দখলবাজ কিশোর গ্যাং লিডারও কাউন্সিলর প্রার্থী!

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ০১:৩৯ এএম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকেই নানা অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৬৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মধ্যে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলদার এবং কিশোর গ্যাং লিডারের মতো বিতর্কিতরা রয়েছে বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে। আর বিতর্কিত এসব প্রার্থী প্রত্যেকেই অঢেল সম্পদের মালিক হিসেবে এলাকায় প্রচার থাকলেও নির্বাচন কার্যালয় ও চসিক নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হলফনামায় তা উল্লেখ নেই। জমা দেওয়া হলফনামায় তাদের প্রকৃত সম্পদের দশ ভাগের এক ভাগও দেখানো হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চসিক নির্বাচনে এবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ আরও একাধিক দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে রয়েছেন ৭ এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২৬৯ জন। তাদের মধ্যে একজন চসিকের ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তৌফিক আহমদ চৌধুরী। নিজ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাং তৈরি করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো, মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র সন্ত্রাসী কাজে ভাড়া দেওয়াসহ নানা অভিযোগের কারণে এবার তাকে কাউন্সিলর পদে সমর্থন দেয়নি আওয়ামী লীগ। তৌফিককে বাদ দিয়ে এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া হয়েছে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী মো. শফিউল আজিমকে। তৌফিক আহমদ চৌধুরী এলাকায় অঢেল সম্পদের মালিক হিসেবে পরিচিত হলেও জমা দেওয়া হলফনামায় তার নগদ টাকা দেখিয়েছেন শুধু ১ লাখ। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার নিজ নামে রয়েছে ১৪ লাখ টাকা। নির্ভরশীলদের নামে পোস্টাল, সেভিংস ও সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ দেখিয়েছেন ৩ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে কোনো টাকা জমা না দেখালেও স্ত্রীর নামে ৯ ভরি স্বর্ণালংকার আছে বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও তার নামে নগরের বিআরটিএ ও আতুরার ডিপো এলাকায় তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় তৌফিকের নামে কোনো ঋণ না থাকলেও তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত তৌফিক বিভিন্ন মডেলের দামি গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করলেও হলফনামায় কোনো গাড়ি থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেননি। আরেক বিতর্কিত প্রার্থী ৯নং উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মো. জহুরুল আলম জসিম। যিনি ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে

এ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাউন্সিলর হওয়ার আগে তেমন অর্থবিত্তের মালিক না থাকলেও বর্তমানে তিনি ‘শতকোটি টাকার মালিক’। তার বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক কারবার, দখলবাজি, পাহাড় কেটে সরকারি খাস জায়গা অবৈধভাবে বিক্রি, অটোরিকশা ও বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ থাকায় এবার তাকে মনোনয়ন দেয়নি আওয়ামী লীগ। তাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থন দেওয়া হয়েছে পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল আবছার মিয়াকে। জসিমের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং তৈরি করে ত্রাস সৃষ্টি করার অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর। নানা অভিযোগে বিতর্কিত এ কাউন্সিলর প্রার্থী এলাকায় ‘শতকোটি টাকার মালিক’ হিসেবে পরিচিত হলেও হলফনামায় তার নগদ টাকা দেখিয়েছেন শুধু ৯ লাখ এবং তার স্ত্রীর নামে দেখানো হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার নিজ নামে রয়েছে ১৪ লাখ ৭ হাজার ৬৮৩ টাকা ও স্ত্রীর নামে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮১৭ টাকা। তার নামে একটি এক্সট্রেইল জিপ রয়েছে। তার নিজের নামে ২০ হাজার টাকার স্বর্ণ দেখানো হলেও স্ত্রীর নামে রয়েছে ২০ ভরি স্বর্ণ। জসিমের নিজের নামে অকৃষি জমি রয়েছে ১১৩.২৫ শতক ও স্ত্রীর নামে ১০ শতক। এছাড়ায় হলফনামায় জসিম ও তার স্ত্রীর নামে বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া, শেয়ার, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক, আমানত, অংশদারী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের (ডেইরি ফার্ম ও নির্মাণসামগ্রী) আয় ও অন্যান্য খাতে মোট বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে ৬০ লাখ টাকা। বৈদেশিক ড্রাফটসহ চারটি ব্যাংকে (পূবালী, স্ট্যান্ডার্ড, আইএফআইসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক) বর্তমানে আড়াই কোটি টাকা দেনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন জসিম। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন, আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ আইন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘনসহ নানা অপরাধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত এবং পাহাড়তলী ও খুলশী থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় তিনি আদালত থেকে খালাস পেলেও বেশিরভাগ মামলা বর্তমানে বিচারাধীন।

১৪নং লালখান বাজার ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আবুল ফজল কবির আহমেদ ওরফে এফআই কবির মানিক। যিনি এলাকায় পাহাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে ত্রাস সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগে এবার আওয়ামী লীগের সমর্থন পাননি। এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন পেয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত মো. বেলাল। যদিও তার বিরুদ্ধেও এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ করছেন অনেকে। এ ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগের আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী দিদারুল আলম মাসুম। মাসুমও ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি।

এফআই কবির মানিক হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তার নগদ টাকা আছে ২ লাখ ৪০ হাজার, স্ত্রীর আছে ২০ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তার একটি টয়োটা মাইক্রোবাস ও একটি টয়োটা কার আছে। মানিক ও তার স্ত্রীর নামে ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি ২ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া হলফনামায় নিজ নামে একটি বাড়ি/ভবন ও স্ত্রীর নামে দুটি বাড়ি/অ্যাপার্টমেন্ট থাকার কথা উল্লেখ করলেও এসব স্থাবর সম্পদের দাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে নিজের নামে পূবালী ব্যাংকে ১৬ লাখ টাকার দেনার কথা উল্লেখ করেছেন মানিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত