মহামারীর আকার নিয়েছে করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯। এই ভাইরাসের দ্রুত সংক্রমণে চীনের পর এখন প্রায় স্থবির যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের ব্যবসা-বাণিজ্য। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ^মন্দা এখন আর আশঙ্কা নয়, বাস্তবতায় রূপ নিতে শুরু করেছে করোনাভাইরাস কেন্দ্র করেই।
গত সোমবার চীন জানিয়েছে দেশটির অর্থনীতির দুরবস্থার খতিয়ান। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে চীনে প্রথম করোনাভাইরাসের প্রভাব দেখা দেয়। করোনা আঘাতে জর্জরিত বিশে^র দ্বিতীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এখন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন এই মহামারী নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এশিয়ায় জারি আছে উচ্চ সতর্ক অবস্থা। আর্থিক বাজারগুলোতেও নেমেছে ধস। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈস্বইক অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
সিএনএন বিজনেসকে ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ডের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক প্রধান ডেভিড উইলকক্স জানিয়েছেন, ‘১০ দিন আগেও বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে মোড় নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। এখন এ নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন নেই।’
দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশ
নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়ানোর পর গত সপ্তাহে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে বড় পরিবর্তন এসেছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণে নানা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি কারফিউ জারি ও জনসমাগম বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে অনেক দেশ। এই পদক্ষেপগুলোর কারণে বিশ্ব অর্তনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে চীনা অর্থনীতির প্রতিটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে চীনের খুচরা বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে এই দুই মাসে চীনে শিল্প উৎপাদন সাড়ে ১৩ শতাংশ ও স্থায়ী সম্পদ বিনিয়োগ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। শিল্প উৎপাদন কমার এই হার চীনের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পরিচালক বেন মে বলেছেন, চীনের সবকিছু বন্ধ হওয়ার প্রভাব এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। অন্য দেশগুলোতে পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও প্রবৃদ্ধির ক্ষতি এড়ানো যাবে না। বিপর্যস্ত চীন এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। গোল্ডম্যান স্যাকস গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হার কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, ব্যয় সংকোচন, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় ও স্থানীয় কোয়ারেন্টাইনের কথা। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) দেশটিতে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হারে কমবে বলে বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটির ধারণা। হালনাগাদ পূর্বাভাসে পুরো বছরের প্রবৃদ্ধির ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ধরা হয়েছে। ২০০৮ সালের মন্দার মতো দ্বিতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ৮ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে মনে করছেন আইএনজির অর্থনীতিবিদরা।
টানা দুই প্রান্তিক বা তার বেশি সময় পতনশীল জিডিপি মন্দা হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২০ সালে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এ সময় অপেক্ষা করছে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন আইএইচএস মার্কেটের অর্থনীতিবিদ জোয়েল প্রাক্কেন।
বাজার বিপর্যয়
সম্প্রতি আর্থিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বাজারের চরম অস্থিরতায় সম্পদের দাম নির্ধারণ কঠিন হয়ে উঠছে। এর প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ পুঁজিবাজারে ধসে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের জন্য ব্যবসার অর্থ ঋণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার গত এক মাসে ২৭ শতাংশ দর হারিয়েছে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ ফেলো উইলকক্স বলেন, আর্থিক বাজারের চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতির পরিবর্ধক হয়ে ওঠার উচ্চ ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়।
অর্থনীতি সচল রাখতে গত রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদহার কমিয়ে শূন্যের কাছাকাছি নামানো ও বিশ্বের ব্যাংকগুলোর জন্য সস্তায় ডলার কেনার সুযোগ। গত সোমবার আর্থিক বাজারে আরও ৫০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে নিউ ইয়র্ক ফেড। ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক শীর্ষ অর্থনীতিবিদ কেভিন হাসেট সিএনএনকে বলেছেন, ‘এখন বিশ^ শতভাগ মন্দার কাছাকাছি।’
