করোনায় মৃত্যুর চেয়ে দেউলিয়া হওয়ার ভয়ই বেশি

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২০, ১১:৪৪ পিএম

মানুষের দুর্ভোগ শুধু অসুস্থতার আকারে আসে না। এটি ঘরবাড়ি হারানো এবং মাস শেষে পরিষেবার বিল শোধে অক্ষমতার রূপেও হানা দিতে পারে। করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়ে ভুগে মারা যাওয়ার চেয়ে বেশি লোককে দেউলিয়ায় পরিণত করবে। আর এটিই হচ্ছে প্রকৃত বৈশ্বিক জরুরি পরিস্থিতি। বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করা করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক বিপদ জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ভাইরাসটি যদি সরাসরি আপনার জীবনের ওপরও প্রভাব সৃষ্টি করে তাহলে খুব সম্ভবত তা হবে কাজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, নিয়োগকর্তার আপনাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে বাধ্য হওয়া কিংবা আপনার ব্যবসাটিই দেউলিয়া হয়ে যাওয়া। 

বিশ্বের সরকারগুলো যদি সময়মতো হস্তক্ষেপ করতে এগিয়ে না আসে তাহলে এই সপ্তাহে আর্থিক বাজার থেকে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের গায়েব হয়ে যাওয়াটা হবে সবেমাত্র শুরু। আর যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে এরকম হোঁচট খেতেই থাকেন তাহলে বিষয়টি তার প্রেসিডেন্ট পদে পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন বিশেষ করে ‘কভিড-১৯’-কে  ট্রাম্পের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনের সময় ‘অবিচল, আশ্বাস জাগানিয়া’ নেতৃত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।

বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের নিশ্চিত সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। তবে এটি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেবে লাখ লাখ মানুষকে। মহামারীটি বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারে ধস নামিয়েছে, রাশিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যে বাধিয়েছে তেল যুদ্ধ আর যুদ্ধপীড়িত সিরিয়া থেকে আরেক দফা অভিবাসী সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।

আমরা হয়তো ভবিষ্যতে পেছন ফিরে তাকালে করোনাভাইরাস মহামারীর সময়টিকে সেই মুহূর্ত হিসেবে দেখব যখন কিনা বিশ্ব অর্থনীতিকে একসূত্রে বেঁধে রাখা বন্ধনগুলো আলগা হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ আর আমারটির মতো উঠতি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয়তো এর মূল্য চোকাতে হবে। তাই ভাইরাসটির সঙ্গে লড়াই করার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও অন্তত তার সমানই জরুরি হচ্ছে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোকে আতঙ্কের মহামারীর প্রতিষেধক দেওয়া।

বিশেষ করে সরবরাহ চেইন বন্ধ হয়ে আসায় ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো ধুঁকছে। তারা উৎপাদনের জন্য অনেক পণ্য বা অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাচ্ছে না। চীনে ব্যাপকহারে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সে দেশের ‘পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স’ রেকর্ড মাত্রায় নেমে গেছে। এ সূচকটি দিয়েই উৎপাদনের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। চীন বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক এবং বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ ম্যানুফ্যাকচারিং সেখানেই হয়। তাই চীনের সমস্যা সবারই সমস্যা এমনকি হোয়াইট হাউজ এবং পেইচিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও।

এই ব্যাপারগুলোর কারণেই এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে যে, সরকারগুলো এখনো একে কোনো অর্থনৈতিক নয়, বরং স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখছে। প্রকৃত অর্থনৈতিক মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আগেই অর্থনীতিবিদদের উচিত চিকিৎসকদের কাছ থেকে এই সংকটের দায়িত্ব গ্রহণ করা। ইতালিকে মন্দায় ধরবে না তা আশা করা এখন বাতুলতা (বিশ্বের নবম বৃহত্তম এই অর্থনীতির কার্যক্রম এখন কার্যত ‘তালাবন্ধ’)। এটি ইউরোপ এবং এর বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করবে না তা-ও কল্পনা করা কঠিন। আর বিশ্বের সরকারগুলো ১২ বছর আগের বিগত আর্থিক মন্দার সময়ের চেয়ে দ্রুত ও জোরদার পদক্ষেপ না নিলে বৈশ্বিক মন্দা ঠেকানো অসম্ভবই হবে।

এবারের ঝুঁকির মাত্রা হবে আরও অনেক বেশি। কারণ এবার অনেক পশ্চিমা দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি সমন্বিত চেষ্টা চলছে বলেই মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সোৎসাহে গ্রহণ করা নানা আগ্রাসী ধরনের বাণিজ্যনীতি থেকে দেশগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখার তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। চীনের ওপর দিয়েই নভেল করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক ও মানবিক চাপের মূল ধাক্কা গিয়েছে। কিন্তু পেইচিংয়ের অনেকেই মার্কিন অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় নৈরাশ্যের অমানিশার মধ্যেও আশার আলো দেখছেন। ট্রাম্পের চালানো বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে একটি বিরতিও বলা যায় একে, দৃশ্যত যা অব্যাহতভাবে বেড়ে চলছিল। থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না।

এদিকে করোনাভাইরাসের সঙ্গে প্রায় পুরোপুরি মিল রেখেই রাশিয়া-সৌদি তেল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। রাতারাতি তেলের দাম যে ৩০ শতাংশ পড়ে গেল স্বল্পমেয়াদে মস্কো এবং রিয়াদ উভয়েই তা সামলে নিতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শেল-গ্যাস’ ব্যবসা এ ধাক্কায় বিপাকে পড়বে। প্রক্রিয়া আরও ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলের দাম রেকর্ডমাত্রায় কমই থেকে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের তেল খাতের অনেকটাই লাটে উঠবে। এর ফলে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি হবে। এমনকি অঙ্গরাজ্য-স্তরে মন্দাও দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আটকে থাকা বেতনভিত্তিক ট্যাক্স হ্রাস এবং ঘণ্টা হিসেবে পারিশ্রমিক পাওয়া কর্মীদের সহায়তা উদ্যোগ পাস করিয়ে নিয়েছেন। এমন ব্যবস্থা নিয়োগকারী এবং কর্মচারী উভয়কেই বাঁচতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে অর্থমন্ত্রী রিশি সুনাক একটি ‘করোনাভাইরাস বাজেট’ প্রকাশ করেছেন। তবে এই নতুন বিপত্তিটি যেভাবে সব কিছুকে উল্টেপাল্টে দিচ্ছে তা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে চাইলে প্রত্যেককেই আরও বড়ভাবে চিন্তা করতে হবে।

মূল সমস্যাটি করোনাভাইরাস, তেলের দাম, এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতির চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি হচ্ছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়। গত ১০ বছর ধরে এই দ্বৈরথের কেন্দ্রস্থলটি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া। এক দশক ধরে রণাঙ্গনে লড়াই চলার পর দ্বন্দ্বটি  ছায়া যুদ্ধ থেকে অর্থনৈতিক সংঘাতের পর্যায়ে উঠেছে বলেই মনে হচ্ছে।

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি উদীয়মান পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীনের নজর এড়াচ্ছে না। অনেকেরই মতে, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে। দেশদুটি এখন সত্যিকারের এক বহু-মেরু বিশ্বের ব্যাপারে তাদের দূরকল্পকে জোরদার করার চেষ্টা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবকে আর ওপেক জোটের মাধ্যমে তেলের বাজারের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে রাশিয়া ও চীন বিশ্ববাজার তথা ক্ষমতার ভারসাম্যকে নিজেদের যাতে সুবিধা হয় সেভাবে নতুন রূপ দিতে চায়।

এই পরিবর্তন সামলে নেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং অন্যদের তাদের ছোট-বড় ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষা দিতে হবে। তাদের নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থাকে অস্বীকার না করে এ থেকে উপকৃত হওয়ারই সুযোগ খুঁজতে হবে। এসব পরিবর্তন উপেক্ষা করা হবে ফ্লু মহামারীর চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।

লেখক : অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্যের অর্থ ও বিনিয়োগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ইউকে : মেনা হাব’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত