‘সারা দিন কাগজ কুড়াই। সন্ধ্যায় স্কুলে আসি। পড়তে ভালো লাগে। আমিও একদিন বড় হব, চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করব।’ স্বপ্নের কথাগুলো বলছিল ভ্রাম্যমাণ ফিউচার ন্যাশন ফাউন্ডেশন (এফএনএফ) স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী জাফিয়া জান্নাত। তার মতোই স্কুলের অর্ধশতাধিক ছিন্নমূল শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখছে পড়ালেখা করে বড় হওয়ার।
কারওয়ান বাজার সিআর দত্ত সড়কের পান্থকুঞ্জ পার্ক, তার কোল ঘেঁষে ফুটপাতে বসে ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন আলোয় স্বপ্ন বুনছে জান্নাতরা। তাদের সামনে স্বপ্নদ্রষ্টা হয়ে কাজ করছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্য জাহিদুর রহমান সকাল। শুরুটা নিয়ে তিনি বলেন, ‘২০১৫ সালের ২৫ নভেম্বর, ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। ফুটপাতে বসা দুই পথশিশুর একজনের মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। কাছে গিয়ে জানলাম, কারও আঘাতে মাথা কাটলেও কোথাও চিকিৎসা পায়নি। পরে ফার্মেসি থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এনে চিকিৎসা দিচ্ছি। সম্পর্কের মায়াজাল এখান থেকেই। আচমকা ছেলেটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “স্যার, আমি পড়তে চাই, আপনি আমাকে পড়াবেন?” ঘটনার আকস্মিকতায় নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। প্রতিদিন যাদের সঙ্গে দেখা হয়, তাদের জন্য কিছু করতে না পারলে বিবেকের কাছে দায়ী থাকব। পরের দিনই সন্ধ্যায় আসতে বললাম। এরপর থেকেই চলছে পাঠদান।’
পুলিশের লোক হওয়ায় অনেক আসামির অপরাধের আঁতুড় জানা। অযত্ন-অনাদরে বেড়ে ওঠা ছিন্নমূল শিশুরাই একসময় অপরাধ জগৎ দাপিয়ে বেড়ায়। একমুঠো খাবারের খোঁজে যাদের দিন কাটে, শিক্ষা তাদের বিলাসিতা। কিন্তু এই নগণ্য আমাকে দিয়ে যদি একটি শিশুও নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে, তাই বা কম কিসে? বলে চলেন জাহিদ।
এফএনএফ স্কুলে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় পাঠদান শুরু, চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। শিক্ষার্থীদের রয়েছে নির্দিষ্ট পোশাক। আলাদা আলোর ব্যবস্থা না থাকায় পাঠদান হয় ল্যাম্পপোস্টের নিচে। শিক্ষাসামগ্রীর সঙ্গে একবেলা খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলা-ইংরেজির প্রাথমিক হাতেখড়ি নিয়ে এদের কেউ শিক্ষাজীবন দীর্ঘ করছে। অন্যরা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে।
সরেজমিনে এই প্রতিবেদককে শিক্ষার্থীরা কেউ শিক্ষক, পুলিশ কেউবা চিকিৎসক হওয়ার কথা জানায়। কারও স্বপ্ন পৃথিবী ঘুরে দেখা। বেশির ভাগ শিশুই একজন জাহিদ সকাল হতে চায়। নগরীর ছিন্নমূল জীবন শিক্ষার আলোয় তাড়াতে প্রত্যয়ী, ইচ্ছাশক্তিই তাদের পাথেয়। এ জন্য অনেকে কাগজের বস্তা নিয়েই পাঠদানে বসে গেছে। এখন পর্যন্ত স্কুলটি থেকে ৫ শতাধিক শিশু-কিশোর শিক্ষা নিয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো ছয়জন পিএসসি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। জাহিদ সকাল বলেন, ‘স্কুলের নামে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরে যোগাযোগ করেছি। তারা আশ^স্ত করেছে। যদিও এখনো কোড দেয়নি। শিগগিরই পেয়ে যাব।’
এফএনএফ শিক্ষার্থীদের কারও বাবা রিকশাচালক, কারও মা বাসাবাড়িতে কাজ করেন। অনেকেই জানে না মা-বাবার পরিচয়। কেউ নেই তাতে কী, সবাইকে বড় হতে হবে, সমাজকে কিছু দিতে হবেএ বোধটুকু জাগ্রত করার চেষ্টা করছেন জাহিদ সকাল। তিনি বলেন, ‘শীতে সমস্যা না হলেও বর্ষায় বিপাকে পড়তে হয়। বৃষ্টি হলে পাঠদান বন্ধ। তিনজন নিয়ে শুরু হলেও এখন ব্যাপক উপস্থিতি। তাদের পোশাক, শিক্ষাসামগ্রী ও একবেলা খাবার দিই।’
স্বপ্নবাজ এই পুলিশ কর্মকর্তার সাহসী উচ্চারণ, ‘কীভাবে স্কুলটি চালিয়ে নেব, চিন্তা ছিল। সময়ের ব্যবধানে আমার স্ত্রী, বোন ছাড়াও বন্ধুরা এগিয়ে এসেছে। সরকার ও সচেতনরা এগিয়ে এলে, ছিন্নমূল শিশুরাই একদিন শিক্ষার আলোয় সমাজ পরিবর্তন করবে।’
