‘পুঁজিবাজার দেখার দায়িত্ব আমার না’ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘পুঁজিবাজার উঠবে নাকি নামবে, সেইটা দেখার দায়িত্ব আমার না। আমার কাজ হচ্ছে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।’
গতকাল রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন-২০২০’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি যদি দেশের অর্থনীতির প্রতিটি মৌলিক দিক শক্তিশালী করি, তাহলে পুঁজিবাজারেও ভালো প্রভাব পড়বে। আমার কাজ হচ্ছে, সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিটি গতিধারা শক্তিশালী রাখা। এসব করতে পারলে আমাদের সব অর্জন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি সবই আমরা করতে পারব।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আসবে প্রণোদনা নিয়ে। মুজিববর্ষে তাকে আমরা কীভাবে ধরে রাখব, সে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে, যেখানে কর্মসংস্থানে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান অনেক কম। কিন্তু অর্থনীতিতে তারা সবার ওপরে। তাদের অন্যান্য খাত আছে। আমরাও সেখানে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি মিটিংয়ে বলেন, চাকরির জন্য কষ্ট করতে হবে না। সবাই চাকরি পাবেন। চাকরির জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে; সেখানে দুই থেকে তিন কোটি মানুষের চাকরি হবে।
সঞ্চয় স্কিমগুলো সম্পর্কে মুস্তফা কামাল বলেন, সঞ্চয় সেবাগুলো বালিশের নিচে টাকা রাখার মতোই। এগুলোর কোনো বহুমুখী ব্যবহার নেই। এগুলো আমাদের মূল ধারার অর্থনীতিতেও আসে না। কীভাবে এগুলোকে নিয়ে আসা যায়, সে জন্য কাজ করছি। সেগুলোকে এনেছি সিস্টেম দিয়ে, আমরা তো গায়ের জোরে কিছু করতে চাইনি।
তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে আমরা ব্যাংকিং খাতে অটোমেশন করে ফেলেছি। এতে কারা সঞ্চয়পত্রের মালিক সেটা জানতে পারছি। কিছুদিনের মধ্যে ডাকঘর সঞ্চয়পত্রেরও অটোমেশন হয়ে যাবে। এটাতেও কেউ ঠকবেন না।’
উন্নয়নের জন্য সময় চেয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যেভাবে সংবিধান পেয়েছি, যেভাবে কর্মপরিকল্পনা পেয়েছি, যেভাবে অর্থনীতি পরিকল্পনা সাজাতে হয়; সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে সময় দিতে হবে। আমাকে সময় দেন, আপনারা ফলাফল পাবেন।’
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না; এমন সমালোচনার জবাব দিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘কিছু কিছু কথা উঠে আসে, যেমন দেশে তো উন্নয়ন হচ্ছে, মাথাপিছু জিডিপিও ভালো। গত পাঁচ বছরে ৪৫ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে এখানে তো জবলেস গ্রোথ বা কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। আপনারা অর্থনীতির ছাত্র, অর্থনীতির প্রবক্তা, নীতি প্রণয়নেও সাহায্য করেন; যদি কর্মসংস্থানই না হবে তাহলে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসবে? অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর কর্মসংস্থান হাত ধরে চলে।’ প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু উদ্যোক্তাদের কারণে হয়নি, এর পেছনে সরকারেরও অনেক সফলতা আছে। আমাদের সঞ্চয় জিডিপির ৩০ শতাংশ, ভারতে ২৮ শতাংশ। আমাদের অর্থনীতি শক্ত।
তিনি বলেন, ২০০৮ সালে আমাদের বাজেটের আকার ছিল ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর গত বাজেটের আকার হলো ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এটা এমনি এমনি হয়নি। এখানে সরকারের অবদান আছে। আমাদের তা মানতে হবে। গ্রামগুলো এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রামের ইউনিয়ন পর্যায়ে এখন বিউটি পারলার আছে, ব্যায়ামাগার আছে, পশুপাখি বিক্রির দোকান দেখেছি। সেখানে অর্থনীতি এখন অন্য পর্যায়ে। আমরা শুধু বলব এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে এমনটা নয়। এর সঙ্গে আমাদের বলতে হবে, আগে আমাদের কী কী হয়েছে। সরকারকে যতটুকু ক্রেডিট দেওয়া দরকার, আমি মনে করি তা আমাদের দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। আমরা সেই চ্যালেঞ্জগুলো খুঁজে বের করে সমাধান করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কম। আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া দক্ষ লোকের অভাবও রয়েছে আমাদের। এসব উত্তরণে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।’ করোনাভাইরাস বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা মোকাবিলা করতে হবে।
সম্মেলনে অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবৃদ্ধি হলেই উন্নয়ন হচ্ছে তা ঠিক নয়, এ জন্য আরও কিছু সূচকের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। রেমিট্যান্স ওঠানামা করলেও সার্বিকভাবে ভালো। তবে রেমিট্যান্স কতটুকু টেকসই সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে। এ জন্য দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে হবে। বিদেশি কর্মকর্তাদের জায়গায় দেশি লোক নিয়োগ দিতে হবে।’
তিনি বলেন, রপ্তানি খাতে গত সাত মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণ করতে হবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গত প্রায় এক বছর যাবৎ স্থবির হয়ে আছে। খেলাপি ঋণ যেভাবেই হোক কমাতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারিক ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ ও খরচ বাড়ছে বলে মনে করেন ব্র্যাকের চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, কৃষি যে একটা নতুন প্রবৃদ্ধির চালক হতে পারে, সেই আলোচনা কোথায়? শুধু আলোচনা করলে হবে না, সেই অনুযায়ী নীতি সহায়তা ও বিনিয়োগ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা একটা অদক্ষ ব্যয়ের সিনডমের মধ্যে আটকে আছি। ব্যয় বাড়ছে, বাজেট বাড়ছে কিন্তু দক্ষতার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এর প্রভাব পড়ছে দৈনন্দিন জীবনে। প্রকল্পের ছড়াছড়ি হচ্ছে কিন্তু প্রকল্পের সক্ষমতা সামনে নিয়ে আসাটা জরুরি।
সিটি ব্যাংক ও বণিক বার্তার যৌথ আয়োজনে দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. রেহমান সোবহান, স্বাগত বক্তব্য দেন সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন।
