ্যারেজে রাখা পাঁচটি গাড়ি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা।

আগুনে নিহতরা হলো আবদুল কাদের লিটন (৪০), আফরিন জাহান যুথী (১৮) ও একেএম রুশদী (৪)। এদের মধ্যে যুথী ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। কাদের ভবনটির দ্বিতীয় তলায় থাকা ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বায়িং হাউজের অফিস সহকারী এবং রুশদী ওই বাড়ির বাসিন্দা আইসিএমএ’র প্রভাষক শহিদুল কিরমান রনি (৪০) ও বেক্সিমকো ফার্মার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত (৩৮) দম্পতির ছেলে। এই দম্পতিও আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তাদেীপ  দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক।

এই আগুনের ঘটনায় ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩০) এবং ছেলে মাহাদি হাসান রিফাত (৯) ও মাহমুদুল হাসান (৯ মাস)।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা ভোর সাড়ে ৪টায় ৪৫/এ দিলু রোডের ওই ভবনে আগুন লাগার খবর পান। পরে তাদের ১২টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভোর সাড়ে ৫টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে জানা গেছে। আগুন লাগার প্রকৃত কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবুল হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আগুন লাগা বাড়িটির নিরাপত্তা কর্মী লুৎফর রহমান বলেন, তিন বছর থেকে ওই ভবনে চাকরি করেন তিনি। পাঁচতলা বাড়িটি এলাকায় গ্রিন হাউজ নামে পরিচিত। বাড়ির প্রতিটি তলার মালিক আলাদা। সেগুলো আগেই ফ্ল্যাট হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল।

লুৎফর রহমানের ভাষ্য, ভোর ৪টার দিকে তিনি নিচতলায় তার কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। ভবনের নিচতলায় গ্যারেজের পশ্চিম অংশে বৈদ্যুতিক মিটার বক্সে প্রথম আগুন লাগে। তার পোড়ার ‘ফটফট শব্দে’ ঘুম ভাঙার পর তিনি ভবনের মূল বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ করতে যাওয়ার চেষ্টা করে দেখেন, সেখান থেকে আগুন পাশে রাখা একটি গাড়িতে ছড়িয়ে পড়েছে। আগুনের তাপে সেদিকে যেতে না পেরে তিনি তার নাতিকে নিয়ে ভবনটি থেকে বেরিয়ে আসেন।

লুৎফর বলেন, ‘আর একটু দেরি হলেই আমি আমার নাতিসহ পুড়ে মারা যেতাম। বাড়ির নিচতলায় আমরা তিনজনই থাকতাম। এর মধ্যে নিহত কাদের দোতলার বায়িং হাউজে অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করত।’

ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে দেরি করায় আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে বলেও জানান লুৎফর। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দিলু রোডের ওই গলিটির প্রবেশমুখে ইউনাইটেড ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন লেখা একটি ফটক ছিল। যে কারণে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি সেখানে ঢোকানো যায়নি। দূর থেকে পাইপ টেনে আগুন নেভাতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছাতে দেরি করেছে এমন অভিযোগ সঠিক নয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এনায়েত বলেন, ভবনের বাসিন্দারা যারা মারা গেছে তারা সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করার সময় আগুনে পুড়ে মারা যায়। কেউ কেউ লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে। একজন নারী ভবনের দোতলা থেকে তার শিশুসন্তান নিয়ে পাশের টিনের চালে লাফ দিয়ে পড়ে।

আগুনে নিহত রুশদীর দাদা এবং গুরুতর দগ্ধ রনির বাবা দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রডাকশন ম্যানেজার একেএম শহিদুল্লাহ জানান, তাদের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। রনি ভিআইপি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থাপক ও আইসিএমএ’র প্রভাষক ছিলেন। তার স্ত্রী জান্নাত বেক্সিমকোতে চাকরি করতেন। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে ছিল রুশদী। সে একটি স্কুলের প্লে গ্রুপের শিক্ষার্থী।

নিহত কাদেরের শ্যালক মো. জহির আলম জানান, কাদেরের বাড়ি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার পশ্চিম নন্দনপুর গ্রামে। তার বাবা প্রয়াত মো. উল্লাহ। তার দুই সন্তান। তিনি দিলু রোডের ওই বাসার নিচতলায় গ্যারেজের পাশে একটি কক্ষে থাকতেন। ওই ভবনের দোতলায় ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি বায়িং হাউজের অফিস সহকারী হিসেবে প্রায় ১০ বছর ধরে চাকরি করছেন। আগুনে কক্ষ প্রচণ্ড ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা যান তিনি। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার লাশ উদ্ধার করেন।

নিহত আফরিন জান্নাত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। তার বাবা জাহাঙ্গীর আলম (৪২) পূর্ত ভবনের প্রশাসনিক শাখায় চাকরি করেন। তার মা লাল বানু (৩৫) গৃহিণী। তারা ওই ভবনের ছাদের একটি কক্ষে থাকেন।

আফরিনের চাচা মো. সুরুজ্জামান বলেন, আগুন লাগার খবরে আতঙ্কিত হয়ে আফরিন সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামে। আর ওপর থেকে তার বাবা ও ভাই গ্রিল বেয়ে নিচে নামে। তারা দুজনেই সামান্য আহত হয়। আফরিনের মা লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয়। তার পা ও কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সুরুজ্জামান আরও জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার সূর্যদী গ্রামে। দুই ভাইবোনের মধ্যে আফরিন ছিল ছোট। আফরিনের ভাই টাঙ্গাইল মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

আগুনে দগ্ধদের ব্যাপারে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘শহিদুল কিরমানির শরীরের ৪৩ শতাংশ এবং জান্নাতুলের শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শ্বাসনালিও পুড়ে গেছে। দুজনের অবস্থাই গুরুতর। এই অবস্থা থেকে রিকভারি করার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবুও আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।’

প্রতিষ্ঠানটির এক চিকিৎসক বলেন, ‘জান্নাতুলের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তাকে মৃত ঘোষণা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।’ 

হাতিরঝিল থানার এসআই খন্দকার সেলিম শাহরিয়ার জীবন স্টালিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মৃত তিনজনের মধ্যে শিশুসহ দুজন পুরোপুরি পুড়ে গেছে, যা দেখে শনাক্ত করার মতো নয়। তাই পোড়া দুজনেরই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহের জন্য ফরেনসিক বিভাগকে বলা হয়েছে। আর আবদুল কাদের পোড়েননি। সম্ভবত তিনি ধোঁয়ার কারণে মারা গেছেন।’ এ ঘটনায় তার থানায় একটি মামলা হয়েছে বলেও জানান এসআই সেলিম শাহরিয়ার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত