মুহূর্তে বাণিজ্যভীতি দ্বিগুণ

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২০, ০৩:৩৬ এএম

চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে বাংলাদেশের শিল্প খাত। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ওইসব দেশের ক্রেতাদের চাহিদা কমে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কাও করছেন রপ্তানিকারকরা। এ পরিস্থিতিতে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর। রপ্তানিকারকরা বলছেন, আতঙ্কে শ্রমিকদের কারখানায় যাওয়ার হার কমার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি আদেশ বাতিল করতে পারে। আর এটি হলে অর্থনীতিতে যে ঝুঁকি সৃষ্টি হবে, তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগী দেশে শনাক্তের ঘটনাকে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মনে করছেন তারা।

রপ্তানিকারকরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানির পরিমাণ প্রায় এক বিলিয়ন ডলার, কিন্তু মোট আমদানির ৩০ ভাগই আসে দেশটি থেকে। যারা চীনে পণ্য রপ্তানি করত, তারা এতদিনে অন্যান্য দেশে বাজার খুঁজে রপ্তানির চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমতে থাকায় দেশটি থেকে কাঁচামাল ও শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য শিগগিরই আমদানি শুরু হবে বলে আশা করছেন শিল্পমালিকরা। প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারতে যখন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে, তখন ওইসব দেশ থেকে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশে অর্ডার করছিল। এখন বাংলাদেশেও শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী। কভিড-১৯ নাম পাওয়া করোনাভাইরাসজনিত এ রোগ এ দেশে ছড়িয়ে পড়লে এসব ক্রেতাসহ পুরনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করে দিতে পারে। এমনকি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল না করলেও আতঙ্কে শ্রমিকরা কারখানায় যাওয়া কমিয়ে দিলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। তখন অর্ডার থাকলেও রপ্তানি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

দেশের ৮৬ ভাগ রপ্তানি আয়ের উৎস তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন খাতে ৫০ শতাংশের মতো ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আক্রান্ত হওয়ার কারণে কী ধরনের প্রভাব পড়বে সেটা বুঝতে অন্তত ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। এরপর আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব।’

তবে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে না পড়ে। আতঙ্ক ছড়ালে শ্রমিকরা কারখানায় যাওয়া কমিয়ে দেবে। তখন উৎপাদন কমে যাবে, কমবে রপ্তানিও।’ তিনি বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঘটলে বিদেশি ক্রেতারাও অর্ডার বাতিল করতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের সচেষ্ট থাকতে হবে, যাতে আক্রান্ত তিনজন থেকে অন্যদের দেহেও এ ভাইরাস ছড়াতে না পারে।’

বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আজিজুল আকিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, তা বড় ধরনের নয়। বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এখন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইতালিতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বাংলাদেশের জন্য বেশি উদ্বেগের। কারণ আমরা চীন থেকে পণ্য আমদানির পর তাতে মূল্য সংযোজন করে এসব দেশে রপ্তানি করি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের মোট রপ্তানির ৬০ ভাগ হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১৭ ভাগের মতো। তাই পশ্চিমা দেশগুলোতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে এসব দেশে আমাদের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশগুলোতে জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি নেমে আসবে, তাতে রপ্তানি অর্ডার বাতিল করবেন ক্রেতারা।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হওয়াটা বড় বিপদের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনিতেই বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী খাতগুলোর কমপ্লায়েন্স পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতা রাষ্ট্রগুলো নানা অজুহাত দাঁড় করায়। এ অবস্থায় করোনার দোহাই দিয়ে তাদের কেউ কেউ দূরে সরে যেতে পারে, যদিও পণ্যের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ানোর কোনো আশঙ্কা নেই।

তবে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম মনে করেন, দেশে কভিড-১৯ রোগী শনাক্তের ঘটনায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার খবরে খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। জনসাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ সচেতন হলে দেশে এর বিস্তার হবে না বলে আশা করি। নতুন করে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করি।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলসিএফইএ) সভাপতি গাজী আবুল কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কুঁচিয়া ও কাঁকড়ার প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি রপ্তানি হতো চীনে। দেশটিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের কাঁকড়া ও কুঁচিয়া ব্যবসায় ধস নামে। পরে আমরা কাতারে এসব পণ্য রপ্তানি শুরু করি। বিকল্প হিসেবে কাতার ছিল আমাদের একমাত্র গন্তব্য। কয়েক দিন আগে সে দেশও আমাদের ফ্লাইট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানির চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের খবর আমাদের কাছে “মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা”। কারণ অন্য দেশ যদি এখন বাংলাদেশ থেকে আমদানি বন্ধ করে দেয়, তাহলে অবস্থাটা আরও বেগতিক হবে। এমনিতেই আমরা ৪০০ কোটি টাকার মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ খাতের ক্ষতি যা হয়েছে, তা তো হয়েই গেছে। এখন করোনাভাইরাস বাংলাদেশে আসার পর কী ধরনের প্রভাব পড়বে সেটা বলা যাচ্ছে না। কয়েক দিন পর সেটা জানা যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত