আগামী মার্চ মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সরকারি ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়েকটি সংগঠন। এমন সিদ্ধান্তের জন্য তারা সরকারের সমালোচনা করেন এবং এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পৃথক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) ও তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি যুক্তিহীন : ওয়ার্কার্স পার্টি
বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্র্তৃক বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণাকে যুক্তিহীন ও একপেশে অভিহিত করে বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। বিবৃতিতে দলের সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, বিভিন্ন গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে বিদ্যুতের মূল্য কমানোর পক্ষে যেসব যুক্তি ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়, তা খণ্ডন করতে পারেনি সরকার। তারপরও ভোক্তাদের সব যুক্তি অগ্রাহ্য করে তারা গ্রাহক পর্যায়ে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। বিদ্যুতের আরেক দফা মূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর যেমন আর্থিক চাপ তৈরি হবে, তেমনি উৎপাদিত পণ্যের মূল্যও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে জনজীবনের সংকট বৃদ্ধি করবে। একই বিবৃতিতে ওয়ার্কার্স পার্টি ঢাকায় ওয়াসার ২৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ২৫ শতাংশ পানির মূল্য বৃদ্ধিরও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
জনগণের পকেট কাটতেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি : এলডিপি
জনগণের পকেট কাটতেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ২০-দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) একাংশ। বিবৃতিতে দলের সভাপতি আবদুল করিম আব্বাসী ও মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই বর্তমান লুটেরা সরকার জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করতে চায় না। জনগণের ওপর প্রতিশোধ নিতেই তারা দফায় দফায় বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করছে। সরকারের উন্নয়ন বুলির আড়ালে লুটপাটের মহোৎসবের কাহিনি এখন জনগণের মুখে মুখে। বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি সরকারের লুটপাটেরই অংশ মাত্র।’
তারা বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্বল্প আয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা দুর্বিষহ অবস্থায় পড়বে। কলকারখানা ও কৃষিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে। সরকারের প্রতিটি নীতি হচ্ছে হরিলুটের নীতি। জনগণ মরে যাকতাতে সরকারের কিছুই আসে যায় না।’ তারা বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয়, কমাতে হবে : জাতীয় কমিটি
বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয় বরং কমাতে হবে এবং কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। বিবৃতিতে কমিটির আহ্বায়ক শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানোর পর আবারও সরকারের নির্দেশে বিইআরসি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যে যুক্তি দেখিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ অসত্য। এটি গণশুনানিতে প্রদত্ত তথ্য, যুক্তি ও ফলাফলেরও পরিপন্থী।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর যুক্তিতে বলা হচ্ছে, দেশে গ্যাস সংকটের কারণে তেলনির্ভরতার ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, সে জন্য দাম বাড়াতে হয়েছে। এই বক্তব্য পুরোপুরি অসত্য। কারণ প্রথমত, গ্যাস সংকটের জন্য নয় বরং কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ না করে, বেশি ব্যয়বহুল বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের গ্যাস সরবরাহের কারণে এবং অযৌক্তিকভাবে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল ব্যবসায়ীদের ভর্তুকি দেওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘জাতীয় সক্ষমতা বিপর্যস্ত করে সরকার একদিকে সাগরের গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করছে, অন্যদিকে গ্যাস সংকটের অজুহাতে সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প, ভয়ংকর ঝুঁকি ও বিপুল ঋণের রূপপুর প্রকল্পের উদ্যোগ নিচ্ছে। সরকার তার মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতকে ক্রমাগত কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর ডাকাতি ব্যবসার খাতে পরিণত করছে। তাদের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েই বারবার বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম।’
বিইআরসির সমালোচনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, জনসাধারণের অর্থের অপচয় করে নাটক করার জন্য বানানো হয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। সেখানে গণশুনানিতে যুক্তি তথ্যে প্রমাণিত হয়েছে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয় বরং কমানো উচিত এবং তা সম্ভব। কিন্তু সরকারের আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, দাম বাড়াতেই হবে। বারবার গ্যাস-বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য বোঝা হচ্ছে, সব পর্যায়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিল করে জাতীয় কমিটি প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত বিন্যাসের দাবি জানায় সংগঠনটি।
