দিল্লির সহিংসতা ভারতের করোনাভাইরাস

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২০, ১১:৫৭ পিএম

আজ এমন জায়গায় আমরা একত্রিত হয়েছি, যেখান থেকে অল্প সময়ের দূরত্বে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে চার দিন আগে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্যে উন্মত্ত হয়ে পুলিশের সক্রিয় সহযোগিতা ও  সমর্থনে, ইলেক্ট্রনিক সংবাদমাধ্যমে সার্বক্ষণিক সমর্থনের নিশ্চয়তা পেয়ে এবং আদালতের থেকে কোনো বাধা আসবে না এমন বিশ্বাস থেকে উত্তর-পূর্ব দিল্লির কর্মজীবী মানুষের এলাকাগুলোতে মুসলিমদের ওপর সশস্ত্র ও প্রাণঘাতী হামলা চালায় একদল ফ্যাসিবাদী জনতা।  মার্কেট, দোকান, ঘরবাড়ি, মসজিদ, গাড়ি সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রাস্তাগুলো পাথর আর ধ্বংসাবশেষে পূর্ণ। মর্গগুলো মৃতদেহে ভর্তি। যেখানে মুসলিম ও হিন্দু দুই সম্প্রদায়ের মানুষই আছে, একজন পুলিশকর্মী এবং গোয়েন্দা সংস্থার তরুণ কর্মীও রয়েছেন। হ্যাঁ, এমন ভয়াবহ বর্বরতার মধ্যেও অবিশ্বাস্য সাহস এবং সমবেদনা দেখাতে সক্ষম হয়েছে দুই পক্ষের মানুষই। তবে এটা কোনোভাবে অস্বীকার করা যাবে না যে, এই হামলা করেছে ‘জয় শ্রীরাম’ সেøাগান দেওয়া লুম্পেন জনতা, যাদের সমর্থন দিচ্ছে এই মুহূর্তের নগ্ন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র। এই স্লোগানের কারণে ঘটনাটিকে হিন্দু-মুসলিমের ‘দাঙ্গা’ বলে মানুষ চিহ্নিত করতে চায় না। এটি ফ্যাসিবাদ এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যকার চলমান যুদ্ধের বহিঃপ্রকাশ।  যেখানে ফ্যাসিবাদীদের প্রথম শত্রুই হচ্ছে মুসলিমরা। এই ঘটনাকে যদি রায়ট বা দাঙ্গা, ডানপন্থি বনাম বামপন্থি, এমনকি সত্য বনাম মিথ্যা হিসেবে দেখা হয়, যা অনেকে করছেন, সেটি বিপজ্জনক এবং বিভ্রান্তিকর।

আমরা সবাই ভিডিওগুলো দেখেছি, যেখানে পুলিশ ঠায় দাঁড়িয়েছিল এবং কখনো অগ্নিসংযোগেও অংশ নিয়েছে তারা। সিসিটিভি ভাঙতে তাদের দেখেছি আমরা, জামিয়া মিলিয়ার লাইব্রেরি ভাঙচুরের সময় যেমনটা তারা করেছিল। আমরা দেখেছি আহত মুসলিমদের পেটাচ্ছে পুলিশ, তাদের জাতীয় সংগীত গাইতে বাধ্য করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে একজন মারা গেছে। নিহত সব ব্যক্তি, আহত, বিধ্বস্ত যেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দুরাও আছে, তারা সবাই নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন এই শাসনের শিকার। আমাদের নগ্ন ফ্যাসিবাদী প্রধানমন্ত্রী যিনি নিজেও ১৮ বছর আগে একটি রাজ্যে গণহত্যা চালিয়েছিলেন।  কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এর চেয়ে অনেক বড় আকারের হত্যাযজ্ঞটির সময় রাজ্যের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। সামনের দিনগুলোতে সুনির্দিষ্ট এইসব হত্যাযজ্ঞের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকে দেওয়া ঘৃণাত্মক গুজবের যে ঢেউ উঠেছে তা বাইরের দিকে ছড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছে। আমরা ইতিমধ্যে বাতাসে আরও রক্তের গন্ধ পেতে শুরু করেছি।

মাত্র কয়েকদিন আগে, বিজেপির প্রাক্তন বিধায়ক প্রার্থী কপিল মিশ্রের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দিল্লি হাইকোর্টের বিচারক মুরালিধরন দিল্লি পুলিশের ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। আর ২৬ ফেব্রুয়ারির মাঝরাতে এই বিচারপতিকে মধ্যরাতের আদেশে পাঞ্জাব হাইকোর্টে বদলি করা হয়। বিচারকদের সঙ্গে মশকারার এই খেলা নতুন নয়। আমরা হয়তো বাবু বজরঙ্গীর গল্পটি ভুলে গেছি, ২০০২ সালে গুজরাটের নরোদা পাতিয়ায় ৯৯ জন মুসলমানকে হত্যা করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল তাকে। ইউটিউবে তার বক্তব্য শুনুন: সে আপনাকে বলে দেবে কীভাবে ‘নরেন্দ্র ভাই’ তাকে জেল থেকে বের করে এনেছেন বিচারকদের ‘হাত’ করে। নির্বাচনগুলোর আগে এই জাতীয় হত্যাযজ্ঞের সম্মুখীন হতে আমরা শিখে গেছি।  ভোটকে মেরুকরণ করতে এবং নিজেদের মতো নির্বাচনী ক্ষেত্র গড়ে তুলতে এমন হত্যাযজ্ঞকে এক ধরনের বর্বরোচিত নির্বাচনী প্রচারণায় পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু দিল্লি নির্বাচনে বিজেপি-আরএসএসের এক অপমানজনক পরাজয়ের কয়েকদিন পরেই এই হত্যাযজ্ঞ হলো। এটি দিল্লির জন্য শাস্তি এবং বিহারে আসন্ন নির্বাচনের জন্য সংকেত। সব কিছু প্রকাশ্যেই ঘটছে। কপিল মিশ্র, পারভেশ ভার্মা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এদের সবার উসকানিমূলক বক্তব্য সহজেই সবাই সব কিছু দেখছে এবং শুনছে। সব কিছু এখন সহজলভ্য। অমুসলিম সংখ্যালঘুদের দ্রুত নাগরিকত্ব পাইয়ে দিতে নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) সম্পূর্ণরূপে অসাংবিধানিক এবং স্পষ্টতই মুসলিমবিরোধী। জাতীয় আদমশুমারি (এনপিআর) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)-সহ এটি শুধু মুসলিমদেরই অবৈধ ঘোষিত, অস্থিতিশীল এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে না, লাখ লাখ ভারতীয়দের ক্ষেত্রেও তা-ই করে, যাদের হাতে দরকারি কাগজ নেই-আজ যারা ‘গোলি মারো সালো কো’ স্লোগান দিচ্ছে তারাসহ।  যেখানে নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, সেখানে আপনার শিশুর অধিকার, আপনার ভোটাধিকার, আপনার জমি অধিকার সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ।  হান্না আরেন্ডট যেমন বলেছেন, ‘নাগরিকত্ব আপনাকে অধিকার পাওয়ার অধিকার দেয়।’ বিষয়টি এরকম নয় যারা ভাবছেন, তারা অনুগ্রহ করে একটু আসামের দিকে তাকান। দেখুন সেখানে কী হয়েছে বিশ লাখ মানুষের সঙ্গে হিন্দু, মুসলমান, দলিত আর আদিবাসীদের সঙ্গে। মেঘালয় রাজ্যে এখন স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে অ-আদিবাসী মানুষের মধ্যে অশান্তি শুরু হয়েছে। শিলংয়ে এখনো কারফিউ চলছে।

এনপিআর-এনআরসি-সিএএ’র একমাত্র উদ্দেশ্য, কেবল ভারতেরই নয় গোটা উপমহাদেশের মানুষকে অস্থিতিশীল করা এবং বিভক্ত করা।  সত্যিই যদি এসব লাখ লাখ মানুষের অস্তিত্ব থেকে থাকে, ভারতের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যাদের ‘বাংলাদেশি উইপোকা’ বলে থাকেন, তাদের ডিটেনশন সেন্টারে রাখা যাবে না এবং তাদের নির্বাসিতও করা যাবে না। এ জাতীয় পরিভাষা ব্যবহার করে এবং একটি হাস্যকর এবং শয়তানি পরিকল্পনা হাতে নিয়ে এই সরকার আসলে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে বসবাসকারী লাখ লাখ হিন্দুকে বিপদগ্রস্ত করছে। যারা (সরকার) তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার ভান করে, যদিও নয়াদিল্লি থেকে উৎসারিত এই ধর্মান্ধতার যন্ত্রণা পোহাতে হবে এইসব মানুষকেই। এই দেশ গড়ে তোলার সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের কাছেই আমরা আমাদের নাগরিক অধিকার পাওয়ার জন্য আর্জি জানাতে বিনীত হয়ে পড়ছি। আমরা যখন তাদের কাছে বিনীত হয়ে পড়ছি, ঠিক তখনই আমরা দেখছি রাষ্ট্র তার নিরাপত্তা সরিয়ে নিচ্ছে, পুলিশকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা হচ্ছে, বিচার বিভাগ ক্রমান্বয়ে তাদের দায়িত্ব থেকে সরে যাচ্ছে, যেই মিডিয়ার কথা ছিল আরামে থাকা মানুষদের অস্বস্তিতে ফেলবে এবং পীড়িত মানুষকে স্বস্তি দেবে, আমরা দেখছি তারা ঠিক উল্টোটা করছে। জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিকভাবে বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নেওয়ার পর আজকের ২১০তম দিন। তিন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীসহ হাজার হাজার কাশ্মীরি কারাগারে রয়েছেন। সাত মিলিয়ন মানুষ ভার্চুয়াল তথ্য অবরোধের অধীনে বাস করছে, এটি মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘনের একটি অভিনব অনুশীলন। যে গণতন্ত্র একটি সংবিধান অনুসারে চলে না এবং যার প্রতিষ্ঠানগুলো সব ফাঁপা করে দেওয়া হয়েছে তা কেবল একটি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাষ্ট্রই হতে পারে। আপনি সংবিধানের সঙ্গে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে একমত বা দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।  তবে সরকার এমন সব কাজ করছে, যা গণতন্ত্রকে পুরোপুরি নগ্ন করে ফেলছে। সম্ভবত এটিই তাদের উদ্দেশ্য। এটি করোনাভাইরাসের ভারতীয় সংস্করণ। আমরা অসুস্থ।

(দিল্লির যন্তর মন্তরে দেওয়া ভাষণের সংক্ষিপ্তসার)

লেখক : বুকারজয়ী ভারতীয় ঔপন্যাসিক

দ্য স্ক্রল থেকে ভাষান্তর : রাফসান গালিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত