কিডনি চিকিৎসায় খরচ বেড়ে দ্বিগুণ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ০৪:৩৪ এএম

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম কিডনি রোগে ভুগছেন গত দশ বছর ধরে। বর্তমানে মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে জহিরুল বলেন, ‘২০১১ সালে ডায়াবেটিস দেখা দেয়; কিডনিতেও সমস্যা ধরা পড়ে। ২০১৬ সালে কিডনি বিকলই হয়ে যায়। এখন সপ্তাহে দুবার করে ডায়ালাইসিস করাতে হচ্ছে। চোখেও সানি পড়েছে; হার্টেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন ডায়ালাইসিস ও অন্যান্য ওষুধ বাবদ মাসে লাগে ৪০ হাজার টাকা। এই টাকা জোগানো আমাদের মতো নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়।’

ওই হাসপাতালে গতকাল বুধবার কিডনি ডায়লাইসিস করাতে আসা হেনা বেগমের ছেলে হামিম হাওলাদার বলেন, ‘মায়ের কিডনি ৯০ শতাংশ বিকল হয়ে গেছে। সপ্তাহে তিনটি ডায়ালাইসিস করাতে হয়। তিন বছর আগে মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ হলেও বর্তমানে অন্তত ৩৫ হাজার টাকা করে লাগছে।’

বিশেষায়িত এই হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. শেখ মইনুল খোকন দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতিদিন শতাধিক রোগী ডায়ালাইসিসের জন্য আসে, যাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে দেশে সবচেয়ে কম টাকায় কিডনি রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া গরিব রোগীদের ক্ষেত্রে ৫০-৬০ শতাংশ ছাড় রয়েছে। কিডনি অকেজো হওয়া একজন রোগীকে সপ্তাহে দুই বা তিনবার পর্যন্ত ডায়ালাইসিস করাতে হয়।’

আজ ১২ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস সামনে রেখে গতকাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। পাঁচ বছর আগে ডায়ালাইসিস খরচ ছিল ১৫০০-২০০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৩-১০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া পরীক্ষা খরচ ও ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ কম  থাকলেও অপ্রতুলতায় সেই সেবা পাচ্ছেন না বেশিরভাগ রোগী। ফলে কিডনি সমস্যায় আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভুগছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজারের কিডনি পুরোপুরি অকেজো হচ্ছে প্রতিবছর। ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন ছাড়া এ রোগের বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই।

কিডনি রোগবিশেষজ্ঞ চিকিৎকরা জানান, উচ্চরক্তচাপ, ডায়বেটিস ও ভাস্কুলার বা রক্তনালির রোগাক্রান্তদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। তাই এসব রোগীর ক্রনিক কিডনি ডিজিজের পরীক্ষার (স্ক্রিনিং) আওতায় রাখা প্রয়োজন। কারণ, একটি বড় অংশের রোগী, যাদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১-৩) ধরা পড়ে, তাদের চিকিৎসার আওতায় রাখলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে না। এই চূড়ান্ত স্তরে কিডনি প্রতিস্থাপন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) ইমেরিটাস অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, কিডনি রোগ দুই ধরনের হয়। একটি হঠাৎ হয় এবং অন্যটি দীর্ঘদিন ধরে থাকলেও বোঝা যায় না। এ দুটিই প্রতিরোধ করা যায়। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে কিডনি সমস্যা হবে না। জ্বর হলেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা ঠিক না। এতে কিডনির ক্ষতি হতে পারে। নিয়মিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। কিডনি রোগের আরেকটি কারণ হলো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন। একমাত্র প্যারাসিটামল ছাড়া যেকোনো ব্যথার ওষুধের ৮০ ভাগই কিডনির ক্ষতি করে।

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এমএ সামাদ বলেন, দেশে কিডনি রোগের যে পরিসংখ্যান রয়েছে বাস্তবে তার থেকে রোগী দেড়গুণ। সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সুবিধা কম থাকায় অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এতে একজন রোগীর ডায়ালাইসিস, পরীক্ষা, ওষুধ বাবদ মাসে ৩-৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ১০ ভাগেরও কম রোগী ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে সক্ষম। ৫০-৬০ ভাগ কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস শুরু করলেও কিছু দিন পর তা বন্ধ করে দেন। অথচ ডায়ালাইসিস একবার শুরু করলে আজীবন তা অব্যাহত রাখতে হয়। বাকিরা খরচ বহন করতে না পারায় ডায়ালাইসিস শুরুই করতে পারেন না। ২০১৮ সালে কিডনি প্রতিস্থাপন আইন কিছুটা শিথিল করেছে সরকার। কিন্তু এর পরও প্রতিস্থাপনের জন্য কিডনি পাওয়া যাচ্ছে না।

বিশ্ব কিডনি দিবস আজ : আজ ১২ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি, সর্বত্র সবার জন্য’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন, ক্যাম্পস, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত