খুদে উদ্যোক্তার পায়ে পায়ে বাধা

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২০, ০১:৫৯ এএম

দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় সরকার। বিভিন্ন সময় প্রধানমন্ত্রীও চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হতে বলছেন। তবে এ ক্ষেত্রে রয়েছে পরিবেশ ও সুযোগের অভাব। শত তরুণ শত উদ্ভাবন নিয়ে ভাবলেও সেটি করতে পারছেন না। হতাশ হয়ে অনেকে চাকরিই খুঁজছেন। যারা শুরু করছেন তাদের অনেকেই মুখ থুবড়ে পড়ছেন। তারা বলছেন, পর্যাপ্ত তহবিল সংকুলান করতে না পারা, রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেতে জটিলতা, ব্যাংকঋণ না পাওয়া, ব্যবসা পরিচালন খরচ প্রতিনিয়ত বাড়া, নকলবাজদের দৌরাত্ম্য, মানহীন ও আমদানি পণ্যে বাজার সয়লাব, উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকতে না পারা ও আন্তর্জাতিক বাজার সৃষ্টিতে সরকারি সহযোগিতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণে উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। আর এরই মধ্যে যারা নানা বাধা সত্ত্বেও এগিয়েছেন সেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দেশজ মোট উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান ২৫ ভাগ, সেখানে সব শিল্প খাতের রয়েছে ৩৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ৭৮ লাখ উদ্যোক্তাই জিডিপিতে এ অবদান রাখছেন। এ সংখ্যা আরও বাড়লেই দেশের অর্থনীতির পরিধি বড় হবে এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ ও ব্যবস্থাপনা দরকার বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

উদ্যোক্তারা দেশে কতটা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন, তা বোঝা যায় ব্যবসায় পরিবেশ সহজীকরণ সূচকে। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯০টি দেশের মধ্যে ১৬৮তম। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে আগের চেয়ে আট ধাপ এগিয়েছে। এ তথ্য গত কয়েক বছরের সঙ্গে তুলনা করলে কিছুটা স্বস্তিদায়ক বলা যায়। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় একে বড় ধরনের অগ্রগতি বলা যাবে না। বিশ্বব্যাংক ১০টি সূচকের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন  তৈরি করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবসা শুরু, নির্মাণ অনুমোদন, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি, সম্পত্তি নিবন্ধন, ঋণপ্রাপ্তি, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষা, কর পরিশোধ, সীমান্ত বাণিজ্য, চুক্তি কার্যকর ও দেউলিয়াত্ব মীমাংসা।

এদিকে দেশীয় ব্যবসায়ীদের গবেষণা সংস্থা বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) প্রকাশিত ব্যবসার আস্থা সূচকে দেখা যাচ্ছে, গত বছর জানুয়ারি-জুনে আস্থা সূচক ছিল ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। কর্মসংস্থানের অবস্থা, দ্রুত লাইসেন্স প্রাপ্তি, টার্নওভার করের সীমা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতির কারণে এটি হয়েছে। বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফেরদৌস আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের দেশে শিল্পের পলিসি নিয়েই সমস্যা আছে। এসএমই নীতিমালা যেটা করেছে সেখানে কটেজ (বাসাবাড়িকেন্দ্রিক কারখানা, বিনিয়োগ ১০ লাখের নিচে) ও মাইক্রো (ছোট শিল্প, বিনিয়োগ ১০-৭৫ লাখ) আলাদা করেনি। দেশে এ দুই খাতের উদ্যোক্তাই বেশি। বিনিয়োগ পরিবেশের ক্ষেত্রে আমরা কিছু প্রাথমিক জায়গায় ভালো করেছি, যেমন বিদ্যুৎ খাত। কিন্তু এর কস্টটা কতটা সহনশীল, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি কিনে শুধু তার করচাপ বেড়েছে। আবার সেসব জমি ব্যবসার জন্য প্রস্তুতও নয়। উদ্যোক্তাদের এক ধরনের মেসেজ দিয়ে নিয়ে এসে অন্যরকম ব্যবহার করলে হতাশ হতে হয়। তাই আমাদের পলিসি শক্ত করতে হবে। ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে যেসব বিষয় লাগবে সেগুলো নিয়ে এখনো পলিসি হয়নি। এটা আগে করতে হবে। প্র্যাকটিক্যাল লেভেলে পলিসির সঠিক প্রয়োগ করতে না পারলে উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে না।’

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যমতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা নারীদের বয়স ৩১-৫০ বছর। এদের মাত্র ২ শতাংশ অবিবাহিত। বিআইডিএস বলছে, দেশের অবিবাহিত নারীর পক্ষে ব্যবসার তহবিল জোগাড় খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আবার নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র ২৬ শতাংশ শিক্ষিত। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের বড় একটি অংশ বিবাহ-বিচ্ছেদ বা স্বামী পরিত্যক্তা। নারী উদ্যোক্তাদের ৬৩ শতাংশ নিজস্ব সঞ্চয়, ৭ শতাংশ স্বামীর সঞ্চয়, সাড়ে ১৮ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকের ঋণ ও ৬ শতাংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন।

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ইসরাত জাহান। পারিবারিক কারণে ব্যাংকের চাকরি ছাড়েন। তবে থেমে থাকেননি। গড়ে তোলেন পাটজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘তুলিকা’। তার পণ্য এখন ইউরোপের বাজার ধরেছে। এ প্রতিবেদককে ইসরাত জাহান বলেন, ‘চাকরি করার সময় ৮০ হাজার টাকা সঞ্চয় করেছিলাম। তা দিয়ে ব্যবসা শুরু করে লোকসানে পড়ি। বিভিন্নজনের কাছে ধার চেয়েছি, কিন্তু পাইনি। ব্যাংকও হতাশ করে। তবে থেমে থাকিনি।’ তিনি বলেন, ‘এ দেশে ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া থেকে রপ্তানি সব ক্ষেত্রে ভোগান্তি রয়েছে। আর বর্তমানে কারখানা মোটামুটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। তবু এক টাকাও ব্যাংকঋণ পাইনি।’ ইসরাত জানান, দেশের মেলাগুলো যদি সত্যিই আন্তর্জাতিকমানের হতো, সেখানে বিদেশিদের সঙ্গে আমাদের পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ পেতাম, তাহলে রপ্তানির বাজার নিয়ে খুব একটা ভাবতে হতো না। এছাড়া রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ বাজার নিয়ে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

বিআইডিএসের তথ্যমতে, দেশের খুদে উদ্যোক্তাদের নিজে তহবিল দিয়ে উদ্যোগ শুরু করতে হয়। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ৭৩ শতাংশ উদ্যোক্তা নিজস্ব সঞ্চয় থেকে ব্যবসা শুরু করে। দেশের এসএমই খাতের মোট মূলধনের ৪৯ শতাংশই উদ্যোক্তাদের নিজস্ব তহবিল। এছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও শুভাকাক্সক্ষীদের থেকে ধার নিয়ে তারা ব্যবসা করেন। এসএমইর ৪১ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, এসএমই খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের যে তহবিল আছে, তা অপ্রতুল।

সাতক্ষীরার লিটন ভাগ্য ফেরানোর আশায় বছর পাঁচেক আগে ৭ লাখ টাকা খরচ করে সিঙ্গাপুর গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। দেশে ফিরে কিছু সঞ্চয় নিয়ে মাছচাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার একটি মাছের ঘেরের পাশাপাশি রয়েছে গরুর খামার ও একটি আমবাগান। লিটন বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ব্যাংকঋণ দেওয়ার কথা। তবে জামানতসহ ঋণ নিতে দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এই শর্ত, সেই শর্ত পূরণ করেও চাহিদামতো ঋণ পাইনি। অথচ আমি খেলাপিও নই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এসএমই খাতের জন্য ১০ বছর আগে ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ছিল। এর বাইরে এসএমই খাতে কোনো আলাদা তহবিল নেই। এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের হারও কম। অথচ এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে। গত বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসএমই ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১৯ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা দেশের মোট ঋণের নয় ভাগের এক ভাগ। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে ৯ লাখ ৬৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

কয়েকজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য যেসব শিল্পপার্ক স্থাপন করেছেন, সেখানে তারা জমি বরাদ্দ পান না। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির দাম ও ভাড়া দিনে দিনে বাড়ছে। প্রতিনিয়ত গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ বিভিন্ন সেবার দামও বাড়ছে। বিভিন্ন অব্যবস্থাপনায় পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় বেড়ে যাচ্ছে। একটি সেবা পেতে একাধিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়, তাতে সময় ও খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হয়রানি কমাতে বাধ্য হয়ে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কাজ করতে হয়। এসব কারণে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আর দেশের বাজারে আমদানি পণ্যের সয়লাব, সেখানে উৎপাদিত পণ্য মার খাচ্ছে। এরপর বাজারে রয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করেও বাজারে টেকা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া অনেক ক্রেতা ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে চায় না, এতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিনের পর দিন বসে থাকতে হয়। রপ্তানির বাজার সৃষ্টিতে সরকারের উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয় বলেও মনে করেন তারা।

এসএমই ফাউন্ডেশনের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোরশেদ আলম বলেন, ‘মাত্র ৫০ জন জনবল এসএমই ফাউন্ডেশনের। এরপরও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি এ খাতকে এগিয়ে নিতে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এতদিন কোনো নীতিমালাও ছিল না। অথচ ভারতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় আছে। আমাদেরও এগুলো করতে হবে।’

এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এতদিন এ খাতে কোনো নীতিমালা ছিল না। সরকার এ খাতের জন্য একটি নীতিমালা করেছে। এটিতে যেসব বিষয় বলা হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে এ খাত মাথা তুলে দাঁড়াতে পাড়বে।’ ঋণ পাওয়া নিয়ে জটিলতার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা একটি সমন্বিত সমস্যা। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে এ বিষয়ে যুক্ত প্রত্যেককে সমস্যাটি সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই ঋণসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।’

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘এসএমই খাত দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এসএমই খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। চীন কিন্তু এসএমই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই এগিয়ে গেছে।’

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘এসএমই খাতকে উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিলেও সুফল আসেনি। ব্যবসা পরিবেশ সূচকের উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও সময়মতো তা শেষ করা যাচ্ছে না। আর কস্ট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ দিতে চায় না। কিন্তু এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক যেটা করতে পারে সেটা হলো, এসএমই খাতের জন্য ব্যাংকগুলোকে দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে কি না তা সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং না মানলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এ খাতে সমস্যা বেশি। বিশেষ করে ব্যাংকগুলো এ খাতে ঋণ দিতে চায় না। এখন তো সরকার ৬-৯ হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে এ খাতের আর্থিক ভোগান্তি আরও বাড়বে। এটা থেকে উত্তরণের সবচেয়ে সহজ উপায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের পরিমাণ বাড়ানো। এছাড়া এ খাতের অন্যান্য সমস্যা সমধানেও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত