দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত তিন রোগী শনাক্ত হওয়ার পর হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে গেছে স্যানিটাইজারের। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ওষুধের দোকান ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে হাত ধোঁয়ার স্যানিটাইজারের ক্রেতা বেড়েছে। বিপুল চাহিদার কারণে কোনো কোনো ওষুধের দোকানে থাকা স্যানিটাইজারের মজুদ ফুরিয়ে যায়। তবে বাজারে স্যানিটাইজারের কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই উল্লেখ করে স্যাভলন ও হেক্সিসলের উৎপাদক প্রতিষ্ঠান এসিআই কনজ্যুমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ আলমগীর গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে জানান, বাজারে এসব পণ্যের দামও বাড়বে না। তিনি বলেন, এসিআই স্যানিটাইজার আইটেমের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এতদিন আমরা স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল হ্যান্ড রাব বাজারজাত করেছি। এখন নতুন করে স্যাভলন হ্যান্ড রাব বাজারে ছেড়েছি। স্যাভলন সাবানও ভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করে।
সৈয়দ আলমগীর জানান, করোনাভাইরাসের কারণে এসব পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়েছে। তবে আমি আজকেই (গতকাল) কারখানায় উৎপাদন ও মজুদ পরিস্থিতি যাচাই করে এসেছি। তাতে দেখা গেছে, স্যানিটাইজারের সংকট সৃষ্টির কোনো কারণ নেই। দেশজুড়ে পর্যাপ্ত স্যানিটাইজার সরবরাহ করার সক্ষমতা এসিআইয়ের রয়েছে। আর চাহিদা যতই বাড়ুক, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে দাম স্থিতিশীল রাখা হবে। এ বিপদের সময়ে এসিআই নিজে তো দাম বাড়াবেই না, বিক্রেতারাও যেন দাম বাড়াতে না পারেন, সেজন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া আগে থেকেই চাহিদার তুঙ্গে থাকা সার্জিক্যাল মাস্কের চাহিদাও বেড়েছে। তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরেও এ ধরনের মাস্ক না পেয়ে ধুলা ঠেকাতে সক্ষম সাধারণ কাপড়ের মাস্ক কিনে ফিরছেন আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ। যদিও দেশের তিনটি কোম্পানি প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, হিল ফ্রার্স্ট সার্জিক্যাল ও বরিশাল সার্জিক্যাল লিমিটেড দেশেই সার্জিক্যাল মাস্ক উৎপাদন করে। তবে তাদের বড় অংশই সরবরাহ করা হয় হাসপাতালগুলোতে। প্রাণ গ্রুপের জনসংযোগ বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হঠাৎ করে সার্জিক্যাল মাস্কের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আমাদের।
হাতের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশেষজ্ঞরা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। হাত ভালোভাবে না ধুয়ে তা নাকে-মুখে না দেওয়ার কথা বলেছেন তারা। এতদিন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত না হওয়ায় প্রস্তুতি নেয়নি নগরবাসী। গতকাল ইতালিফেরত দুই বাংলাদেশিসহ মোট তিনজন করোনাভাইরাসজনিত কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশের পর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ওষুধের দোকান ও সুপার স্টোরগুলোতে ছুটে যান অনেকে।
গতকাল বিকেলে রাজধানীর রমনা এলাকার লাজ ফার্মায় গিয়ে এসিআই কোম্পানির স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও হেক্সিসল হ্যান্ড রাব পাননি ইস্কাটনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তামজিদ তুরাগ। তবে লাজ ফার্মায় অন্য কোম্পানির স্যানিটাইজার ছিল। পরে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে থাকা ডিসপেনসারিতে এসে হেক্সিসল ও স্যাভলন স্যানিটাইজার পেয়ে কিনে ফেলেন তিনি। বিকেল ৪টার দিকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ডিসপেনসারিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১০-১২ জন ক্রেতার ভিড়। তাদের সবাই স্যানিটাইজার কিনতে এসেছেন।
তামজিদ এ প্রতিবেদককে বলেন, তিনি ডিসপেনসারিতে যখন ঢোকেন, তখন সেখানে আর কোনো ক্রেতা ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে ১০-১২ জন ক্রেতা এসে সবাই স্যানিটাইজার কিনেছেন।
‘আমি কয়েক বন্ধুর সঙ্গে মেসে থাকি। করোনাভাইরাসের ভয় সবারই আছে। করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী দেশে শনাক্ত হওয়ার পর মেসের অন্যদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করি। তারা আমাকে বলেছে স্যানিটাইজার কিনে নিতে। তাই আমি বাসায় সবার ব্যবহারের জন্য বড় একটি ও অফিসে ব্যবহারের জন্য ছোট একটি স্যানিটাইজার কিনেছি’ বলেন তামজিদ।
ওই ডিসপেনসারির বিক্রেতা মো. জামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেলা ৩টার পর থেকে হঠাৎ করে অনেক ক্রেতা ভিড় করছেন। সবাই হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সার্জিক্যাল মাস্ক খুঁজছেন। আমাদের কাছে তখন পর্যাপ্ত মজুদ ছিল। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বিক্রি করছি। ২০০ মিলিলিটারের স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ২০০ টাকা, ৫০ মিলিলিটারের স্যাভলন হ্যান্ড স্যানিটাইজার ৮০ টাকা ও ২৫০ মিলিটারের হেক্সিসল ১৩০ টাকা করে বিক্রি করেছি। চাহিদা বাড়লেও দাম বাড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, হঠাৎ করে স্যানিটাইজারের চাহিদা বাড়ার কারণ প্রথম দিকে বুঝতে পারিনি। পরে ক্রেতাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম যে দেশে করোনার রোগী শনাক্ত হয়েছে। ক্রেতাদের কথায় তাদের বেশ চিন্তিত মনে হয়েছে।
ঢাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর চিন্তিত সরোয়ার আলম তার স্ত্রীকে মোবাইল ফোনে স্যানিটাইজার কেনার পরামর্শ দেন। তার স্ত্রী উত্তরা এলাকার কয়েকটি সুপার স্টোর ও ওষুধের দোকানে গিয়ে স্যানিটাইজার পাননি। রাজধানীর গুলশান এলাকাতেই স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন এক ক্রেতা।
রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আবুল হাশেম জানান, ঢাকায় করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর বেশকিছু স্যানিটাইজার কিনেছেন। তবে সার্জিক্যাল মাস্কের জন্য আশপাশের বিভিন্ন ওষুধের দোকান ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গিয়েও পাননি। অগত্যা ৪০ টাকা করে সাধারণ কাপড়ের মাস্ক কিনে ফিরেছেন। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। বাসায় স্কুলপড়ুয়া সন্তানসহ অন্য সদস্যরা রয়েছে। তাদের সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে যতটা সম্ভব নিরাপদে রাখার জন্যই আগাম প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকার গৃহবধূ অনামিকা অনা জানান, এতদিন করোনাভাইরাস নিয়ে মনের মধ্যে কোনো ভয় ছিল না। কারণ অন্য দেশে যাই হোক, বাংলাদেশে শনাক্ত না হওয়ার কারণে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কাও ছিল না। এখন যেহেতু ঢাকায় করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তাই পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষার জন্য প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিচিত এক ওষুধের দোকানে ফোন করে আমার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার রেখে দেওয়ার কথা বলেছি। তিনি বলেন, সার্জিক্যাল মাস্কের সংকট চলছে, তবুও নানাজনের মাধ্যমে পাওয়ার চেষ্টা করছি।
