খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষে এক বিজিবি সদস্যসহ পাঁচজন নিহতের পর এখনো সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে, মোতায়েন রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। ওই সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসন। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এ কমিটিকে।
এদিকে গতকাল বুধবার সকালে নিহত চার গ্রামবাসীর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় বটতলী মাঠে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
নিহতদের জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নেয়। এ সময় মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিভীষন কান্তি দাশ, মাটিরাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল আলম, পৌর মেয়র মো. শামছুল হক ও মাটিরাঙ্গার থানার ওসি মো. শামছুদ্দিন ভূঁইয়া বক্তব্য রাখেন। জানাজায় নিহত সাহাব মিয়ার ছোট ভাই আবু বকর সিদ্দিক তার ভাই ‘হত্যার’ সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
নিহত চার গ্রামবাসীর মধ্যে সাহাব মিয়া (মুছা) এবং তার দুই ছেলে আহম্মদ আলী ও আলী আকবরকে স্থানীয় ইসলামপুর কবরস্থানে আর মফিজ মিয়াকে বটশলী কবরস্থানে দাফন করা হয়। অন্যদিকে একই ঘটনায় নিহত বিজিবি সদস্য মো. শাওনকে গতকাল বরগুনার বেতাগীর হোসনাবাদী ইউনিয়নের দক্ষিণ বাস-া গ্রামে তার নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যের কমিটি : মাটিরাঙ্গায় বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষের কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক প্রতাপ কুমার বিশ্বাস। এ কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মোহাম্মদ রেজাউল করিম। কমিটির অন্য দুই সদস্য জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাহউদ্দিন এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা তার প্রতিনিধি। এ কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান খন্দকার মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সহকর্মীদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলব। কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আমি আশাবাদী।’
এদিকে বিজিবি-গ্রামবাসী সংঘর্ষের ঘটনায় তার থানায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন মাটিরাঙ্গা থানার ওসি মো. শামছুদ্দিন ভূঁইয়া।
বিজিবি সদস্য শাওনকে বরগুনায় গ্রামের বাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন : খাগড়াছড়িতে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত বিজিবি সৈনিক মো. শাওনকে (৩০) তার গ্রামের বাড়ি বরগুনার বেতাগীর হোসনাবাদী ইউনিয়নের দক্ষিণ বাস-া গ্রামে দাফন করা হয়েছে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনা থেকে আসা বিজিবির ২১ ব্যাটালিয়নের সদস্যদের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে গত মঙ্গলবার খাগড়াছড়িতে প্রথম জানাজা শেষে গতকাল ভোর সাড়ে ৬টায় শাওনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আনা হয়। জানাজায় বেতাগী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদুর রহমান ফোরকান এবং পৌর মেয়র এবিএম গোলাম কবিরসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
নিহত মো. শাওন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক নুরুল ইসলাম ও গৃহবধূ নাসরিন বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। দুই বছর আগে পারিবারিকভাবে শাওনের বিয়ে হয় বাকেরগঞ্জের নিয়ামতি ইউনিয়নের মারিয়া আক্তারের সঙ্গে। কদিন পরই ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু তার আগেই ফিরেছেন লাশ হয়ে।
গত মঙ্গলবার দুপুরে মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীনগরে বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ হয়। এতে এক বিজিবি সদস্য ও চার গ্রামবাসী নিহত হন। গ্রামবাসীর ভাষ্য, ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি জমির গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে বাগ্বিতণ্ডতার জেরে বিজিবি সদস্যরা সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর গুলি চালালে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। তবে বিজিবির দাবি, কাঠ পাচাররোধে টহলরত বিজিবি দলের সঙ্গে গ্রামবাসীর উত্তেজনাকর পরিস্থিতির একপর্যায়ে বিজিবি সদস্যরা এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। তখন দুপক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কির সময় বেসামরিক লোকজন বিজিবির অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে গুলিবর্ষণ করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
