নিউ ইয়র্কে গায়েব জনতা ব্যাংকের ৬ লাখ ডলার

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২০, ০৫:০৭ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জনতা ব্যাংক লিমিটেডের পূর্ণ মালিকানাধীন জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানির ৬ লাখ ডলার হাওয়া হয়ে গেছে। কোম্পানিটির অন্তর্বর্তীকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট ও সিইও দায়িত্ব গ্রহণকালে ৬ লাখ ডলারের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ কোটি টাকারও বেশি। খোয়া যাওয়া সেই ডলারের খোঁজে এখন নিউ ইয়র্কে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ। সার্বিক পরিস্থিতিসহ পর্ষদের এ সিদ্ধান্তের কথা গত ১ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে জানিয়েছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি আইএনসি (জেইসিআই), যুক্তরাষ্ট্র নামে কোম্পানি স্থাপন করে জনতা ব্যাংক। গত বছর ২৭ জুলাই থেকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোম্পানিটির অন্তর্বর্তীকালীন ইনচার্জ বা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সুস্মিতা তাবাসসুম। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ওই এক্সচেঞ্জ হাউজের প্রেসিডেন্ট ও সিইও হিসেবে নিয়োগ পান মো. মাহবুবুর রহমান। নয়া সিইও দায়িত্ব গ্রহণকালে সুস্মিতার কার্যকালীন সময়ের সার্বিক বুকস অব অ্যাকাউন্টস পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে জেইসিআইর রেকর্ডেড ফান্ড ব্যালেন্স এবং প্র্যাকটিক্যাল ফান্ড ব্যালেন্সের মধ্যে গরমিল পান। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মাহবুবুর রহমান ই-মেইলে বিষয়টি জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানান। পরে জনতা ব্যাংক

 থেকে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয় মাহবুবুর রহমানের কাছে। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ ফেব্রুয়ারি ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে জানান।

জনতা ব্যাংকের এমডি স্বাক্ষরিত অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাহবুবুর রহমান তার দায়িত্ব গ্রহণকালে কোম্পানির রেকর্ডেড ফান্ড ব্যালেন্স ৬ লাখ ৪৯ হাজার ২১ ডলারের জায়গায় মাত্র ৪৫ হাজার ৮৪৭ ডলার বুঝে পান। অর্থাৎ ক্যাশ পজিশনে বা নগদ অর্থের হিসাবে ৬ লাখ ৩ হাজার ৯৪৭ ডলার ঘাটতি পাওয়া যায়। এ বিষয়ে সুস্মিতা মাহবুবুর রহমানকে জানান যে, তার শারীরিক অসুস্থতা ও ২০১৯ সালের হিসাব সমাপনী কাজের জন্য তিনি জেইসিআইর ক্যাশ পজিশন হালনাগাদ করার সুযোগ পাননি, তবে ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা সম্পন্ন করে ক্যাশ পজিশন যথাযথভাবে মিলিয়ে দেবেন। এ বিষয়ে মাহবুব সুস্মিতার কাছ থেকে একটি লিখিত ঘোষণা গ্রহণ করেছেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সুস্মিতা হাব ব্যাংক নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস শাখায় জেইসিআইর ব্যাংক হিসাবে ৫ লাখ ৯ হাজার ৮২০ ডলার জমা দেওয়ার তিনটি রিসিট উপস্থাপন করেন মাহবুবের কাছে। তাতে ১৪ জানুয়ারি ১ লাখ ৯৭ হাজার ১০ ডলার, ১৫ জানুয়ারি ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০৩ ডলার এবং ২১ জানুয়ারি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬০৭ ডলার জমার রিসিট দেখিয়ে বলেন যে, ঘাটতি অর্থ জেইসিআইর ব্যাংক হিসাবে তিনি জমা করেছেন। তবে জেইসিআইর ব্যাংক হিসাবের হালনাগাদ প্রতিবেদনে ওই টাকা জমা হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরদিন ১৮ ফেব্রুয়ারি মাহবুব ও সুস্মিতা জেইসিআইর ব্যাংকার হাব ব্যাংকের জ্যাকসন হাইটস শাখার সহকারী ব্যবস্থাপকের সঙ্গে দেখা করে ওই রিসিটগুলো দেখিয়ে জমা করা অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ার কারণ জানতে চান। জবাবে শাখার কর্মকর্তা বলেন, তাদের হিসাবে দাবি করা ওই টাকা জমা হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বিষয়টি তারা অনুসন্ধান করে জেইসিআইকে জানাবে। একই দিনে সুস্মিতা হাব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। গত ২১ ফেব্রুয়ারি হাব ব্যাংকের জ্যাকসন হাইটস শাখা সুস্মিতাকে তার করা অভিযোগের বিষয়ে সাক্ষাৎকারে ডাকেন এবং সাক্ষাৎকার শেষে জানান যে, ২৫ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলের মাধ্যমে সুস্মিতাকে তারা অনুসন্ধানের রিপোর্ট দেবেন। একই দিনে হাব ব্যাংক নিউ ইয়র্কের প্রধান কার্যালয় হতে সুস্মিতাকে চিঠি পাঠিয়ে জানানো হয় যে, তাদের অনুসন্ধান ও লেনদেনের রেকর্ড অনুযায়ী তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, জেইসিআইর অভিযোগে উল্লিখিত তারিখে এ ধরনের কোনো অর্থ জমা করা হয়নি। তাই সুস্মিতার অর্থ জমা করার দাবি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পুরো বিষয়টি নিয়ে আলোচনার পর দুটি সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন ব্যাংকটির এমডি মো. আবদুছ ছালাম আজাদ। সিদ্ধান্ত দুটি হলোÑ খোয়া যাওয়া অর্থ খুঁজে বের করে তা উদ্ধার করতে জরুরি ভিত্তিতে নিউ ইয়র্কে একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হবে। আইনজীবীর পরামর্শে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হলো, প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে জানানো।

জনতা ব্যাংকের এমডি চিঠিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিবকে লিখেছেন, পর্ষদের প্রথম সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জেইসিআইর প্রেসিডেন্ট ও সিইও মাহবুবুর রহমানকে চিঠি দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে একজন উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল এ বিষয়ে কথা বলতে জনতা ব্যাংকের এমডি মো. আবদুছ ছালাম আজাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত