খাগড়াছড়িতে বিজিবির সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে নিহত ৫

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২০, ০৩:০৫ এএম

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে নিহতদের মধ্যে এক বিজিবি সদস্য ও চার গ্রামবাসী রয়েছে। এছাড়া গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও এক গ্রামবাসী।

গ্রামবাসীর ভাষ্য, ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি জমির গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে বাগ্বিতণ্ডার জেরে বিজিবি সদস্যরা সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালালে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। তবে বিজিবির দাবি, কাঠ পাচাররোধে টহলরত বিজিবি দলের সঙ্গে গ্রামবাসীর উত্তেজনাকর পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তখন দুপক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির সময় বেসামরিক লোকজন বিজিবির অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গুলিবর্ষণ করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।সংঘর্ষে নিহতরা হলেন বিজিবির সিপাহি মো. শাওন (৩০), আলুটিলা  বটতলী গ্রামের সাহাব মিয়া ওরফে মুসা (৭০), তার ছেলে আহম্মদ আলী এবং একই এলাকার মো.আলী আকবর ও মফিজ মিয়া।

এলাকাবাসী জানায়, গাজীনগর এলাকার বাসিন্দা নিহত আহম্মদ আলী গতকাল রাস্তার পাশে ফেলে রাখা আগে কেটে রাখা গাছের টুকরো চেরাই করার উদ্দেশ্যে ট্রাক্টরে করে পার্শ্ববর্তী স’মিলে নিচ্ছিলেন। এ সময় বিজিবির পার্শ্ববর্তী চেকপোস্টের টহলরত সদস্যরা তাকে আটকে দেয়। এ নিয়ে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে আহম্মদ ও তার বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের বাদানুবাদ শুরু হয়। এ সময় আশপাশের লোকজনও এগিয়ে আসে। একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালান। তখন বিজিবি ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।

নিহত সাহাব মিয়ার মেয়ে নিলুফা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাশ দিয়ে বিদ্যুতের সরবরাহ লাইন যাওয়ার কারণে তারা বেশ কিছুদিন আগে একটি গাছ কেটে রাখেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে ওই গাছের টুকরোগুলো স্থানীয় গাজীনগর বাজার স’মিলে নেওয়ার সময় বিজিবি সদস্যরা বাধা দেন। এ সময় তার বাবা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে বিজিবি সদস্যদের তর্ক শুরু হয়। তর্কাতর্কির একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে।

মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আলাউদ্দিন লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্যুতের সরবরাহ লাইন নেওয়ার জন্য বিজিবির নির্দেশে কিছুদিন আগে নিজ মালিকানাধীন গাছ কাটেন সাহাব মিয়া। গতকাল দুপুরে কেটে ফেলা ওই গাছের টুকরোগুলো সাহাব মিয়া ও তার ছেলে আহম্মদ আলী মিলে স’মিলে নেওয়ার সময় বিজিবির সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়। এ সময় গ্রামবাসী এগিয়ে এলে বিজিবির সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হলে ঘটনাস্থলে তিনজন নিহত হয়। এ সময় আমি ঘটনাস্থলে যেতে চাইলেও বিজিবির বাধায় যেতে পারিনি।’

তিনি আরও জানান, সংঘর্ষের পর আহত পাঁচ গ্রামবাসীকে মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে মফিজ মিয়া ও হানিফকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পথে মফিজ মারা যান।

গতকাল সন্ধ্যায় মাটিরাঙ্গা থানার ওসি শামছুদ্দিন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহত বিজিবি সদস্যসহ দুজনের মরদেহ হাসপাতালে রয়েছে। অন্য দুজনের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।’

সংঘর্ষের পর জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস এবং পুলিশ সুপার পুলিশ সুপার মো. আবদুল আজিজ মাটিরাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। যার নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তদন্ত কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। সেখানে জেলা প্রশাসক সংঘর্ষের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস দেন গ্রামবাসীদের। এছাড়া নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদানের ঘোষণা দেন।

সংঘর্ষের পর বেলা ৩টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহরিয়ার জামান, মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিভীষণ কান্তি দাশ, মাটিরাঙ্গা পৌরসভার মেয়র ও মাটিরাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম হুমায়ুন মোরশেদ খান। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নতুন করে যেকোনো ধরনের সহিংসতা এড়াতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

সংঘর্ষের সূত্রপাত নিয়ে বিজিবির বক্তব্য : গতকাল রাতে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল দুপুরে মাটিরাঙ্গা উপজেলার গাজীনগর বাজার থেকে ১০০ গজ দক্ষিণে বিজিবির একটি টহল দল অবস্থান করছিল। তারা অবৈধ কাঠ পাচাররোধে ব্যবস্থা নিলে বেসামরিক স্থানীয় লোকজন টহল দলটিকে ঘিরে ধরে। তখন বিজিবির টহল দল ও বেসামরিক জনগণের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ওই অবস্থায় বিজিবি সদস্যরা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। ধাক্কাধাক্কির রেশ ধরে একপর্যায়ে বেসামরিক লোকজন বিজিবির অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গুলিবর্ষণ করে।

ওই ঘটনায় বিজিবির সিপাহি শাওন ও পাঁচজন বেসামরিক জনগণের গায়ে গুলি লাগে। এতে বিজিবি সদস্য শাওন ও বেসামরিক চারজন মারা যায়। ঘটনার পর বিজিবির গুইমারা সেক্টর কমান্ডার, সেনাবাহিনীর গুইমারা রিজিয়ন কমান্ডার, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। আলোচ্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা পৃথকভাবে ঘটনা তদন্তের কার্যক্রম শুরু করেছেন। সামগ্রিক ঘটনাটি তদন্ত শেষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত