দুর্নীতির তিন মামলায় জামিন পাওয়ার পরদিনই পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএমএ আউয়াল সংবাদ সম্মেলন করলেন বর্তমান সংসদ সদস্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি মন্ত্রী রেজাউলের বিরুদ্ধে তার জামিন নামঞ্জুর করাতে বিচারককে প্রভাবিত করাসহ নানা অভিযোগ তোলেন। মন্ত্রী রেজাউল তার বিরুদ্ধে আউয়ালের তোলা সব অভিযোগই বানোয়াট বলে দাবি করেছেন। আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় গত মঙ্গলবার জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেওয়ার পর ‘সৃষ্ট অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে’ তিন ঘণ্টার
মাথাই জেলা ও দায়রা জজ মো. আবদুল মান্নানকে বদলি করা হয়। পরে তাদের আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকেল ৪টার দিকে বিচারক বন্ডের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে তাদের দুই মাসের জামিন দেন।
২০০৮ ও ২০১৪ সালে পরপর দুবার পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-নেছারাবাদ) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হন আউয়াল। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার দুদকের মামলায় আমার জামিন নামঞ্জুর করতে বিচারক মো. আবদুল মান্নানকে প্রভাবিত করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, রেজাউল তার প্রভাব খাটিয়ে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে নতুন ও জামায়াত-বিএনপিতে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন স্থানে মন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেছেন। মন্ত্রী তার ভাইদের অনৈতিকভাবে কয়েকশ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে দিয়েছেন। সাবেক সাংসদ আরও বলেন, ‘মন্ত্রীর ভাই শাহীন ও শামীম আলোচিত জি কে শামীমের কাছ থেকে তিনটি গাড়ি উপঢৌকন হিসেবে নিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দিয়েছেন।’ শ ম রেজাউল করিম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন কি না সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী রেজাউল ১৯৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন। সেই হিসাবে ১৯৭১ সালে তার বয়স ১০ বছর। একজন বাচ্চা কীভাবে সে সময় মুক্তিযুদ্ধে যায়? মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এহেন মিথ্যাচার ও নিজেকে স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা দাবি করা সঠিক নয়। এজন্য তার জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত।’ আউয়াল তার লিখিত বক্তব্যে আরও অভিযোগ করেন, মন্ত্রী শ ম রেজাউল বিভিন্ন সময় নিজেকে খুলনা বিএল কলেজের ভিপি দাবি করেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্য ও বানোয়াট। এসব অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি, তার ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট বলেছেন।
গত বছর ৩০ ডিসেম্বর দুদকের বরিশাল সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আলী আকবর বাদী হয়ে আউয়ালের বিরুদ্ধে খাসজমিতে ভবন নির্মাণ, অর্পিত সম্পত্তি ও পুকুর দখলের অভিযোগে তিনটি মামলা করেন। এক মামলায় আউয়ালের সঙ্গে তার স্ত্রী পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী লায়লাকেও আসামি করা হয়। গত ৭ জানুয়ারি আউয়াল ও লায়লা হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের অন্তর্বর্তী জামিন নেন। গত মঙ্গলবার ওই জামিনের মেয়াদ শেষ হলে তারা পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বিচারক মো. আবদুল মান্নান জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ আদেশের পর আউয়াল ও লায়লার আইনজীবী আদালতে তাদের অসুস্থতার চিকিৎসা প্রতিবেদনসহ হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা ও ডিভিশন দেওয়ার আবেদন করেন। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে বিচারক ডিভিশনসহ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এরপর বেলা সোয়া ৩টার দিকে জেলা ও দায়রা জজ মো. আবদুল মান্নানকে বদলি করা হয়। পরে বিকেলে যুগ্ম জেলা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন জেলা ও দায়রা জজ। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে আউয়াল ও লায়লা পারভীনের আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিকেল ৪টার দিকে বিচারক বন্ডের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা করে নিয়ে তাদের দুই মাসের জামিন দেন।
আউয়ালকে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কারাগারে পাঠানোর ওই আদেশের পরপরই আদালতপাড়াসহ পুরো শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে পিরোজপুর শহরসহ জেলার নাজিরপুর, মঠবাড়িয়ায় সব দোকান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা জেলা শহরের বিভিন্ন সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগ করায় বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা বর্তমান এমপি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের নামে লেখা ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেন। জেলা জজ মো. আবদুল মান্নানের অপসারণ দাবি করে অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালত বর্জনের ঘোষণা দেয় পিরোজপুর আইনজীবী সমিতি। উত্তেজিত নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ আদালতপাড়াসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে সকাল থেকেই আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে রেখেছিলেন পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা। গতকাল বুধবার শহরে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
