মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ ১৯৩৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম কাজী আব্দুল হামিদ এবং মায়ের নাম রজ্জব বানু। ১৯৫৩ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৫৫ সালে কমিশন লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি ‘বীরউত্তম’ খেতাবে ভূষিত হন। একাত্তরের রণাঙ্গনে গঠিত তিনটি ব্রিগেডের একটির প্রধান ছিলেন সফিউল্লাহ। তার নামের আদ্যক্ষরেই ওই ব্রিগেডের নামকরণ করা হয় ‘এস ফোর্স’। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কে এম সফিউল্লাহ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-১৯৭১ এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সাতই মার্চের প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন কে এম সফিউল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের আহমেদ মুনীরুদ্দিন
দেশ রূপান্তর : আপনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেনানায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতিতে শুরু হয়েছিল একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে বাঙালির স্বাধীনতার এই যাত্রাপথকে কীভাবে স্মরণ করেন?
কে এম সফিউল্লাহ : বাঙালি সবসময়ই স্বাধীনতাপ্রিয়। ব্রিটিশ শাসিত ভারতেও স্বাধীনতাকামী বললে বাঙালির কথাই বলতে হয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করেই ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এই বাংলাতে প্রথম ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করে। তারপর ধীরে ধীরে পুরো ভারতের শাসন ক্ষমতা করায়ত্ত করে ব্রিটিশরা। কিন্তু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রাম বাঙালিরাই শুরু করেছিল। সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সূচনা এই বাংলাতেই হয়েছিল। পরে সিপাহি বিদ্রোহ হয়। সিপাহি বিদ্রোহ করে কারা? বাঙালি সৈন্যরাই সেখানে এগিয়ে গিয়েছিল। আমাদের ঢাকা শহরেও বিদ্রোহী সৈন্যদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। সদরঘাটে বাহাদুর শাহ পার্কে সিপাহিদের ফাঁসিতে ঝোলানের তিনটি স্তম্ভ এখনো সংরক্ষিত আছে। এভাবে বহু আগে থেকেই বাঙালি স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়ে আসছে।
দেশ রূপান্তর : আপনার ছেলেবেলায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের কথা মনে আছে কি? ছেলেবেলায় কি কখনো ভেবেছিলেন যে আপনি এভাবে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে জড়িয়ে যাবেন?
কে এম সফিউল্লাহ : ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের শেষদিকে যখন ভারত-বিভক্তির প্রশ্নে গণভোট হলো আমি তখন স্কুলের ছাত্র। তখন দেখেছি কীভাবে মানুষ ব্রিটিশদের খেদানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। স্কুলছাত্র হিসেবে সে আন্দোলনে বড়দের সঙ্গে আমরা কিশোর-তরুণরাও ছিলাম। অবশ্য সে সময় ভারতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। আমার মনে আছে, ১৯৪৬ সালে দাঙ্গা থামানোর জন্য মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে এসেছিলেন। আমার বাবা আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী আমাকে দেখে আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন তুমি অনেক বড় হবে। কৈশোরের এসব ঘটনা আমার মনে দাগ কেটেছিল। পরে বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম। এরপর যখন আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই, তখন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমার সেনাবাহিনীতে যোগদানের বিষয়ে আপত্তিও তুলেছিল ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে। এরপর সেনাবাহিনীতে কমিশনড হই। কিন্তু সবসময় এটা টের পেতাম যে, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কখনোই আমাদের বাঙালি অফিসারদের ভালো চোখে দেখত না। সবকিছুতেই বাঙালিদের হেয় করার একটা বিষয় ওদের মধ্যে ছিল। এটা আমাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত এবং আমরা একটা ফাইটিং স্পিরিট নিয়ে সবসময় ওদের সঙ্গে এক ধরনের কম্পিটিশনে থাকতাম।
দেশ রূপান্তর : ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মদানের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায় বাঙালির জাতীয় জীবনে যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে তার পথ ধরে স্বাধিকারের আন্দোলন বেগবান হলো। ছেষট্টির ছয় দফা, আটষট্টির আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনে স্বাধীনতার আন্দোলন বেগবান হয়ে উঠল। সামরিক বাহিনীর বাঙালি কর্মকর্তা হিসেবে এসব ঘটনা আপনাদের আন্দোলিত করেছিল কি?
কে এম সফিউল্লাহ : রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাপ তো ছিলই। সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বাংলাদেশের মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম অবহেলা সাধারণ মানুষের মতো আমাদেরও খুবই আন্দোলিত করেছিল। এর পরপরই হলো সত্তরের নির্বাচন। আমাদের ব্যাটালিয়ন তখন জয়দেবপুরে। আমাদের দায়িত্ব ছিল, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলসহ ওই এলাকার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করা। সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছি সাধারণ মানুষ কী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করেছে। নির্বাচনের ফল দেখে আমরাও আশা করেছিলাম এবার বঙ্গবন্ধুকে প্রধানমন্ত্রী করা হবে, বাঙালির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু পাকিস্তানিরা সেই পথে গেল না। এটা আমাকে ভীষণ পীড়িত করেছিল। জনগণ নিজেদের রায় দিয়েছে, জানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানিদের তারা চায় না। তারপরও কেন পাকিস্তানিরা মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাবে। তখন আমাদের মধ্যে লড়াইয়ের চিন্তা চলে আসে।
দেশ রূপান্তর : একাত্তরের মার্চ মাসকে আমরা অগ্নিঝরা মার্চ, প্রতিরোধের মার্চ হিসেবে জানি। আপনি তো তখন জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন কমান্ড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ এবং মার্চের ঘটনাপ্রবাহকে তখন কীভাবে দেখেছেন? ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে শুনতে চাই।
কে এম সফিউল্লাহ : বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের এমন আন্দোলিত করেছিল যে, মনে হচ্ছিল এবার আর কেউই আমাদের ফেরাতে পারবে না। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের মধ্যেই একটা সম্মোহন ছিল। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চে যেভাবে উচ্চারণ করলেন যে, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রামৃতোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধুর সেই কণ্ঠ মনে পড়লে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
৭ই মার্চের পর আমরা যেমন কিছু একটা করার জন্য তড়পাচ্ছিলাম, তেমনি পাকিস্তানিরাও বুঝে গিয়েছিল যে, বাঙালি সৈন্যরা যেকোনো মুহূর্তে বিদ্রোহ করে বসতে পারে। সেজন্য তারা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টসহ সবখানে বাঙালিদের নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা করতে থাকে। আমাদের কাছে নিয়মিত অস্ত্র ও গোলাবারুদের পাশাপাশি কিছু স্পেয়ার আর্মস ছিল। যেগুলো আনসার বাহিনীসহ অন্য মিলিশিয়াদের ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা ব্যবহার করতাম। কিন্তু ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার থেকে তখন ওই স্পেয়ার আর্মস ফেরত দেওয়ার জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হচ্ছিল। আমরা নানা ছুতোয় দিচ্ছি, দেব করে কালক্ষেপণ করছিলাম।
এর মধ্যেই আমি একদিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আসি। আমার ফ্যামিলি তখন সেখানেই থাকত। আমি ফ্যামিলিকে বললাম, থিংস আর নট গোয়িং রাইট। তোমরা গ্রামের বাড়িতে চলে যাও। সে সময় খালেদ মোশাররফ ছিলেন এই ব্রিগেডের মেজর। আমার আসার খবর পেয়ে সে কোথা থেকে এসে আমাকে বললযা দেখতেছি, তাতে মনে হচ্ছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোকে নিরস্ত্র করা হবে। তাই যদি হয়, তাহলে তুমি কী করবা? আমি তাকে বললামখালেদ চাকরি তোমারও কম হয়নি আমারও কম হয়নি। ট্রেনিং তুমিও নিয়েছ আমিও নিয়েছি। অস্ত্রের ট্রেনিং নিয়েছি অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য, কারও হাতে অস্ত্র ফেরত দেওয়ার জন্য নয়। খালেদ বললআমি তোমার কাছে এটাই আশা করেছিলাম, শুধু নিজে কথা বলে নিশ্চিত হতে চাইছিলাম। উই উইল ফাইট। এরপরই খালেদকে কুমিল্লায় ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়।
১৯ মার্চ আমার ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেব আরবাব ঢাকা থেকে রওনা দেন আমাদের নিরস্ত্র করার জন্য। কিন্তু টঙ্গী পার হতে না হতেই সেখানে রাস্তায় ব্যারিকেডের মধ্যে পড়েন তিনি। এটা ছিল রাজনৈতিক কর্মী ও শ্রমিক জনতার প্রতিরোধ। বাঙালি সৈনিকদের ওপর জনগণের আস্থা ছিল। ভাগ্যক্রমে দিনটা ছিল শুক্রবার। সেদিন ছিল জয়দেবপুরের হাটবার। হাটে হাজার হাজার মানুষ ছিল। প্রতিরোধের খবর পেয়ে শিমুলতলী মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্ল্যান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানার শ্রমিকরা যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসে। হাজার হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, দোনলা বন্দুকসহ জয়দেবপুরে উপস্থিত হয়। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের সিøপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি ফেলে এক বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও পাঁচটি ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। এদিকে কমান্ডার জাহানজেব উপস্থিত হয়ে আমাকে ব্যারিকেড সরানোর নির্দেশ দিলে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ি। বাঙালি সৈনিকদের সামনে রেখে পাঞ্জাবি সৈনিকদের পেছনে দাঁড় করিয়ে দেন তিনি। আমি তখন কৌশল হিসেবে আরেকদল বাঙালি সৈনিককে পাঞ্জাবি সৈনিকদের পেছনে দাঁড় করিয়ে দিই। আর সামনের বাঙালি সৈনিকদের বলে দিই, গুলিবর্ষণের প্রয়োজন হলে ওরা যেন জনতার মাথার ওপর আকাশে গুলি ছোড়ে। সেখানে একটা ত্রিশঙ্কু অবস্থার মধ্যে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ হয়। এরপরও বেশ কয়েকজন বাঙালি শহীদ হয় এবং বহু মানুষ আহত হয়। একপর্যায়ে কমান্ডার জাহানজেব ব্যারিকেড সরিয়ে ঢাকার পথে ফিরে যেতে সক্ষম হন। কিন্তু ওই প্রতিরোধ যুদ্ধ দেশের মানুষকে ভীষণ আলোড়িত করেছিল। ১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে সেøাগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’
এর পরপরই এলো ২৫ মার্চের কালরাত। পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা শুরু করল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। পুরোদস্তুর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুজিবনগর সরকার গঠন করা হলো। জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে ১৩টি সেক্টরে বিন্যস্ত হয়ে আমরা লড়াই করলাম। আমার নেতৃত্বে ‘এস ফোর্স’, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ‘কে ফোর্স’ ও জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হলো।
দেশ রূপান্তর : আমরা এখন যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের কথা শুনতে চাই। আপনি তখন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। আপনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান না করে আপনাকে সেনাপ্রধান করে বঙ্গবন্ধু ভুল করেছিলেন। এছাড়া আপনি সেনাপ্রধান থাকাকালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডকে নিজের ব্যর্থতা বলেও উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়গুলো একটু খুলে বলুন।
কে এম সফিউল্লাহ : মুক্তিযুদ্ধের সময়টাতে আমরা যুদ্ধই করেছিলাম। কিন্তু যুদ্ধের পর অনেকেরই উচ্চাভিলাষ দেখা গিয়েছে। আমি নিজে কিন্তু সেনাপ্রধান হতে চাইনি। জেনারেল ওসমানী এপ্রিলের শুরুতে আমাকে ডেকে বললেন, তুমি আর্মি টেক ওভার কর। আমি বললাম, আমার সিনিয়র আছে। আমার তিনজন সিনিয়রের নাম বললাম। কর্নেল রব, সি আর দত্ত ও জিয়াউর রহমান। আমি ও জিয়া একই ব্যাচের হলেও জিয়া আমার চেয়ে ১ নম্বরের সিনিয়র ছিলেন। জেনারেল ওসমানী আমার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে জানান যে, ‘হি ইজ নট উইলিং টু টেক ওভার।’ এরপর তিনি আমাকে বলেন, ‘লিডার ওয়ান্টস টু মিট ইউ’। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। সেদিন সেখানে তোফায়েল আহমেদ ছিলেন। তিনি বললেন, নক করে ওই ঘরে যান। আমি রুমে ঢুকতেই বঙ্গবন্ধু উঠে আসতে আসতে বললেন, ‘সফিউল্লাহ শুনলাম তুমি নাকি চিফ হইতে চাও না।’ আমি বললাম, ‘স্যার আমি তো এ কথা বলিনি। আমার চেয়ে আরও সিনিয়র আছে তারা আগে হোক। আমাকে আমার সময়মতো করেন।’ বঙ্গবন্ধু সামনে এসে আমার দুই কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তোমার ব্যাচের সবাই কিন্তু চিফ হবে না। যাও তুমি জেনারেল ওসমানীর কাছ থেকে টেক ওভার কর।’ আমি বললাম, ‘স্যার ফ্রম নাউ অ্যান্ড অনওয়ার্ডস আই উইল বি অ্যা ভিকটিম অব সারকামস্টেনসেস।’
আমার ধারণা, জিয়াউর রহমান কখনোই বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি। এটা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় এবং তার পর জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোশতাকের ভূমিকায় আমার আরও বেশি করে মনে হয়েছে। তবে আমার নিজের দুর্ভাগ্য আমি সেনাপ্রধান থাকা অবস্থায়ই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটে। কিন্তু মনে রাখা দরকার ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকাণ্ডের সময় তৎকালীন সেনা গোয়েন্দা বিভাগ সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণে নয়, সরাসরি রাষ্ট্রপতির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। আমি শেষ মুহূর্তে টেলিফোনে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু আমি টেলিফোনে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই বঙ্গবন্ধু নিহত হন। বঙ্গবন্ধুকে আমি রক্ষা করতে যেতে পারিনি। এই ব্যর্থতা নিয়েই আমি বেঁচে আছি। আমি বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে যেতে পারিনি, এটা আমার ব্যর্থতা। তবে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হলেও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। এই হত্যার পেছনে কারা জড়িত তা তদন্তের জন্য এখনো একটি কমিশন করা যেতে পারে।
(৪ মার্চ, ২০২০ গৃহীত দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের সংক্ষিপ্তসার)
