করোনাভাইরাস ঠেকাতে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের সঙ্গে গতকাল শনিবার থেকে আগামী সাত দিনের জন্য বিমান চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে কুয়েত সরকার। করোনাভাইরাসমুক্ত সনদের সিদ্ধান্ত বাতিলের দুই দিনের মাথায় নতুন এ সিদ্ধান্ত আরোপ করল দেশটি। কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ গতকাল শনিবার এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে টুইট করেছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য ছয়টি দেশ হলো ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিসর, লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিপাইন।
এর আগে গত বুধবার বাংলাদেশসহ ১০ দেশের জন্য কুয়েতে যেতে করোনাভাইরাসমুক্ত সনদ চায় দেশটি। সনদ সংগ্রহে বেশ বিপাকে পড়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত কুয়েত প্রবাসীরা। পরে বৃহস্পতিবার রাতে সে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয় কুয়েত। অবশ্য গতকাল শনিবার থেকে এ ধরনের সনদ দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
কুয়েতের বিমান চলাচল স্থগিতের সিদ্ধান্ত জেনেছে বাংলাদেশ বিমানও। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোকাব্বির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, কুয়েতের সিদ্ধান্তের কথা আমরা জেনেছি। কুয়েত সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আপাতত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৭ ও ১০ মার্চের দুটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছি।
কুয়েতি সংবাদপত্র আরব টাইমস জানিয়েছে, কুয়েতের নাগরিক ছাড়া এই সাত দেশে গত দুই সপ্তাহের মধ্যে ভ্রমণ করেছে এমন যে কারও কুয়েত ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে এই সাত দেশ থেকে কুয়েতের কোনো নাগরিক দেশে ফিরতে পারবেন, সেক্ষেত্রে ফেরার পর তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। কুয়েতে ইতিমধ্যে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তির দেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়েছে।
কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসের হিসাব মতে, দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখের মতো বাংলাদেশি রয়েছেন। আর প্রতিমাসে অন্তত এক হাজার বাংলাদেশি দেশটিতে যাওয়া-আসা করেন। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে, অনেকেই আকামা বা ভিসার সমস্যায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে কুয়েতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধান কাউন্সিলর মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বিবিসিকে বলেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও যাতে ছুটিতে থাকা প্রবাসীরা ফিরতে পারেন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছেন তারা।
দেশে যেকোনো সময় রোগটি ছড়াতে পারে : বাংলাদেশেও যেকোনো সময় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশি বা বিদেশি নাগরিকদের গণপরিবহন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন আইইডিসিআর পরিচালক। গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে কেউ এলেই যে তার মধ্যে সংক্রমণ রয়েছেএমনটা ঠিক নয়। কিন্তু সাবধানতা নিতে হবে। তাই বিদেশ থেকে এলে নিজস্ব গাড়ি ব্যবহার এবং গাড়ির জানালা খুলে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে কেউ এলে পরিবারের সবাই মিলে বিমানবন্দরে না যাওয়া ভালো। যত কম মানুষ সেই গাড়িতে থাকবেন ততই ভালো।
বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ডা. ফ্লোরা বলেন, যে ৮৯টি দেশে রোগী শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে লোকাল ট্রান্সমিশন বা স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ হয়েছে ৪৩টি দেশে। এই ৪৩টি দেশের মধ্যে ৩৩টিতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী পাওয়া গেছে। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ভুটান, ক্যামেরুন, সার্বিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
করোনা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে এবং গুজবে কান না দিয়ে আইইডিসিআরের তথ্যে ভরসা রাখার আহ্বান জানান আইইডিসিআর পরিচালক। তিনি জানান, গত শুক্রবার তিনজনসহ মোট ১১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। এদের কারও শরীরে এখন পর্যন্ত কভিড-১৯-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। আইইডিসিআরের হটলাইনে ১৭৮টি কল এসেছে কভিড-১৯ সংক্রান্ত, একজন সরাসরি এসেছেন সেবা নিতে।
তিনি আরও জানান, বিশ্বে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৯৮ হাজার ১৯২ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৭৩ জন। মোট মারা গেছেন ৩ হাজার ৪০০ জন। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৯৯ জন। মোট রোগীর মধ্যে চীনেই রয়েছে ৮০ হাজার ৭৭১ জন।
অধ্যাপক ডা. মীরজাদী জানান, ভারতের দিল্লিতে আছেন তিনজন, হরিয়ানাতে ১৪ জন, কেরালাতে তিনজন, রাজস্থানে দুজন, তেলেঙ্গানাতে একজন এবং উত্তর প্রদেশে আটজন, অর্থাৎ মোট ৩১ জন। তবে এদের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যাই বেশি। চীনের বাইরে আক্রান্ত দেশ ও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও ইতালির পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
পরিচালক জানান, এর আগে ইতালি ও আরব আমিরাতে একজন করে এবং সিঙ্গাপুরে পাঁচ বাংলাদেশি আক্রান্ত হন। সিঙ্গাপুরের তিনজন বাড়ি ফিরেছেন, দুজন আছেন হাসপাতালে। এর বাইরে নতুন করে কোনো বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়নি। ইতালিতে যে বাংলাদেশি আক্রান্ত হয়েছেন তিনি হোম আইসোলেশনে আছেন।
যেসব বাংলাদেশি বা বিদেশি নাগরিক আক্রান্ত দেশ থেকে এসেছেন অথবা যাদের জ্বর, কাশি, গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট রয়েছে, তাদের আইইডিসিআরের হটলাইনে যোগাযোগ করার জন্য অথবা নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান আইইডিসিআর পরিচালক।
