রেকর্ড উপহার দিয়ে ক্যাপ্টেনকে বিদায়

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২০, ০২:০৯ এএম

খেলা শেষ হতেই একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। তামিম ইকবাল প্রিয় ‘ক্যাপ্টেন’কে কাঁধে তুলে নেন। সহায়তায় সতীর্থরা। ড্রেসিং রুমের কাছের গ্যালারিতে তখনো হাজারখানেক মানুষ। সবটুকু আবেগ ঢেলে প্রাণপণ সমস্বর উচ্চারণে ‘মাশরাফী’ শব্দে প্রকম্পিত করছেন চার দিক। সাজঘরের কোনার ওপরের দিকে ১২টি অক্ষর বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এক ডজন বিষণ্ন মুখ। সব হারানোর বেদনায় প্রায় প্রাণহীন। বুকে আশীর্বাদ, ‘মাশরাফী তুমি দীর্ঘজীবী হও।’ বাংলাদেশের রূপকথার অধিনায়কের এমন দিনে মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় কেমন লাগছিল?

১৯ বছর বয়সে মাঠেই প্রথমবার ছিড়েছিল হাঁটুর লিগামেন্ট। চট্টগ্রামে। সেই রাতেও হোটেলে ‘যেন কিছু হয়নি’ ভাব নিয়ে স্বাভাবিক হেঁটে-চলে খুনসুটি হয়েছিল পুরোদমে। তাহলে দেশের জন্য শেষ টস করতে নামার সময় ‘আবেগ’ নামের বস্তুর সাধ্য কি সেই তাকে স্পর্শ করে! বয়স এখন ৩৬ বলে নয়। মানুষটা মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা বলে, এটা তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জীবনের শেষ দিন হতে পারে জেনেও ১০০ পার্সেন্ট স্বাভাবিক। আর দশটা দিনের মতো। তবু স্পর্শ তো করে। মানুষ। রক্ত মাংসের। দেশের ‘ক্যাপ্টেন’

হিসেবে শেষ সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নও আসে। চেহারা কিছুটা মলিন। সম্ভবত ক্লান্তিতে। ‘কাজ তো অনেক কমে গেল। অনেক বড় দায়িত্ব ছিল। সাধারণত এই সময়ে কারও ভালো লাগে। কারও খারাপ লাগে। আমার মিশ্র দুইটা জিনিসই হচ্ছে। ‘শেষ ভালো যার, সব ভালো তার’ প্রবাদ বাক্যটা তখনই মনে পড়ে তার কথায়, ‘নিজের কাছে ভালো লাগছে যে ক্যাপ্টেন হিসেবে একটা ভালো জায়গায় শেষ করতে পেরেছি। জিতেও শেষ করতে পেরেছি।’

মাশরাফীর কথা, ‘ক্যাপ্টেন’ ব্যাপারটাকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। বলেছেন গতকালও। কিন্তু বাংলাদেশ দলের, খেলোয়াড়দের, ঢাকা থেকে ছুটে আসা সমর্থক, সংগঠক, বোর্ড কর্তা, সাংবাদিকসহ সিলেটের দর্শকদের জন্য এতো স্বাভাবিক নয় মোটে। প্রিয় ক্যাপ্টেনের ‘বিদায়’ দিনে তাই সিরিজে আবার সেঞ্চুরি হাঁকান তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাস। লিটন তো হিমালয় পাড়ি দেওয়ার পণ করে ব্যাটিং বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়েছেন সব। রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙেছে। দল ক্লিন সুইপ করে। জিম্বাবুয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়াতে পারে না। দর্শকরা একটা টিকিটের জন্য ৫-৬ গুণ টাকা খরচ করে, বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়েও ম্যাচের প্রতিটা মুহূর্তকে জীবন্ত রাখেন।

কিন্তু বাংলাদেশ দলের, খেলোয়াড়দের, সিলেটের দর্শকদের জন্য এতো স্বাভাবিক নয় মোটে। প্রিয় ক্যাপ্টেনের ‘বিদায়’ দিনে তাই সিরিজে আবার সেঞ্চুরি হাঁকান তামিম ইকবাল ও লিটন কুমার দাস। লিটন তো হিমালয় পাড়ি দেওয়ার পণ করে ব্যাটিং বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়েছেন সব। রেকর্ডের পর রেকর্ড ভেঙেছে। দল ক্লিন সুইপ করে। জিম্বাবুয়ে হোয়াইটওয়াশ এড়াতে পারে না। ১৩২ রানে হেরেছে শেষ ম্যাচ। দর্শকরা একটা টিকিটের জন্য ৫-৬ গুণ টাকা খরচ করে, বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়েও ম্যাচের প্রতিটা মুহূর্তকে জীবন্ত রাখেন। মাঝে আড়াই ঘণ্টা বৃষ্টি। তাতেও কিছু আসে যায় না।

প্রায় পূর্ণ গ্যালারি ও স্টেডিয়াম। জীবন্ত কিংবদন্তির একটি অধ্যায় এখানে শেষ। বিষাদের সুর আর বিরহ সংগীতকে তবু ছাপিয়ে যায় মাশরাফীকে নিয়ে উন্মাদনা। ব্যাটসম্যানরা দেখতে না দেখতে যেটিকে উৎসবের রূপ দিয়ে উন্মাতাল হাওয়া বইয়ে দিতে থাকেন লাগাতার। শেষ উপহার নাকি ক্রিকেটের জয় জয়কার?

লিটন ১৭৬। তামিম অপরাজিত ১২৮। দলের আবার রেকর্ড ৩ উইকেটে ৩২২। বৃষ্টির কারণে আড়াই ঘণ্টা প্রায় থেমে ফের শুরু কার্টল ওভারের খেলায়। ৪৩ ওভার যেখানে নির্ধারিত। ফিরে এসে ব্যাটে আরও নির্দয়-নিষ্ঠুর তামিম-লিটন ২৯২ রানের জুটি গড়ে ওয়ানডে ইতিহাসেরই নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নিজেদের। নিয়েছেন দেশকে। রেকর্ডের খরস্রোতে খাবি খেতে থাকা জিম্বাবুয়ের জন্য হারই ছিল নিয়তি নির্ধারিত। ৩ খেলার সিরিজে অনুমিতভাবে ৩-০ ব্যবধান এশিয়া ও আফ্রিকার।

সিলেটে ক্রিকেট থেকে শুরুর আগেই ফোকাসটা নড়ে গিয়েছিল সবার। আর মাঠে খেলা গড়ানোর আগে থেকেই এখানে একের পর এক মাঠ ও মাঠের বাইরের ঘটনা ঘটে যায়। চমকের পর চমক। মাশরাফীর ‘শেষ’ বলাও সেখানে চমক। মুশফিকুর রহিমের মতো খেলোয়াড় এই ম্যাচে বাদ। একাদশে ৪ পরিবর্তন। কিন্তু দিন শেষে ব্যক্তি নয়, খেলাটাই আসল, প্রমাণ করে ঢাকায় ফেরা সবার।

কিন্তু কখনো কখনো এই ধন্দেও পড়তে হয় যে ব্যক্তি না থাকলে খেলা কোথায়? নতুন ওভারে ওয়াইডের পর বাউন্ডারি হজম করা মাশরাফী চতুর্থ বলেই প্রতিপক্ষের প্রথম উইকেট ফেলে দিয়ে উল্লাসে ভাসান স্টেডিয়াম। দেশের জন্য খেলে যেতে চান মাশরাফী। প্রকৃতি ভারসাম্য জানে। ন্যায় বিচারক।

৩ ম্যাচে ৪ উইকেট। আগের গল্পটা আজকের জন্য নয়। সামনে লিগ। তারপর পাকিস্তান সফর। ‘এটা তো সিরিজ বাই সিরিজ। বিশ্বকাপে আমার খুব খারাপ করেছে। দলও সংগ্রাম করেছে। ওখান থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরতে বিশ্বের সব খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস লাগে। কখনো উইকেট দিয়ে আত্মবিশ্বাস আসে।’

ফের খেলোয়াড়রা মাঠে নামেন। জার্সি বদলে। সবার একই জার্সি। সামনে ‘থ্যাংক ইউ ক্যাপ্টেন’, পেছনে ‘২’ নম্বর ও মাশরাফী অঙ্কিত। মাশরাফীর নিজেরও। বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বিশেষ ক্রেস্ট তুলে দেন বিদায়ী অধিনায়কের হাতে। ব্রডকাস্টারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে মাঠের উল্টো পাশের সংবাদ সম্মেলন কক্ষের দিকে পাড়ি। সঙ্গে ক্যামেরা ছুটছে। আরও কত কিছু। ওখানে ম্যাচের সেরা ও তামিমের সঙ্গে সিরিজের সেরা লিটন বলছিলেন, মাশরাফীর জন্য ভালো কিছুর ইচ্ছেতে উজ্জীবিত ছিলেন তারা। আর মাশরাফী মনে করিয়ে দেন, বিরাট কোহলি আর লিটনের ব্যাটিং তার সবচেয়ে ভালো লাগে।

আরও কত প্রশ্ন। কিন্তু এটা প্রশ্নের দিন নয়। ‘ভুল করতে চাইনি’। নিজের সম্পর্কে মূল্যায়নে ‘গড়পড়তা ছাড়া বেশি কিছু বলার উপায় নেই’ এমন আড়াল করা সব। দলের প্রসঙ্গ এলে অবশ্য সতর্কবাণী, ‘এখন আমাদের এক্সপেরিমেন্ট করার সময় না। এটা ফলাফল আনার সময়।’

সব শেষেও কিছু শেষ হতে চায় না। রাত ১২টা তখন। পুলিশ এসে বেষ্টনী দিয়ে নিয়ে যায়। ওপারে যেতে তবু কত সময় লাগে। মাঠের মাঝখানে গ্রাউন্ডসম্যানদের ধন্যবাদ দিতেও ভুল হয় না। শেষ অপেক্ষমাণদের হাতের স্পর্শ দিতে দিতে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে থাকেন।

পেছনে তখন কেবল উচ্চারিত হয়, ‘অনেকে এখন বলে মাঠ থেকে বিদায় নেয়া অনেক বড় ব্যাপার। আমি বলি, মাঠ থেকে বিদায় নিতে পারলে কি হয়? বিদায় তো বিদায়। তা ঘরে বসে নেন বা মাঠ থেকে নেন।’ বিশেষ দ্রষ্টব্য: মাশরাফী কিন্তু এখনো বিদায় বলেননি। স্যালুট ক্যাপ্টেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত