বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি ও করোনা আতঙ্কে দেশের পুঁজিবাজারে নিয়মিত বড় দরপতন হচ্ছে। আরও দরপতনের শঙ্কায় ভীতসন্ত্রস্ত বিনিয়োগকারীরা কম দরে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। বিদেশিসহ স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ বিক্রিচাপে অধিকাংশ শেয়ারই ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ছে। চাইলেও অনেকেই শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি ফিরে গেছে ২০১০ সালের ধসকাল সময়ে।
ক্রেতাসংকটে গতকাল এক দিনেই প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসএক্সের প্রায় ১৯৭ পয়েন্ট বা ৫ শতাংশ পতন হয়েছে, নেমেছে ৩৭৭২ পয়েন্টে। সূচকের এ অবস্থান ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবরের পর বা প্রায় সাড়ে ছয় বছরের পর সর্বনিম্ন।
এদিকে পুঁজিবাজারের দরপতন সামাল দিতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আগামীকাল থেকে বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক মালিকরা। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিলের অগ্রগতির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংক মালিক ও এমডিদের সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, পুঁজিবাজারকে সহায়তা করতে সব ব্যাংক বিনিয়োগের আশ^াস দিয়েছে। ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার জানান, বুধবার থেকেই ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ শুরু করবে।
গতকাল ডিএসইতে ৩৫৫ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৩৩টি বা ৯৪ শতাংশের দরপতন হয়েছে। তিন দিনের দরপতনে ডিএসইর শেয়ারগুলোর বাজার মূলধন কমেছে ২২ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই পরিস্থিতি দেখা গেছে। ডিএসইতে লেনদেন শেষে ৩৪টি কোম্পানির শেয়ার দিনের সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হয়েছে। একপর্যায়ে এসব শেয়ারে কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল লেনদেন শুরু হয়েছিল দর বৃদ্ধি দিয়ে। বেশির ভাগ শেয়ারের দর বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিএসইএক্স সূচক প্রথম ১৩ মিনিটে আগের দিনের থেকে ৫৯ পয়েন্ট বাড়ে। এতে আশা জেগেছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কিন্তু বিদেশিদের বিক্রিচাপে বেলা ১১টা থেকে সূচকের নিম্নমুখী ধারা তৈরি হয়। পাশাপাশি করোনা আতঙ্কে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করতে থাকলে বড় দরপতনে এগিয়ে যায় সূচক। বেশির ভাগ শেয়ার দর নেমে আসায় দুপুর ২টায় সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ২০৯ পয়েন্ট কমে যায়। তবে শেষ পর্যন্ত ১৯৬ পয়েন্ট হারিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়।
এ নিয়ে সর্বশেষ টানা তিন কার্যদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক হারাল ৪৫৮ পয়েন্ট বা ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া চলতি দরপতনে এখন পর্যন্ত এ সূচক ৯৯৫ পয়েন্ট হারিয়েছে। সূচক পতনের হার ২০ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
কয়েক দিন ধরে দরপতন মাত্রা ছাড়ানোর প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে পতন ঠেকানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তৎপরতা তেমনটা দেখা না গেলেও সরকারি কয়েকটি ব্যাংক এরই মধ্যে বিনিয়োগ শুরু করেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবির ব্রোকারেজ হাউজ থেকে গতকাল মাত্র সাড়ে ৩ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির বিপরীতে প্রায় ২১ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছে। কেনার বড় অংশই আইসিবির নিজের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার জারির এক মাসের বেশি সময় পাওয়ার পরও মাত্র আটটি ব্যাংক এখন পর্যন্ত তহবিল গঠন করেছে। তবে এখনো ব্যাংকগুলো পুঁজিবাজারে উল্লেখ করার মতো বিনিয়োগে আসেনি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে ফেরাতে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের এনএসসি সম্মেলন কেন্দ্রে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থায় কিছু করার জন্য আজকে (গতকাল) বসেছিলাম। আর কিছু করতে হলে ব্যাংকগুলোকে নিয়ে করতে হবে। কারণ তারাই আমাদের প্রাইমারি সোর্স। ব্যাংকাররা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও আমাদের সাপোর্ট দিচ্ছে। শেয়ারবাজারকে ঠিক জায়গায় রাখার জন্য বেসরকারি ব্যাংকসহ সরকারি ব্যাংকগুলো যথাসাধ্য চেষ্টা করবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজারে এখন করোনাভাইরাস নিয়ে যে আতঙ্ক, তা আমাদের কারোর হাতেই নেই। এখানে আমার কথা হলো, কিছু বিনিয়োগকারী এখন শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। ১০ টাকার শেয়ার ৫ টাকায় বিক্রি করে চলে যাচ্ছে। এখন আমাদের যে বিপদ যাচ্ছে, ব্যাংকগুলোর চেষ্টা বাজারকে স্থিতিশীল অবস্থায় নিয়ে আসবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে কম দামে শেয়ার বিক্রি না করে, সে আহ্বানও জানান তিনি। আরও যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার আমরা তা নেব।
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজের কর্মকর্তাদের সূত্র জানা গেছে, বড় দরপতনে উপস্থিত বিনিয়াগকারীরা চোখের সামনে টাকা হাওয়া হয়ে যেতে দেখে হতাশায় ভেঙে পড়েন। অনেক শেয়ার ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়লে উপস্থিত বিনিয়োগকারী হাউজ ত্যাগ করেন। সর্বনিম্ন দরেও শেয়ার বিক্রি করতে পারেননি অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো থেকে দাবি উঠেছে পরিস্থিতি বিবেচনায় সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হোক। কিন্তু ব্রোকারেজ হাউজ ও বিনিয়োগকারীদের এ আবেদন আমলে নেয়নি দেশের দুই স্টকক এক্সচেঞ্জ। গতকাল বিকেলে ডিএসইর পর্ষদ সভা হলেও লেনদেন বন্ধ করার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেনের শুরুতে অধিকাংশ কোম্পানির দর বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল। তবে বেলা ১১টায় সূচক নিম্নমুখী ধারায় ফিরে আসে। মূলত বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে স্কয়ার ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, গ্রামীণফোন, রেনেটা, লাফার্জহোলসিম, বিএটি বাংলাদেশ, বেক্সিমকো ফার্মা, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজসহ বড় মূলধনি কোম্পানির শেয়ারের দর কমে গেলে সূচক বড় পতনে এগিয়ে যায়।
গতকাল ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ, সিটি ব্রোকারেজ ও লংকাবাংলা সিকিউরিটিজের মাধ্যমে বিদেশিরা সর্বাধিক শেয়ার কেনাবেচা করেন। এর মধ্যে ব্র্যাক ইপিএল থেকে ১৪ কোটি টাকার শেয়ার কেনার বিপরীতে ৩৯ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া সিটি ব্রোকারেজ থেকে সাড়ে ৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রির বিপরীতে সাড়ে ১০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি হয়েছে। এর বাইরে লংকাবাংলা ব্রোকারেজ ও ইউনাইটেড ফিন্যান্সিয়াল ট্রেডিং থেকে সাড়ে ৬ কোটি টাকার নিট শেয়ার বিক্রি হয়েছে। গতকাল এসব ব্রোকারেজ হাউজের নিট বিক্রির উল্লেখযোগ্য অংশই ছিল বিদেশিদের।
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেছেন, এখন বাজারে প্রায় ৫০টি ব্যাংক রয়েছে, সবগুলোই বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ২০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনবে। কিন্তু এগুলো একসঙ্গে কেনা হবে না। ক্রমান্বয়ে প্রতিটি ব্যাংক ওই টাকার শেয়ার কিনবে এবং এই বিনিয়োগ কার্যক্রম বুধবার থেকে শুরু হবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মনিটরিং করবে। প্রতি সপ্তাহে এ নিয়ে একটি মিটিংও করা হবে।
