ছাত্রলীগে শিবির ছাত্রসেনা নিয়ে ২৭৮ জনের কমিটি

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২০, ০১:৪০ এএম

প্রায় ২১ বছর পর গঠিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের ২৭৮ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিশাল এই কমিটিতে স্থান পেয়েছেন সাবেক শিবির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ইয়াবা কারবারি, হত্যা ও নারী নির্যাতন মামলার আসামি, বিবাহিত, চাকরিজীবী, গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত বয়সের বেশি বয়সী ও কাপড়ের দোকানদারসহ বিতর্কিত অনেকেই। তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগ এই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে। তাদের দুজনের কেউই আগে কখনো ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বরং বোয়ালখালী শাখা ছাত্রসেনার অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমান সভাপতি এস এম বোরহান উদ্দিন।

গত বুধবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ওই তালিকায় থাকা বেশিরভাগই নানা অপরাধ ও ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রবিরোধী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নতুন এই কমিটির বেশ কিছু সম্পাদকীয় ও শীর্ষ পর্যায়ের পদধারীরা ইয়াবাসহ মাদকের কারবারে জড়িত বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে সংগঠনটিরই একাধিক কর্মী। পদ পাওয়াদের কেউ কেউ আগে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ছিল, কেউবা আবার বিভিন্ন নাশকতা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। রয়েছে হত্যা মামলার আসামিও।

এদিকে সদ্য গঠিত এই কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র ও দীর্ঘদিন থেকে অনুসরণীয় রীতির ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। কারণ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের সদস্যদের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৯ বছর। আর সচরাচর যে কোনো জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয় ১০১ সদস্যের। কিন্তু দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের অনুমোদিত কমিটির সদস্য সংখ্যা ২৭৮। কমিটিতে সহসভাপতি পদে ৯ জন রাখার নিয়ম থাকলেও ঘোষিত কমিটিতে রাখা হয়েছে ৬০ জনেরও বেশি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ৫ জন রাখার নিয়ম

থাকলেও রাখা হয়েছে ১১ জনকে। আর সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ৫ জন রাখার নিয়ম থাকলেও রাখা হয়েছে ১১ জনকে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদ্য অনুমোদিত কমিটিতে পদ পাওয়া সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমেদের সরকারি এপিএস। সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান জিহানের বয়স ত্রিশের বেশি এবং একটি গ্রুপ অব কোম্পানিতে দুই বছর ধরে চাকরি করছেন তিনি। সহ-সভাপতি জয়নুল আবেদিন ফরহাদ ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে কর্মরত। অছাত্র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মুসার বয়স ৩৫ এবং একসময় জুতার দোকানে চাকরি করতেন। সহ-সভাপতি মামুন নারী নির্যাতন মামলার আসামি। সহ-সভাপতি মো. খালেদ মাসুদের পরিবারের সবাই নিবন্ধন হারানো রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আর আরেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর রেজা ছাত্রসেনা করতেন।

অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদরুদ্দোজা জুয়েল জনি হত্যা মামলার আসামিদের সহযোগী এবং অন্য একটি মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক তুহিন বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবিরের নাশকতা মামলার আসামির ছেলে এবং একসময় শিবিরের রাজনীতি করতেন। যুগ্ম সম্পাদক আরেকুর রহমান ৩ মাস আগেও নারী কেলেঙ্কারির জন্য আনোয়ারা কলেজে হেনস্তা হয়েছেন। সাংগঠনিক সম্পাদক কলিমুল্লাহ নাশকতা মামলার আসামি এবং শিবির ক্যাডার। সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদ হোসাইন কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ছোট ভাই এবং স্থানীয় এমপি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করায় ২ বছর আগে বাঁশখালী থানা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক তসলিম উল্লাহ চৌধুরী শিবিরের সাথী ছিলেন। গ্রন্থনা ও প্রকাশনা উপ-সম্পাদক গাজী আমিনুর রশিদ ৩৮ বছর বয়সী ও বিবাহিত এবং চাঁদাবাজ হিসেবে এলাকায় পরিচিতি রয়েছে। সাংস্কৃতিক উপ-সম্পাদক মানিক অছাত্র এবং চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত এলাকায়।

সংগঠনের তৃণমূল কর্মীদের অভিযোগ, অপরাজনীতি আর টাকা খরচের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে প্রকৃত অনেক ছাত্রের নতুন কমিটিতে স্থান হয়নি। টাকা দিয়ে কমিটিতে অনেকে নেতা হয়েছেন। তাদের ভাষ্য, কমিটি গঠনে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হওয়া অনেকটা অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারও সঙ্গে চুক্তি করে টাকা নেওয়া হয়, টাকা দিলে পদ জোটে আর না দিলে জোটে না।

নতুন কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের ১নং সহ-সভাপতি মো. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কমিটিতে এমন অনেক নাম এসেছে যারা একসময় শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার ছিল। অনেকে বিবাহিত ও চাকরিজীবী। অনেকে আবার হত্যা মামলার আসামি, এমনকি অনেকে আবার এসএসসিও পাস করেনি। বিশাল অঙ্কের টাকার বাণিজ্যের মাধ্যমে এ ধরনের বিতর্কিতদের কমিটিতে ঠাঁই দিয়ে পুরো কমিটি বিতর্কিত করা হয়েছে।’

তিনি ঘোষিত কমিটিতে বেশ কয়েকজন বিতর্কিতের নাম উল্লেখ করেন। এদের মধ্যে সহ-সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বিবাহিত, সহ-সভাপতি সোহরাব হোসেন চৌধুরী শুভ তৌকির হত্যা মামলার আসামি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন কাফকোতে চাকরি করেন। উপ-সম্পাদক মোহাম্মদ এনাম বনফুলে চাকরি করেন (পটিয়া)। সহ-সভাপতি কে এম পারভেজ উদ্দীন একসময়ের শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার (জামায়াতের সাবেক এমপি সামশুল ইসলামের খালাতো ভাই)। সহ-সভাপতি মো. মিনহাজুল আবেদীন রেয়াজউদ্দীন বাজার তামাকুম-ী লাইনে ডিওর নামক কাপড়ের দোকানদার। উপ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এস এম সাইফুল্লাহ রাহাত ফোর এইচ গ্রুপের হিসাবরক্ষক। সহ-সম্পাদক মো. রায়হান রেলের খালাসি পদে কর্মরত (পোস্টিং পটিয়া)। সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়েছিল ১৯৯৮ সালের শেষের দিকে। এরপর তৎকালীন আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জনির মৃত্যুর প্রায় ৫ বছর পর ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর আংশিক কমিটির নাম ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সেসময় অনুমোদিত কমিটিতে এসএম বোরহান উদ্দিন সভাপতি ও আবু তাহের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

বিতর্কিতদের নতুন কমিটিতে স্থান পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছয় মাস ধরে আমরা এই কমিটি আটকে রেখেছিলাম। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই কমিটি দিয়েছি। আমরা বিতর্কিত কাউকে নিয়ে ছাত্রলীগ করতে চাই না। এই কমিটিতে যদি বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী থাকে তাহলে আমাদের জানান। তাদের বিরুদ্ধে আমরা গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত