বিস্ফোরক লিটন হিসেবি তামিমে রেকর্ডের দিন

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ১২:৪৫ এএম

‘ক্যাপ্টেন’ মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার বিদায়ী আন্তর্জাতিক ম্যাচটা এক সময় বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার হুমকিতে পড়েছিল। কিন্তু প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত বাংলার মাটির অন্যতম সেরা সন্তানের এমন দিনে তত নির্দয় হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশি ওপেনার লিটন কুমার দাস বৃষ্টির আগে সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে পরে ফিরে জিম্বাবুয়ের ওপর নিষ্ঠুরতার চূড়ান্তটা করে ফেললেন। তামিম ইকবালও ব্যাট হাতে নির্দয় আচরণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত করে গেছেন। এই দুই ওপেনার মিলে গতকাল শেষ ওয়ানডেতে জিম্বাবুয়েকে রানের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের দুই ওপেনারই তিন ম্যাচের দুটিতে করলেন সেঞ্চুরি। তামিমের ব্যাক টু ব্যাক।

১৪৩ বলে ১৬ চার ও ৮ ছক্কায় রেকর্ড গড়া ১৭৬ রানের নান্দনিক ও বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছেন লিটন। হিসেবি তামিম ১০৯ বলে ৭ চার ও ৬ ছক্কায় খেলেছেন হার না মানা ১২৮ রানের ইনিংস। সিরিজের তিন ম্যাচেই দলের হলো রেকর্ড রান। এবার ৩ উইকেটে ৩২২। ওভারপ্রতি ৭.৪৮। প্রথমবার তিন ম্যাচেই ৩০০ প্লাস রান।

এসব কিছু ছাপিয়ে যাচ্ছে তামিম-লিটন জুটির ওপেনিং পার্টনারশিপের ২৯২ রান। বিশ্ব ইতিহাসে যেকোনো উইকেটে ষষ্ঠ সর্বাধিক রানের জুটি এটা। ওপেনিংয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ। ২১ বছর টিকে থাকা শাহরিয়ার হোসেন-মেহরাব হোসেনের ১৭০ রানের জুটির রেকর্ড ভাঙল। ১৯৯৯ সালে সেটিও ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ঢাকায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। লিটন-তামিম দেশের সর্বোচ্চ রানের জুটি গড়তে ভেঙেছেন ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ইংল্যান্ডে পঞ্চম উইকেটে সাকিব আল হাসান-মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সেই মহাকাব্যিক ২২৪ রানের পার্টনারশিপটা। তারপর তো বিশ্ব ইতিহাসের কত কত কিংবদন্তির জুটির রেকর্ড গুঁড়িয়ে ছোটার নেশায় লিটন-তামিম ৪১তম ওভারে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন। ৭ ওভার কাটা পড়ায় ৪৩ ওভারের ম্যাচ এটি।

রেকর্ডের সিরিজে তামিম ২০০৯ সালে নিজের গড়া ১৫৪ রানের রেকর্ড ভেঙেছেন দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। আগেরটা নিজের হাতে ভেঙেছেন ১১ বছর পর। আর এবার মাত্র দুদিন টিকল ১৫৮ রানের রেকর্ড। তামিম অন্য প্রান্ত থেকে দেখলেন কীভাবে একের পর এক ছক্কায় লিটন তাকে ছাড়িয়ে যান। এসে বুকে জড়িয়ে অভিনন্দনও জানিয়েছেন। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’র সব সম্ভাবনার আলো জ্বালিয়েও শেষে তা করতে পারেননি লিটন। কিন্তু পয়সা উশুল করা ইনিংস শুধু খেলেননি, বাংলাদেশের হয়ে ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ করার প্রতিশ্রুতিও রেখে গেছেন সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে।

একটুর জন্য দেশের পক্ষে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ বাউন্ডারির রেকর্ডটা ভাঙতে না পারলেও সর্বোচ্চ ছক্কার নতুন রেকর্ড লিখেছেন। তামিম ৭ ছক্কায় ২০১০ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গড়েছিলেন আগের রেকর্ডটা, যেটি এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১৪ ছক্কার নতুন রেকর্ড অবশ্য হওয়ারই ছিল। এছাড়া এক ইনিংসের সবচেয়ে বেশি চার-ছয়ের (মোট ২৪টি) রেকর্ড এখন লিটনের। এর আগে রেকর্ডটি তামিমের দখলে ছিল (২৩টি)। একই দিনে জয় দিয়ে অধিনায়ক হিসেবে ৫০তম জয় পেলেন মাশরাফী।

লিটন ও তামিমের ইনিংসকে এবারও দুইভাগে ভাগ করতে হয়। সেঞ্চুরির আগে ও পরে। লিটন সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে খেলা ১২৬ রানের ইনিংসটার মতো এবারও মাটিতে চোখ রেখে খেলে গেছেন। তামিম অবশ্য আগের ম্যাচের ১৫৮ রানের ইনিংসে ছক্কায় চোখ রেখেছিলেন সেঞ্চুরির পর। এবার সেঞ্চুরির আগেই মেরেছেন চারটি।

৭ বাউন্ডারিতে লিটনের ফিফটি ৫৪ বলে। কিছুক্ষণ পর তামিম ফিফটি করেন ৬০ বলে। ২ ছক্কা ও ৩ চার তখন। সব শট খেলতে জানা লিটন হাওয়ায় ভাসিয়ে খেলা থেকে নিজেকে সন্তর্পণে দূরে রেখেছেন। নার্ভাস নাইন্টিজের ঘরেই আরও দুটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ৩৬ ম্যাচের ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি লিটনের। পরের ওভারে (৩৩.২) বৃষ্টি নামে। তামিম তখন ৭৯, লিটনের ১০২। দলের ১৮২। লিটনের সেঞ্চুরির আগেই হয়ে গেছে এক হাজার রান। প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট খেলা থাকে বন্ধ। তামিমের সেঞ্চুরি হয় কি না, বাংলাদেশ আর ব্যাটিং পায় না পায় কিংবা মাশরাফীর শেষ ম্যাচটা এখানেই শেষ কি না তা নিয়ে জোর সংশয় তখন।

শেষে ফিরেই মারার তাড়নায় প্রথম বলেই ক্যাচ তোলেন লিটন। এভাবে ১০২, ১২২ ও ১৪৪ রানে তিনটা জীবন পান। কিন্তু ততক্ষণে জিম্বাবুয়ের বোলিং-ফিল্ডিং সব এলোমেলো। লিটন ‘এফোর্টলেস’ ব্যাটিংয়ে ছক্কার পর ছক্কা হাঁকান। ওভাবেই প্রথমবার দেড়শোতে, ১৫৮’র রেকর্ড ভেঙে ফেলা। প্রচণ্ড প্রতিভাবান ও সহজাত প্রতিভার প্রায় সর্বোচ্চ সামর্থ্যরে প্রকাশ মিলছিল। গ্যালারি আত্মহারা।

নার্ভাস নাইন্টিজে গিয়ে এবারও একটু ধীর হওয়া তামিম সেঞ্চুরিটা পান ৯৮ বলে। ৫ চার ও ৪ ছক্কায় সাজানো। অন্য প্রান্ত থেকেও তামিম আঘাত হানেন। কিন্তু লিটন যেন গল্গা হরিণ। প্রত্যাশার তখন আর সীমা থাকে না। কিন্তু আরেকটি ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে শেষে ঠিক বাউন্ডারি লাইনেই পড়েন ধরা।  সবার অভিনন্দন নিতে নিতে বীরের মতো মাথা উঁচু করে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন লিটন। সাড়ে চার বছরেও নিজের পজিশন পাকা করতে পারেননি। এবার ৩ ম্যাচের সিরিজে ৩১২ রান। ওপেনিংয়ে। লিটন নিশ্চয়ই পুরোপুরি নির্ভার আজ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত