ফেরি ও লঞ্চঘাট নিয়ন্ত্রণ করবে নৌপুলিশ

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ০৪:৪০ এএম

এত দিন নৌপথে টহল ও জাটকা নিধন অভিযানের মধ্যেই একপ্রকার সীমাবদ্ধ ছিল নৌপুলিশের কার্যক্রম। সম্প্রতি পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটের এখতিয়ার ও কাজের পদ্ধতি নির্ধারণ করে বিধিমালা জারি করা হয়েছে। এর আওতায় দেশের সব ফেরি ও লঞ্চঘাটে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন নৌপুলিশ সদস্যরা। নদীবন্দরের পাশাপাশি স্থলভাগের ৫০ মিটার পর্যন্ত অভিযান চালাতে পারবেন তারা।

গত মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নৌপুলিশপ্রধান ও উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আতিকুল ইসলাম গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিধিমালা জারি হওয়ার পর আমাদের কাজের চ্যালেঞ্জও বেড়ে গেছে। বিধিমালায় যা যা আছে সেভাবেই নৌপুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। নৌপথসহ অন্যান্যা স্থানে অপরাধীদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। যেসব মামলা আছে এখন থেকে তদন্ত শুরু করবে নৌপুলিশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট পুলিশের নতুন ইউনিট নৌপুলিশের কার্যক্রম শুরু হয়। মিরপুরের পাইকপাড়ায় নৌপুলিশের সদর দপ্তর করা হয়। বর্তমানে হাতিরঝিল থানা এলাকায় নতুন করে অফিস নেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটির ছিল না তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা। গ্রেপ্তার বা অভিযান চালাতে পারত না নৌপুলিশ। শুধু নদীপথে টহলেই ব্যস্ত থাকত। আর জাটকা মাছ ধরা বন্ধ করতে নদীপথেই অভিযান চালিয়ে আসছিল। এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিধিমালা তৈরি করতেই প্রায় বছর দুয়েক লেগে যায়। বিধিমালা ঠিক করে দিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় প্রস্তাবনা। সেখান থেকে যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সেখানে যাচাই-বাছাই করে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, নৌপুলিশ বিধিমালা, ২০২০ নামে অভিহিত হবে। ‘নৌযান’ অর্থ নৌপথে চলাচলকারী কোনো নৌকা, ট্রলার, স্পিডবোট, লঞ্চ, ফেরি বা জাহাজসহ অন্য কোনো জলযান। নৌপুলিশের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় থাকবে। পুলিশের মহাপরিদর্শকের তত্ত্বাবধানে একজন উপমহাপুলিশ পরিদর্শকের (ডিআইজি) নেতৃত্বে ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ইউনিটপ্রধান কার্যাবলি সম্পাদন, ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। সুসজ্জিত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং যুগোপযোগী জলযান সমন্বয়ে পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে।

বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সব নদী, হ্রদ বা অন্য কোনো নৌ চলাচল উপযোগী নৌপথ এবং জোয়ার-ভাটা নৌপথে অভিযান চালাতে পারবে নৌপুলিশ। নৌপথের সর্বোচ্চ পানির স্তর যে স্থানে ভূমি স্পর্শ করে সেখান থেকে ৫০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় অভিযান চালাতে পারবে নৌপুলিশ। ফেরি, ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, লঞ্চ টার্মিনাল, নোঙরঘাটসহ নৌ স্থাপনা নৌপুলিশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ওই সব স্থানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রয়োগ করতে পারবে। নৌপথে মালামাল পরিবহন, যাত্রী চলাচল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে এই ইউনিট। নৌযান  বা নৌ স্থাপনায় অবৈধ টোল আদায় করতে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারবে নৌপুলিশ। চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও কাজ করবে নৌপুলিশ।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত, বিঘ্ন সৃষ্টি, অবৈধ খনন, অবৈধ বালু উত্তোলন, দখল ও ভরাটসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করলেই গ্রেপ্তারসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে নৌপুলিশ। নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। নৌ দুর্ঘটনা রোধ ও নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। পরিবেশদূষণ রোধকল্পে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে পারবে নৌপুলিশ। মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে আইনের মধ্য থেকে যা যা করা দরকার তা করতে পারবে। অধিক্ষেত্রের মধ্যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে নৌপুলিশ তদন্ত করতে পারবে। পুলিশ কমিশনার বা জেলা পুলিশ সুপারকে অধিক্ষেত্রের মধ্যে দায়ের হওয়া মামলা হস্তান্তর করার জন্য অনুরোধ করলে তারা নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করবেন। নৌপুলিশ কর্র্তৃক মামলার তদন্ত শুরু হলে আইজিপির লিখিত অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো সংস্থায় ওই সব মামলা হস্তান্তর করা যাবে না। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে থানার ওসিদের মতোই গ্রেপ্তার, আটক, তল্লাশি, জব্দের ক্ষমতাসহ তদন্তসংশ্লিষ্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে নৌপুলিশ। যেকোনো মামলার তদন্তের সময় প্রয়োজনে জেলা, মেট্রোপলিটন পুলিশ, ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট ও পিবিআইর সহযোগিতা নিতে পারবে। আধুনিক হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ থাকবে নৌপুলিশের। ইউনিটের চাহিদা অনুযায়ী জনবল, অস্ত্রশস্ত্র, অন্যান্য উপকরণ সরবরাহসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবেন পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপার। মাসিক আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সভায় ইউনিটটির প্রতিনিধি থাকতে পারবেন। অন্যান্য সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে নৌপুলিশকে। সাধারণ ডায়েরি, পরিদর্শন বই, রেজিস্টার ও অন্যান্য রেকর্ডপত্র সংরক্ষণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত