‘ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না’ বলে অভিযোগ রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মাসের পর মাস কাজ আটকে রাখা ও বন্ধুদের নিয়ে ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে সব কাজ ভাগবাটোয়ারা করে তিনি বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল রবিবার প্রকৌশলী হাবিবকে প্রধান কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।
দুদক পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. জাহিদ কালাম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘অভিযোগ জমা পড়লে তো দুদক অনুসন্ধান করতেই পারে। কমিশন যা জানতে চেয়েছে আমি জবাব দিয়েছি।’
দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেট ওসমানী ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাঁচ প্রকল্পের নথি আগেই তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ প্রকল্পগুলোয় জড়িত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানসহ ৯ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নথি তলব করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগের বরাত দিয়ে তারা আরও জানান, আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তে বেবিচকের কাছে ১৯৯৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রকৌশলী হাবিবের বেতন-ভাতা, অগ্রিম/ঋণ (কর্তনসহ) খাতভিত্তিক তথ্য চাওয়া হয়েছে। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ঠিকাদার নিয়োগসহ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে পাওয়া নথি থেকে জানা গেছে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় প্রকৌশলী হাবিবের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনটিও দুদকে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়, ‘তিনি একজন ঠিকাদারের আমন্ত্রণে নেপাল, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন। নেপাল ভ্রমণের জন্য কোনো আমন্ত্রণপত্র না থাকার পরও বেবিচক তাকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়। এছাড়া কক্সবাজার বিমানবন্দর প্রকল্পের ক্রয় প্রস্তাব নিষ্পত্তির জটিলতা সৃষ্টি এবং তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। চিঠিতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কেন তাকে বিদেশ ভ্রমণে অনুমতি দেওয়া হয়েছে বেবিচকের কাছে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি পিডির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। এ ছাড়া বেবিচক কর্র্তৃপক্ষ অসদাচরণ ও দায়িত্ব পালনে অবহেলাসহ নানা অনিয়মের কারণে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে লঘু দণ্ড (তিরস্কার) দেয়।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ মতে, শাহজালাল বিমানবন্দরের রাডার মেরামত, ক্যালিব্রেশন, এক্সপ্লোসিভ ডিটেনশন সিস্টেম স্থাপন, টার্মিনালে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজ, বোর্ডিং ব্রিজের স্পেয়ার পার্টস ক্রয় এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এর সঙ্গে প্রকৌশলী হাবিব সম্পৃক্ত ছিলেন। দুদক এরই মধ্যে এসব কাজের নথি, স্টক রেজিস্টার, বণ্টন রেজিস্টার, ঠিকাদারদের নাম, টেন্ডার ডকুমেন্ট, কাজের মূল্যায়নপত্র, ব্যয় মঞ্জুরি, বিল প্রদানসহ কাগজপত্রের সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করেছে।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, বেবিচকের আওতায় বিভিন্ন বিমানবন্দরে বড় বড় প্রকল্পের কাজ বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুমোদন সাপেক্ষে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হয়। এসব কাজেও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এছাড়া ওসমানী বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও এর পিডি হাবীবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।
দুদকের নথি থেকে জানা গেছে, প্রকৌশলী হাবীব কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন কাজের পিডি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দরপত্রে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। পরে তাকে পিডি পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। হাবিবুর রহমান নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকা সার্কেল-১ এর দায়িত্বে থাকাকালে অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও খামখেয়ালীর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে বেবিচকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব না দিতে বলা হয়।
দুদকের এক উপপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেবিচক সদরদপ্তর ভবন নির্মাণ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা ছিলেন প্রকৌশলী হাবীব। এ কাজেও তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এত বলা হয়েছে, এ কাজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে তিনি অহেতুক বিলম্ব করেছেন। ঠিকাদারের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দেনদরবারের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পরই তিনি সিদ্ধান্ত দিতেন। তার দুর্নীতির কারণে পাঁচ বছরের বেশি সময়েও বেবিচকের সদরদপ্তর ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ভবনের ফার্নিচারসহ ডেকোরেশনের কাজও বিলম্বিত হয়। তিনি ফাইল আটকে রেখে ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেন বলেন অভিযোগ মিলেছে। প্রকৌশলী হাবিব বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তাকে হাত করে গুরুত্বপূর্ণ ৭টি বিমানবন্দরে উন্নয়ন কাজের দায়িত্ব পেয়েছেন জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের মেগা প্রকল্প খান জাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দর উন্নয়ন, ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ ও নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ, চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ এবং শাহ আমানত বিমানবন্দরের প্যারালাল টেক্সিওয়ে, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান টার্মিনালের সম্প্রসারণ নবরূপায়ণ, কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণ। দুদক এসব কাজের নথিও তলব করেছে।
দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারের সঙ্গে বিলের পারসেন্টেজ নিয়ে ‘বনিবনা’ না হওয়ায় কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ কাজের বিল আটকে রাখেন হাবিবুর রহমান। দুর্নীতির বিভিন্নে অভিযোগ ওঠার একপর্যায়ে তাকে পিডি পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পরে রহস্যজনকভাবে একই প্রকল্পে আবারও তাকে সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (এসিই) নিয়োগ দিয়েছে বেবিচক কর্র্তৃপক্ষ। এ কাজে ফের ঘুষ লেনদেন হয়েছে কি না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছন সংশ্লিষ্টরা।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণকাজের ৮টি দরপত্র পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পের এখন পর্যন্ত সম্পন্ন কাজের নথিপত্রের ফটোকপি চাওয়া হয়েছে। প্রকৌশলী হাবিব ৬টি বিমানবন্দরের মেগা প্রকল্পের পাশাপাশি ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের পিডি হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু ‘তিনি সাইটে না গিয়ে ঢাকাতেই থাকেন। ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের মনিটরিং কর্র্তৃপক্ষ বুয়েটের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বুয়েটকে পাশ কাটিয়ে তিনি সব কাজ নিজেই করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে বেবিচক কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে অবিলম্বে হাবিবুর রহমানকে প্রকল্পের পিডি পদ থেকে প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে বুয়েট।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, প্রকৌশলী হাবিব ও তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ নির্ধারিত ছকে চাওয়া হবে। পাশাপাশি তার অর্থপাচার ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ রয়েছে কি না, সেটাও অনুসন্ধান করা হবে।
