মরমি সাধকদের বাণী চেতনায় দাগ কাটে না, বিশেষ করে রাজনৈতিক স্বার্থবাদীদের। তাদের বিচক্ষণ বাণী বা ভবিষ্যদ্বাণীতে বাস্তবের প্রতিফলনও ঘটে না। ‘হনুজ দিল্লি দূর অস্ত’ এখন গল্প কথায় পর্যবসিত। দিল্লিতে রক্তের হোলি খেলা ক্ষমতাসীন রাজনীতির পক্ষে সহজ হয়ে দাঁড়ায়। হত্যাকাণ্ডের তুলনায় অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ যেন বড় বেশি ভয়াবহ চিত্ররূপ ধারণ করে। ঘটনার পর পোস্টমর্টেম, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অনেক সহজ কাজ। তাতে যুক্তিবাদী মন, সেক্যুলার চেতনা সাময়িক সান্ত¡না পায়, কিন্তু নিরীহ মৃতেরা কি তাতে ফিরে আসবে? এ অপরাধের দায় কে নেবে? অবশ্যই দায় একদিকে নির্দেশদাতা বা ব্যবস্থাপক নেপথ্য কুশীলবদের, অন্যদিকে প্রত্যক্ষ দায় তথা অপরাধ উন্মত্ত ক্যাডার বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট পথভ্রষ্ট জনতার। সবকিছু মিলিয়ে দায় দূষিত ও সম্প্রদায়বাদী রাজনীতির।
এখন পরিপ্রেক্ষিতে দিনকয়েকের একপেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত দিল্লির অমানবিক ঘটনা অনেক দিন পরের হলেও নতুন কিছু নয়, বহু-সংঘটিত পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ক্ষমতা যখন পাঁকে পড়ে বা সাময়িক গাড্ডায় পড়ে, তখন তার রাজনৈতিক কৌশল, অন্তত ভারতীয় উপমহাদেশে তো বটেই, যা এখন ত্রিধাবিভক্ত রাজনীতির সাধ পূর্ণ করতে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যেমন অবসান ঘটেনি, তেমনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জঘন্য পুনরাবৃত্তিও বন্ধ হয়নি, এই ধারায় ঘটনার সংখ্যা কমেছে, এই যা। তাই দিল্লি ঘটনার সহিংসতা ওই পাঁকে-পড়া ঘটনারই পরিণাম, প্রতিশোধস্পৃহারও প্রকাশ বলা চলে। বেশ কিছুদিন ধরে সিএএ নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ তারুণ্যের, সেই সঙ্গে অন্যদের সমর্থন, বিক্ষুব্ধ ভারত, তখন একটা পাল্টা ব্যবস্থা তো নিতেই হয় পূর্ব-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। যেকোনো ঘরানার ক্ষমতাসীনের পক্ষে কাজটা খুব সহজ, অতীত উদাহরণ অনেক।
বিদেশি শাসনামলে এর চরিত্রটি ছিল ভিন্ন ধরনের, অর্থাৎ দ্বিমাত্রিক, উভয় পক্ষের সমান উদ্যমে মানবতাবিরোধী অপকর্মে লড়ে যাওয়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রে যুক্তিহীন ধর্মীয় উপলক্ষ নিয়ে, কখনো সামাজিক কারণে আর বিদেশি শাসক মনের খুশিতে ওই রক্তাক্ত উন্মাদনার পরিণাম লক্ষ করেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কড়া হাতে তা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়নি। যেমন ১৯৪৬-এর আগস্টের ভয়াবহ, কলকাতা দাঙ্গা মূল বিদেশি শাসক তা উপভোগ করেছে আর স্থানীয় প্রাদেশিক শাসকের মদদ তাতে ছিল না, সে অভিযোগ অস্বীকার করা কঠিনই হবে। সে দায় অংশত হলেও বঙ্গীয় মুখ্যমন্ত্রীর। আর যে দৃশ্যটি বরাবরের তা হলো পুলিশি উদাসীনতা, এমনকি শ্রেতাঙ্গ স্থানীয় পুলিশের নীরব দর্শকের ভূমিকা যেন বর্তমান ঘটনার প্রতিচ্ছবি। বিদেশি শাসনমুক্ত স্বশাসনে, কী ভারতে, কী পাকিস্তানে ঘটনার একই চরিত্রের প্রকাশ। প্রথমত, ক্ষমতাসীন রাজনীতির দায়-দায়িত্বে ঘটনার সূত্রপাত। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব দর্শকের ভূমিকা এবং তা ভয়াবহ সহিংসতার দৃশ্যপটে। কাজেই কাটাকুটি বা অগ্নিকাণ্ড একতরফা চরিত্রেরই হয়েছে কী ভারতে, কী পাকিস্তানে।
দুই. দুর্ভাগ্য অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে খণ্ডিত সেই ভূ-ভারতের যে রাজনীতির অসুস্থ চরিত্রে বা দূষণের যে চরিত্র বৈশিষ্ট্য, তা যেমন প্রাক-বিভাগ পর্বে, তেমনি বিভাগোত্তরকালেও একই রকম রয়ে গেছে, রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা যেন তার নিয়তি, ভবিতব্য। বিভাগপূর্ব পর্বে যা ছিল দ্বিমাত্রিক, বিভাগোত্তরকালে তা একমাত্রিক, অর্থাৎ একপেশে, সংখ্যাগরিষ্ঠের একচেটিয়া আক্রমণ সংখ্যালঘুর ওপর খণ্ডিত উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংসতার এমনি ধারার চরিত্র বদল। উপমহাদেশে সেক্যুলার চেতনার, যুক্তিবাদী ধ্যানধারণার বা মানবতাবাদী চরিত্রের মানুষের জন্য মর্মবেদনার কারণ এর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, এর রাজনৈতিক চরিত্র দূষণ ও স্বার্থপর নীতিভ্রষ্টতা, যে জন্য পরিপূর্ণ সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থধারা স্থায়ী হলো না; অনাচারে, দুর্নীতিতে এর পালাবদল এবং সম্প্রদায়বাদের দিকে, মাঝেমধ্যে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় এর প্রকাশ।
অখণ্ড ভারতে তৃতীয় শক্তি অর্থাৎ বিদেশি শাসক ছিল ওই বিষবৃক্ষের শিকড়ে জল ঢালতে সদা প্রস্তুত। সেই যে ১৯৩৫-এ তাদের প্রবর্তিত কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড (সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ), ১৯৪০-এর জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বে উদ্দীপ্ত মুসলিম লীগ, ১৯৪৬-এ নেহরুর আলটপকা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় জিন্নাহর যুক্তিহীন প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা এবং কলকাতায় মহাহত্যাযজ্ঞ সমঝোতার বিভাজন সত্ত্বেও মনে হয় সেই ভ্রান্তির উত্তরাধিকার আমরা বহন করে চলেছি। যুক্তিবাদী, সদভাবনা আমাদের প্রাণিত করে না, দূষিত ও স্বার্থপর অসুস্থ রাজনীতিই আমাদের অন্বিষ্ট ও চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান তো চরম বিভ্রান্তি ও সাম্প্রদায়িকতা এবং বহুমাত্রিক সহিংসতার আগুনে জ¦লছে। ভারতকে বলা হতো দক্ষিণ এশিয়ায় বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ। সে দেশ দুর্নীতি ও অপশাসনের প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছুকাল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসনের কবলে পড়ে সাংবিধানিক সেক্যুলারিজম এবং গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিতে সচেষ্ট। এর সামাজিক কারণ যেমন বিবেচনার, তেমনি বিবেচ্য এর সম্প্রদায়বাদী রাজনীতি, যা তুলনামূলক বিচারে অধিক সক্রিয়, অধিকতর শক্তিমান। কংগ্রেসের স্ববিরোধী শাসনের দুর্বলতায় এবং জনহিতৈষী নীতির অভাবে, দুর্নীতির প্রতিক্রিয়ায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপির উত্থান এবং ক্রমান্বয়ে শক্তিসঞ্চয় ও দিল্লির মসনদ দখল। বিস্ময়কর যে, এদের সাম্প্রদায়িক আদর্শের নীতি গণতন্ত্রী ভারতীয় মানসে বিরূপতার সৃষ্টি করেনি, বরং পূর্বোক্ত অপশাসনের প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় গণতন্ত্র ভোটের মাধ্যমে সম্প্রদায়বাদী তন্ত্রকেই শাসনের উপযোগী বলে বেছে নিয়েছে। একবার নয়, একাধিকবার, যৌথ শাসন থেকে একক শাসনে দু-দুবার।
তিন. আমার প্রশ্ন গণতন্ত্রী ভারতকে নিয়ে, তার সেক্যুলার সংবিধানকে নিয়ে, এমনকি তার এককালীন উচ্চ আদালতি বিচারব্যবস্থা নিয়ে, যেসব স্থানে নীতি ও আদর্শের প্রতিফলন এখন ব্যাহত। সাংবিধানিক আদর্শের প্রতি বিস্ময়কর উদাসীনতা। সেক্যুলারিজম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই অর্থাৎ নির্বাচনী পদ্ধতিতে বিসর্জিত। স্বভাবতই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির (বিজেপি ও অনুরূপ সংস্থাগুলোর) শাসনব্যবস্থা প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সেক্যুলারিস্ট নীতি ও শাসনকে হটাতে পেরেছে। আজকের দিল্লি-দাঙ্গার উৎসও তো সম্প্রদায়বাদী আইনি প্রচেষ্টার বিরোধী প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ সরকারি মদদে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, যে আগুনে দিল্লি পুড়ছে, পুড়ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জান-মাল, ঘরবাড়ি এবং সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদ।
অবশ্য এর বিরুদ্ধে শুভবুদ্ধির বা প্রতিবাদের কমতি নেই। কিন্তু সঠিক নীতি তো হলো চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থার গুরুত্ব। তাহলে অনেক অবাঞ্ছিত অঘটন রোখা যায়, অনেক মৃত্যু ঠেকানো যায়। আজ যখন লেখক-তথ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার লিখছেন : ‘হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ জরুরি’ তখন তার এবং অনুরূপ আরও অনেকের যুক্তিবাদী বক্তব্যের প্রতি অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি বলতে ইচ্ছা করে, ভারতীয় সেক্যুলারবাদী গণতন্ত্র ঈশানকোণে কালো মেঘ দেখার পরও প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথা ভাবেনি কেন বা এখনো সহিংসতার উৎসরোধে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের শক্তিমান প্রকাশ ঘটাচ্ছে না কেন? সহিংসতার সূচনালগ্ন থেকেই দেখছি বিশিষ্টজনের বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ বা সমালোচনা বা সুপরামর্শ। অবশ্য অভ্যন্তরীণ ঘটনা আমার জানা নেই। সংবাদে দেখছি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তোলায় ঐতিহ্যমাফিক পশ্চিমবঙ্গ তো অগ্রচারীর ভূমিকা পালন করতে পারে, যে ক্ষেত্রে তারা বিধানসভায় সিএএবিরোধী বিলও পাস করেছে। এ ক্ষেত্রে সমমনা রাজ্যগুলো এগিয়ে আসতে পারে। তবে এটাও মর্মান্তিক সত্য যে, পশ্চিমবঙ্গ নিজেই তো মানবিক আদর্শের দিক থেকে বহুধা বিভক্তিতে আত্মঘাতী।
দিল্লি-দাঙ্গা নিয়ে নানামাত্রিক এত কথা বলা অতীত ও বর্তমান নিয়ে এজন্য যে, গণতন্ত্রী ভারতে হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশঙ্কার অনেক কারণ রয়েছে। পাকিস্তান তো এদিক থেকে বাতিলের খাতায়। ভারতের অতীত রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক সুশাসন কি এতটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল যে, জনগণ সেক্যুলার গণতন্ত্রের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল? অবশ্য ঘটনা এমনই ঘটেছে, সে ইতিহাসও দীর্ঘ। তবে আমার বড় দুঃখ যে, সুবিচারের জন্য মানুষের সর্বশেষ আশ্রয় সর্বোচ্চ আদালত সেখানেও ইদানীং যুক্তিবাদী ন্যায়নীতির প্রকাশ ক্ষেত্রবিশেষে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্তত একটি উদাহরণ অযোধ্যায় বিতর্কিত বাবরি মসজিদ প্রাঙ্গণে রামমন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় যে বিষয় নিয়ে অনেক যুক্তিতর্ক উত্থাপন করা যেতে পারে অন্যত্র এ বিষয়ে লেখা প্রকাশও হয়েছে। এ আলোচনার সর্বশেষ কথা, ভারতীয় গণতন্ত্রের মৃত্যু রুখতে এবং হিন্দুত্ববাদের প্রতিষ্ঠা বন্ধ করতে গণতন্ত্রী-সমাজতন্ত্রী-মানবতাবাদী সব ধারার সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। বলাবাহুল্য তা শক্তিমান হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে অধিকতর শক্তি কেন্দ্রীভূত করে। অন্যথায় গণতন্ত্রের সামনে সমূহ বিপদ। সময়ে সতর্ক না হলে সে বিপদ কাটানো অসম্ভবও হয়ে উঠতে পারে।
লেখক
ভাষা সংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও
রবীন্দ্র গবেষক
