আদালতি কারবার বলে একটা কথা অনেকেই বলে থাকেন। কেন বলেন? সাধারণত দীর্ঘসূত্রতা বোঝাতে এই কথাটা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কোনো কিছু জট পাকিয়ে গেলে, সহসাই সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, অনেক রকমের মারপ্যাঁচে পড়ে দীর্ঘসূত্রতার গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেলে তাকেই মানুষ বলে আদালতি কারবার। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আদালত চত্বরে এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটেছে যে আদালতি কারবারের প্রয়োগই পাল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এক। পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত সাংঘাতিক এক তৎপরতা দেখিয়েছে সম্প্রতি। আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি আবদুল আউয়াল ও তার স্ত্রী লায়লা পারভীনের নামে মামলা দিয়েছিল দুদক। একজন সরকারি দলের নেতা ও সাবেক এমপির বিরুদ্ধে এই মামলা দেওয়াটাই হয়তো এক মহাঅন্যায়। সেই মামলায় জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ তো রীতিমতো এক বিস্ময়! কিন্তু এই বিস্ময়কর কাজটাই করে ফেলেছিলেন বিচারক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। জনাব আবদুল মান্নানের এই কাঁচা কাজ শুধরে নিতেও ভুল করেনি আদালত। মুহূর্তের মধ্যেই বদলি করে দেওয়া হয় এই জেলা ও দায়রা জজকে। দায়িত্ব দেওয়া হয় যুগ্ম ও জেলা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে। ভারপ্রাপ্ত হয়েই তিনি আবার শুনানি করে আগের রায় বদলে দেন। জামিন পেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরে যান আউয়াল দম্পতি। এই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সাকুল্যে সময় লাগে মাত্র চার ঘণ্টা!
প্রশ্ন হলো, ভুলটা তাহলে কে করেছিলেন? চার ঘণ্টা আগে যিনি জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি? নাকি চার ঘণ্টা পরে যিনি তাদের সসম্মানে জামিন দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন তিনি?
দুই। এই সময়ের আলোচিত অর্থভা-ারের মালিকদের ক্যাসিনো গ্রুপের এক সদস্য যুবলীগ নেতা জিকে শামীম। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। রিমান্ড শেষে জেলে পাঠানো হলো। একটা টানটান উত্তেজনা তাকে নিয়ে। আর তিনিই কিনা হাইকোর্ট থেকে নীরবে নিভৃতে জামিন বাগিয়ে নিলেন! সংবাদমাধ্যমে এলো গোপনে জামিন নেওয়ার কথা। কেউ জিজ্ঞেস করলো না, হাইকোর্ট থেকে গোপনে জামিন নেয় কেমনে? তার জামিনের আবেদনের কি শুনানি হয়নি? সেখানে কি উকিল-ব্যারিস্টার সাহেবরা শুনানি করেননি? জজ সাহেব কি সব শুনে-বুঝে প্রাপ্য মনে করেই তাকে জামিন দেননি? তাহলে শুধু জামিন গোপনে হলো কী করে? হতে পারে সংবাদমাধ্যম আগে বিষয়টি টের পায়নি। টের কেন পায়নি তারও একটা জুতসই ব্যাখ্যা আছে। জিকে শামীম এ নামে পরিচিত হলেও তার একটা পোশাকি নাম আছে। তা হলো, এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম। সে নামে তিনি আবেদন করেছেন বলে বিষয়টি আলোচনায় আসেনি। তাই বিষয়টি জানতে সংবাদমাধ্যমের সময় লেগেছে। তাই বলে এটাকে গোপন বলা যায়! সংবাদমাধ্যমে বেশ জোরেশোরে আলোচনা-সমালোচনা ওঠার পরে আদালত আবার তার জামিন বাতিল করে।
এখানেও মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, সংবাদমাধ্যমের আলোচনা সমালোচনার ওপর কেন জামিন নির্ভর করবে? আসামির অপরাধ বিবেচনায় আদালত জামিনপ্রাপ্য ব্যক্তিকে জামিন দেয়। মাত্র কয়েকদিন আগেই জজ সাহেবরা মনে করলেন, জিকে শামীম জামিনের হকদার। আবার সমালোচনা ওঠার পর জজ সাহেবরাই মনে করেন, তার জামিন বাতিল করতে হবে।
এখানেও কি দুটোই ঠিক? নাকি কোথাও কোনো ভুল আছে?
তিন। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচারের ক্ষেত্রেও আমরা পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সাঁড়াশি পদক্ষেপ দেখে খুশি হয়েছি। তীব্র আন্দোলনের চাপে মাত্র ৩৩ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল সেই মামলায়। মামলাটির নিষ্পত্তিতে সর্বসাকুল্যে সময় লেগেছে সাত মাসেরও কম। মাত্র ৬১ কার্যদিবস শুনানির পরই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আর তাতে ১৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় পেয়েছি আমরা। এমন দ্রুত রায়ই তো সব ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার আশা করে।
একটা কথা আছে, জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড। তাই আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল আউয়ালের জামিন নামঞ্জুর ও মঞ্জুরের দ্রুততা, যুবলীগ নেতা জিকে শামীমের জামিন মঞ্জুর ও তা বাতিলে ত্বরিত পদক্ষেপ এবং নুসরাত হত্যার বিচারকাজ দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি দেখে ভালোই লাগে। এই মামলা জটের দেশে এই ত্বরিত পদক্ষেপ অভাবনীয়। গেল বছরই দৈনিক জনকণ্ঠ (২৬ আগস্ট) জানিয়েছে, আগের তুলনায় মামলার সংখ্যা বাড়ছে। গত এগারো বছরে প্রায় সোয়া কোটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আর এ সময়ে মামলা দায়ের হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি। প্রতিদিন প্রায় তিনশ নতুন মামলা যোগ হচ্ছে শুনানির তালিকায়। ২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারি দৈনিক প্রথম আলোতে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান লিখেছেন,২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আপিল বিভাগসহ সব ধরনের আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৭৮টি। বছর শেষে আরও প্রায় ১০ লাখ মামলা যুক্ত হবে এর সঙ্গে। ২০২০ সালের মধ্যে মামলার জট ৫০ লাখে দাঁড়াবে বলে তিনি লিখেছিলেন। এই যে মামলাজট, এই যে মানুষের বিচারপ্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা, তাতে আদালতের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো মানুষের মনে কী ধারণা দিচ্ছে?
নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে মানুষ যেমন খুশি তেমনি অন্য বিষয়গুলোতে মানুষ সাংঘাতিক হতাশ।
এমনিতেই আদালতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিভিন্ন সময় জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায় ও তার জামিন নিয়ে গোটা জাতি দ্বন্দ্বে ভুগছে। তাদের সামনে এই আদালতেরই কতগুলো রায় উদাহরণ হিসেবে রয়েছে। তারা দেখেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দুর্নীতির দায়ে ১৩ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পরও জামিনপেয়েছেন, মন্ত্রিত্ব চালিয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী ও এককালের বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদাও সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার পর জামিন ভোগ করেছেন। কখন করেছেন? যখন বিএনপি ত্যাগ করে তিনি ফুল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়েছেন। জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জীবিত থাকাকালে আমৃত্যু জামিন ভোগ করে গেছেন।
আবার এই আদালতই খালেদা জিয়া বারবার আবেদন করার পরও তাকে জামিন দেয়নি। খালেদা জিয়া একজন সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ নারী। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। দেশের জনপ্রিয়তম শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী যিনি জীবনে কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। দেশের অন্যতম একটি রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রধান। এই দেশেরই সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান, সেক্টর কমান্ডার ও একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। তিনি বন্দি অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ। তারপরও এই আদালতই তার জামিনের আবেদন নাকচ করেছে।
এখানেও যে কোনো এক পক্ষের অভিযোগকে বিশ্বাস করলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় আদালতই।লেখক
চিকিৎসক ও কলামনিস্ট
